তুমি জানো না কেমন? সে পাল্টা প্রশ্ন।
জানি না। বলি আমি।
তোমাগার পার্টির লোক, তুমি জানো না।
আমি পার্টি করি না।
তবে সিপিএম পার্টির ঘাটিতি যাচ্ছো!
যাচ্ছি একটা কাজের জন্য।
কী কাজ?
ওই আর কী!–রান্নাবান্না। সেইজন্য জানতে চাচ্ছি যাদের সাথে কাজ করব লোকগুলো কেমন।
আমি আর কী বলব–বলে রিক্সাওয়ালা, ওই সিপিএম পার্টির নোক যেমন হয় তেমনই।
একটু গলির মধ্যে সেই আবাসিক স্কুল। দূর থেকে তার লোহার গেট দেখা যাচ্ছিল। রিক্সা সেখানে এসে থামল। নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দুরু দুরু বুকে আগালাম সামনের দিকে। এত ভয় আমি জেলে ঢোকার সময়ও পাইনি। যেখানে এক দুজন বদ লোক থাকলেও অধিকাংশই ভালো লোক। অবস্থা বিপাকে জেলে এলেও তাদের বুক থেকে দয়া দরদ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এরা কেমন হবে কেমন হয় তার কিছু পূর্ব পরিচয় আমার জানা, ভয়টা সেকারণেই।
আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে একজন লোক পথরোধ করে দাঁড়াল–কাঁহা জানা হ্যায়?
লোকটা দারোয়ান। সাড়ে চার ফুট উচ্চতার রোগা এই বিহারি দারোয়ানকে দেখলে লোকের করুণা হতে বাধ্য। হায়, বোবা বধির স্কুলের কী করুণ দশা। অতি কষ্টে খুঁজে পেতে বিহার থেকে একজনকে আনানো হয়েছে বটে তবে সে মোটেই বিহারি লেঠেলের মতো নয়। ইয়া মোচ, ইয়া বুকের ছাতি, ডন-বৈঠক মারা বলবান শরীরের পাহারাদার যে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়ালে দেখে মনে হবে হ্যাঁ পাহারাদার, তাহলে তো আসলি বিহারি। এ যদি রাতে পাহারায় থাকে পাঁচিলের ওপার থেকে চোর একে দেখে হেসে মরে যাবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কী করবে, তেমন কেউ যে গাছ পুতে ফল হলে খাব বলে বসে থাকতে রাজি হয়নি। তাই ধরে বেঁধে এক কানা মামা, একেবারে না থাকার চেয়ে কেউ তো থাকুক।
আমি বস্তার কা বাঙাল। হিন্দিটা ভালোই জানি। নিজের গরজে শিখেছিলাম। যেমন একদা শিখেছিলাম বাংলা বর্ণমালা। এখন তো দুটো ভাষা বলা এবং পড়ায় আমি সড়গড়।
বলি, সুপার সাহেব সে মিলনা হ্যায়।
আজ ইসকুল বন। বাচ্চা ভর্তি করা না হ্যায় তো কাল আইয়ে।
বাচ্চা নেহী, হামে ভর্তি হোনা হ্যায়।
আমার কথায় বিহারি অবাক–আপকো ভর্তি হোনা হ্যায়!
হাম এক কামকে লিয়ে আয়া, খানা বানানেকা কাম।
সমঝ গয়া। বলে সে আমাকে আঙুল তুলে তিনতলা দেখায়, আভি তো ‘সুইপার’ সাহেব নেহী, ওয়ার্ডেন সাহাব হ্যায়, যাকে উনসে মিলিয়ে। ওহ সব বাতায়েঙ্গে।
আজকে এই আবাসিক স্কুলের যে আকার প্রকার তখন তা ছিল না। ছিল বিশাল লম্বা একটা তিনতলা বিল্ডিং। নীচের তলায় স্কুলের জন্য কয়েকটা কক্ষ, অফিস, টিচার্স রুম, বড় সাহেবের একটা বসার এবং প্রয়োজনে শোবার ঘর। টিচার ইনচার্জের অফিস। আর একটা পরে কোন কাজে ব্যবহার করার জন্য বড় ফাঁকা ঘর।
দোতলার আট ঘরে আটটা ক্লাশরুম। তিনতলায় বাচ্চাদের থাকার জন্য লম্বা হলঘর। আর ছাদের একটা চিলে কোঠায় রান্নাঘর। রাতে বাচ্চারা ছাদে বসে খায়, দিনে সিঁড়িতে সার দিয়ে।
আমি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠি। আজ আমি যে সময় এসেছি অন্যদিন হলে সব বোবা বাচ্চাদের খেয়ে দেয়ে ক্লাসে চলে যাবার কথা। আজ যেন কীসের জন্য স্কুল ছুটি তাই টিচাররা কেউ আসেনি বাচ্চারা ক্লাসে যায়নি।
আমি গিয়ে যখন দরজার সামনে দাঁড়ালাম, শুনতে পেলাম এক ভীম গর্জন। কে যেন চিৎকার করছে–মেরে শেষ করে ফেলব। এরপরই কয়েকটা গুম গুম আওয়াজ। সেগুলো পড়ল একটা দশবারো বছরের বাচ্চার পিঠে। কিলের গুঁতোয় বাচ্চাটা যেন বেঁকে ধনুক হয়ে গেল। ঝাঁকিয়ে কেঁদে উঠল।
একজন লোক–লোক না বলে তাকে আফ্রিকান সুমো পালোয়ান বলা ভালো। সে তার বিশাল দেহ নিয়ে লাফিয়ে বাচ্চাদের শোবার জন্য পেতে রাখা এক খাট থেকে আর এক খাটে গিয়ে পড়েছে আর যাকে ধরছে, মেরে ধনুক বানিয়ে দিচ্ছে।
ভয়ে ভয়ে তাকাই লোকটার দিকে। বড় বড় দুটো লাল চোখ। মাথায় ছোট করে ছাঁটা চুল। গায়ের রঙ মহিষবর্ণ। উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট। সবটা মিলিয়ে সে যেন এক জীবন্ত আতঙ্ক।
সত্যিই সে এক আতঙ্কই। যে পাড়ায় সে থাকে প্রতিটা লোক একান্তে সভয়ে সে কথা স্বীকার করে। শুধু এ একা নয় এদের ছয় ভাই সব যেন এক একটা মূর্তিমান ত্রাস। বহু বছর আগে এদের বিচক্ষণ বাবা সব কয় ভাইকে ডেকে নীতিমালার সেই গল্পটা বলে ছেলেদের বুঝিয়ে ছিলেন–একটা কাঠি যে কেউ এক চাপে মটু করে ভেঙে দিতে পারে। এক গোছা একসাথে থাকলে কিছুতে পারে না। পিতৃবাক্যের সারমর্ম বুঝে ছয় ভাই এক বাড়িতে থাকে এক হাঁড়িতে খায়। ছয় ভাই হাতে ছয়খানা ঝাণ্ডা বাঁধা ডাণ্ডা নিয়ে পথে নামলে আর কাউকে সাথেনা পেলেও বিজয় অনিবার্য।
এর বড়দা, বড় সাহেবের বাল্যবন্ধু এবং সিপিএম পার্টির আঞ্চলিক এক দাপুটে নেতা। বন্ধুর ভাই বলে বড় সাহেব একে ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন। তিনি ডেকে একে এই চাকরিটা দিয়েছেন। এমনিতে এর চাকরির খুব একটা দরকার ছিল না। পাঁচ ভাই পার্টি (প্রমোটারি) করে যা কামিয়েছে পায়ের উপর পা তুলে বসে খেলেও পাঁচ পুরুষে শেষ হবে না। তবু বড় সাহেবের কথার মান রাখতে চাকরিটা নিয়েছে। বেলা দশটা নাগাদ একবার এসে ঘণ্টাখানেক থেকে বাড়ি চলে যায়। দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়ে জিরিয়ে রাতের দিকে আর একবার এসে পাক মেরে যায়।
