আমি এক অভাগা মানুষ। সারা জীবনের অভিজ্ঞতায় জেনে গেছি জীবন আমার জন্য ভালো কিছু করবে না। সব শুভ সব মঙ্গল সরে থাকবে আমার নাগালের শত হস্ত দূরে। কিছু ভাগ্যবান আছে যারা ধুলো মুঠো করে ধরলে সোনা হয়ে যায়। আর কিছু অভাগা পোড়া শোল মাছ পুকুরে ধুতে গেলে সাঁতরে ছুটে পালায়। আমি এই শেষ দলের।
তাই ঘোষবাবুর কথায় খুব একটা নেচে ওঠার কারণ দেখি না। শুধু মনকে বলি দেখা যাক কী হয়।
একজন বিশ্ববিখ্যাত কবি বলেছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আর যারা নিরক্ষর, গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ–কবিতা পড়তে পারে না, তারা বলেছে বিশ্বাসের মা বহুকাল আগে মরে গেছে। বিশ্বাসী মানুষ আর পয়দাই হচ্ছে না। যেহেতু কবির ভাষা কবিরাই বোঝে, অকবির ভাষা বোঝে অকবিরা, সাধারণ মানুষ অভিজ্ঞতায় বুঝেছে যে, এই চাকরি চাই না। তাই যেন আমারই জন্য ওই পদটা আজও খালি পড়ে আছে। আমি আসব আর পেয়ে যাব। এ যেন বিধির নিবন্ধ।
কে যেন বলেছে ”পৃথিবীটা হচ্ছে গোল”। এর যেখান থেকেই যাত্রা শুরু করা হোক অনবরত চলতে থাকলে এসে পড়তে হবে সেখানে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল। একবার উত্তর ভারত ঘুরে ফিরে এসেছিলাম। এবার ফিরে এলাম মধ্য ভারত ঘুরে। এখন মনে হচ্ছে একটা পরিক্রমার অবসান অনিবার্যভাবে ঘটে যেতে চাইছে। একে প্রতিহত করা সঠিক হবে না।
কিছুদিন এখানে থেকে একটু বিশ্রাম নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তা করে তৃতীয় পরিক্রমা শুরু করতে হবে। যদি সেই রকম অবস্থা ব্যবস্থা সুযোগ ঘটে। দেখা যাক না শেষ পর্যন্ত কী হয়।
***
বাইপাশের উপর দাঁড়িয়ে পূর্বদিকে আকাশে যতদূর চোখের নাগালে আসে সেই বিশাল এলাকার প্রায় সবটাই ছিল জলাভূমি। মাছের চাষ হতো এখানে। এই সব জমি ভেরির মালিক ছিল বিহারী মণ্ডল, খগেন নস্কর পরিবার। সেই যে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জমির ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করে দেন, যার ফলে এই সব জমির অধিকাংশ খাস জমিতে পরিণত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে সেইসব জমি সিপিএম পার্টির লোকজন ঝাণ্ডা পুতে দখল করে নেয়, বা দখল করিয়ে দেওয়া হয়। যদিও যেসব মানুষ একে দখল করে রাখে তাদের কোনো মালিকানা স্বীকৃতি মেলে না। সে মালিকানা থাকে সরকারের হাতেই। কিছুকাল পরে সরকার বা বলা চলে সিপিএম পার্টি কৃষক বা মৎস্যজীবীদের দখল থেকে ওইসব জমি কেড়ে নিয়ে অন্য আর কাউকে দিয়ে দিতে থাকে। যারা এখানে গড়ে তুলতে থাকে হাসপাতাল, ব্যাঙ্ক, বাজার, হোটেল, লজ, বিবিধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে খুব দ্রুত এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে যায়।
ঘোষবাবুর নির্দেশমতো আমি সেই শেষ বাসস্টপে নেমে চারদিকে তাকাই, কীভাবে বধির স্কুলে পৌঁছাব ভাবি। শেষে জীবনে সেই প্রথম আমি এক রিক্সা সওয়ারি হই। সারা জীবনে আমি কত লোককে রিক্সা টেনে নিয়ে গিয়েছি। কেমন লাগে টেনে নিয়ে যেতে সেটা খুব জানি। জানা ছিল না আমাকে কেউ টেনে নিয়ে গেলে রিক্সার গদিতে বাবু সেজে বসে থাকলে কেমন লাগে। আজ সেটা জানা হয়ে গোখরাপ! একজন তোক লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, একজন লোক গলদঘর্ম হয়ে দুহাতে দুটো ভারি ব্যাগ বইছে, দুটি বাচ্চা স্কুলে যাবার জন্য বাসের আশায় দাঁড়িয়ে আছে, একজন অসুস্থ হাসপাতালে যাবে ভিড় বাসে উঠতে পারছেনা। এসব দেখে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে, আরাম করে বসতে পারছি না আরামদায়ক গদিতে।
জানতে চায় রিক্সা চালক, কোথায় যাবা?
বলি–বধির বিদ্যালয়।
কেন কে জানে রিক্সা চালকের মুখটা ঘৃণায় বিকৃত হয়ে যায়। এক বিজাতীয় আক্রোশে সে আমাকে দেখে। আমি ওই ক্রোধ ওই ঘৃণাকে চিনি। শনাক্ত করতে পারি একে শ্রেণিঘৃণা বলে। এটা কেন হবে? এক বাম নেতার দ্বারা স্থাপিত বামপন্থী কর্মীদের দ্বারা সঞ্চালিত এক স্কুলের প্রতি একজন খেটে খাওয়া মানুষের চোখে এই বিরূপতার প্রতিভাস কেন থাকবে? আমি বুঝতে পারি না।
বলে সে–পাঁচ টাকা ভাড়া লাগবে।
বলি–ঠিক আছে, চলো।
খুচরা আছে তো? আমার কাছে খুচরা নাই।
দশ টাকার নোট দেব, তুমি পাঁচ টাকা দিতে পারবে না?
না।
না, এই শব্দটা যেন প্রবল এক অস্বীকার হয়ে চারদিকে অনুরণিত হতে লাগল, এই না শুধু আমাকে নয়, একটা গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি স্ফুলিঙ্গ। একটি ছোট কিন্তু সশক্ত দ্ৰোহানল।
এবার আমি পকেট হাতড়াই। গুনে দেখি খুচরো পাঁচটাকা আছে। বলি তাকে–চলো, খুচরো আছে।
রিক্সা চালক দাঁতে দাঁত ঘসে, আমি জানতাম তোমার কাছে আছে। বার কত্তি চাচ্ছে না। তাই চাপ দেলাম। চাপ দিলি সবজনা বাপ বলে।
রিক্সা চালাতে চালাতে সে জানতে চায়, বোবা ইসকুলি কে থাকে তোমার?
কেউ না, এমনি যাচ্ছি।
এমনি এমনি কেউ যায় না।
কিছুদূর এসে আবার বলে সে, ওই ইসকুলির সামনে গেলি বুক জ্বলে যায়। কী করব লাইনি গাড়ি রেখেছি, প্যাসেঞ্জার উঠলি না বলার উপায় নি।
কেন বুক জ্বলে যায় কেন?
ওই জমি আগে আমাগের দখলে ছেলো। আমরা চার চাষি চাষাবাদ কত্তেম। আমাগার উচ্ছেদ করে ওভেনে ইসকুল বসেছে। ইসকুল না ছাই, কতগুলোর বোবা কালারে রেখে দেছে। আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ আজও পাইনি।
এতক্ষণে আমি তার ক্রোধের কারণ কিছুটা বুঝতে পারি। ছিল চাষির বেটা, এখন হয়ে গেছে গাড়িটানা ছোঁড়া। রাগ তো হবেই। আলাপ জমাবার চেষ্টায় জানতে চাই, ইসকুলের লোকগুলো কেমন?
