লোকটার পোস্টের নাম ওয়ার্ডেন।
এই ওয়ার্ডেন আগে–যখন বেকার ছিল, এক লেকের পাড়ের বটগাছের তলায় অনেক বেকারের সাথে আড্ডা দিত। বলা বাহুল্য সেইসব বেকার সবই সিপিএম পার্টির যুব সংগঠনের সদস্য। তারা মাঝে মাঝে বিরোধীদলের লোকজনকে ঠেঙানোর মতো পবিত্র কর্তব্যও করত। তখন এই ওয়ার্ডেন মানুষকে মারার নিত্য নতুন যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতির আবিষ্কার করত। যা দেখে বন্ধুরা তার নাম দিয়েছিল রুনু গুহ নিয়োগী।
কিছু লোকের এখনও মনে আছে যে রুনু গুহ নিয়োগী সেই সত্তরের দশকের এক কুখ্যাত পুলিশ অফিসার। যে নকশাল বন্দী মহিলাদের যোনিতে গরম ডিম সেদ্ধ ঢুকিয়ে দিয়ে বড় আনন্দ পেতেন। চুরুটের ঝাঁকা দেওয়া ছিল তার প্রিয় খেলা। যে কোন নকশাল বন্দীর কপালে দগদগে পোড়া দাগ দেখে বোঝা যেত এটা কার কীর্তি।
যখন ৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয় সবাই বড় আশা করেছিল ওই অত্যাচারী পুলিশ অফিসারের অপরাধের বিচার হবে সাজা পাবে। কোনো সাজা হয়নি প্রোমোশান পেয়েছিল। কারণ পূর্ববর্তী সরকারের মতো জ্যোতি বসুর সরকারও তাকে স্বার্থসিদ্ধির জন্য যথেচ্ছ ব্যবহার করেছিল। তাই সে রিটায়ার করার পরেও লালবাজারের অতি সুরক্ষা বলয়ে বাস করার কোয়ার্টার্স পেয়েছিল। দিয়েছিল এই বামফ্রন্ট সরকারই।
ওয়ার্ডোনের খুব ইচ্ছা ছিল চাকরি যদি করে তবে পুলিশ বিভাগে করবে। রুনু গুহ নিয়োগীর মতো নাম কামাবে। সে তো আর হল না। কী আর করা যাবে, হাতের কাছে যাদের পাচ্ছে, মেরে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছে।
ওয়ার্ডেন লাফাতে লাফাতে হল ঘরের শেষ প্রান্তে চলে গিয়েছিল। লাফাতে লাফাতে ফেরার সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ল দরজায় এক অচেনা আগন্তুক। চমকে উঠল সে। কে লোকটা? কোনো বাচ্চার গার্জেন নয় তো? এই গার্জেনগুলো মহাহারামি। কিছু একটু হলেই হুজ্জতি বাধায়। সুপ্রিম কোর্ট দেখায়। সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে বলেছে বাচ্চাদের কোনোরূপ শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা চলবে না। ওরা কী জানে বাচ্চা হচ্ছে একতাল মাটির মতো। তাকে আগে ভালো করে থেততে হয় তারপর ছানতে হয়। তারপর ছাঁচে ফেলতে হয়, রোদে শুকাতে হয়ে, আগুনে পোড়াতে হয়। তবে তৈরি হয় ব্যবহারযোগ্য হাঁড়ি কলসিতে। বাচ্চাদের ঘেঁতবার সময় দয়ামায়া দেখালে ওরা আর মানুষ হবে? মানুষ যদি না বানাতে চাও এখানে দিলে কেন? নিয়ে যাও বাড়ি।
আমার সামনে এসে বলে সে, কে আপনি?
বলি–আমি রান্নার কাজ করব বলে এসেছি।
ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে রুনুবাবুর। যা এ তাহলে কোনো ঝামেলা দায়ক অস্তিত্ব নয়। বিশাল দেহ নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে একটা খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে বলে–একটু বসুন। সুপার সাহেব বাজারে গেছে। সে এলে তাকে যা বলার বলবেন।
বাচ্চাদের একটা চৌকির এক কোণে বসে পড়ি আমি। বোবা বাচ্চারা আমাকে দেখে, আমি ওদের দেখি। ছয় থেকে ছাব্বিশ নানা বয়সের বাচ্চা। এত বোবা এক সাথে আগে আর দেখিনি। ভাষা মনের ভাব প্রকাশের বাহন। ওদের মুখে ভাষা নেই তাই জানি না, ওরা আমাকে দেখে কী ভাবছে।
এই সময় এক ষাট বাষট্টি বছরের মহিলা একটা কেটলিতে করে চা নিয়ে এলেন। অন্য হাতে দুটো কাপ। ওনাকে স্কুলের কিছু স্টাফ মাদার কিলার বলে ডাকে। মাদার মানে তো মা আর কিলার মানে খুনি। খুনিমা? এই নাম কেন? কেন সে আমি জানতে পারব দিন কয়েক পরে। যখন উনি কোনো বাচ্চাকে ধরে নির্দয়ভাবে পিটবেন, আর আমি বলব ছেড়ে দিন মাসিমা, না হলে ও মরে যাবে।
মাসিমার তিনকুলে কেউ নেই। খুব অল্প বয়সে স্বামী মারা গেছে। কেউ কেউ বলে আত্মহত্যা। তবে তারপর উনি আর বিয়ে করেননি। বর্ধমানের এক অজগাঁ থেকে বের হয়ে পড়েন পথ পরিক্রমায়। তারপর কী করে কেমন ভাবে কে জানে পৌঁছে যায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভাইয়ের বাড়ি। হেঁসেল সামলাবার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। সেই সুবাদে বাড়ির চাকর বাকরদের উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারও পেয়ে যান। সে বহু বছর আগের কথা, তখনও সিপিএম নেতারা শাসক হয়ে যায়নি। দম্ভ দর্প অহঙ্কার তখনও ভ্রুণাকারে সুপ্ত, মহীরূহ হয়নি। ফলে, অনেক নেতার সাথে পরিচিত হয়ে যান। মিলতে মিশতে তাদের সম্মান আহত হয় না। তবে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হতে পারেন সেই সাঁইবাড়ি হত্যা মামলার এক আসামি যে নাম ভাড়িয়ে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার হয়ে গেছে, তার সাথে।
এরপর প্রকৃতির নিয়মে তিনি এক সময় বুড়ো হয়ে যান। তখন তার শরীর অশক্ত হয়ে পড়ে। যে গরু হাল টানতে পারে না, দুধ দেয় না মালিক তাকে গোয়ালে রাখে না–বিদায় করে দেয়। তবে বুদ্ধদেবের সেই ভাই একে কষাইয়ের কাছে বেচার বিকল্প হিসাবে বড় সাহেবকে সমর্পণ করে দিয়েছেন। তিনি একে আশ্রয় দিয়েছেন এই আবাসিক স্কুলে। সবাইকে বলে দিয়েছেন বড় সাহেব, এনাকে মায়ের মতো সম্মান দিবি। যা বলে মেনে চলবি। যদি কারও নামে কোনো নালিশ করে, তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেব।
কথায় বলে বাঘ বুড়ো হয়ে গেলেও ঘাপ ভোলে না। উনি যেখানে ছিলেন, যে বোয়াবে ছিলেন সেই রোয়াব এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। বোবা বাচ্চাদের তো কথায় কথায় পিটিয়ে দেন তবে সাধারণ কর্মচারীদের ওটুকু ছাড় আছে। শুধু গালাগালি দিয়েই তাদের মারের চেয়ে বেশি করে ছাড়েন।
