পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সেই কর্মীকে এখন শুধু কাজই করে যেতে হবে, কোনো মাইনে পত্র হাতে পাবে না। পাবে সেদিন–যেদিন সরকার দেবে। কবে দেবে সরকার? না, তা এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। সেই কর্মীর নামধাম–কাগজ পত্র বিকাশ ভবনে পাঠানো হবে। পাঠাবে স্কুলই। বলা হবে এই হচ্ছে হোস্টেলের কুক। তখন সরকার তাকে স্বীকৃতি দিলে বেতন পাঠাবে, তবেই সে বেতন পাবে।
এ যেন সেই গাছ পুঁতে ফলের আশায় পেটে গামছা বেঁধে বসে থাকার মতো ব্যাপার। কবে গাছ বড় হবে, কবে ফল ধরবে তারপর সেই ফল পাকবে তবে আমি খাব। যদি গাছটা ঝড়ে উপড়ে যায়, যদি গাছটা বন্ধ্যা হয়, ফল না ধরে যদি ফল পেকে ওঠার পর অন্য কেউ ছিঁড়ে খেয়ে নেয়, তখন কী হবে? এমন শতেক প্রশ্ন জমা হয়ে আছে কর্মখালির পশ্চাতে।
তাই সেই বোবা স্কুলে রান্নার লোক পাওয়া যায়নি। স্কুল স্থাপন হয়েছে প্রায় এক বছর। এর মধ্যে গোটা চল্লিশ বোবা বাচ্চা ভর্তি হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের নানান জেলা–এমনকী আসাম, ত্রিপুরার এক এক জন আছে। এই ধরনের একটা মাধ্যমিক স্তরের স্কুল শুধু স্থানীয় বাচ্চা দিয়ে চালানো যায় না। রান্নার লোক না থাকায় তাদের খাওয়া দাওয়ায় খুবই সমস্যা হচ্ছে।
এখন দত্তদাকে বলেন বড় সাহেব, একে কালকে সকালে ঘোষবাবুর কাছে নিয়ে যাস আমি বলে দেব। উনি কাজে লাগিয়ে দেবেন।
ঘোষবাবু ভদ্রলোক শহরের উপান্তে সদ্য নির্মিত এক চোখ ধাঁধানো বুকে জ্বালা ধরানো বিশাল ভবনে বাস করেন। উনি আগে আয়কর বিভাগের অফিসার ছিলেন। এমন অফিসার যিনি কোনোদিন ঘুষ নিতে গিয়ে হাতেনাতে সি.বি.আই.-এর পাতা জালে ধরা পড়েননি। এবং তিনিও আত্মবিশ্বাসের সাথে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরেন।
পরের দিন সকালবেলায় আমাকে সাথে নিয়ে দত্তদা গেলেন সেই ঘোষবাবুর বাড়িতে। ওই বোবাদের স্কুলের ইনি হচ্ছেন বর্তমান সেক্রেটারি। কলিংবেল বাজাবার পর কে একজন এসে দরজা খুলে দিল। আমরা বিনা বাধায় পৌঁছে গেলাম দোতলার বসার ঘরে। ঘোষবাবু দত্তদাকে চেনেন, দত্তদাও চেনেন তাকে। ফলে, দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যের হাসি হাসেন।
ঘোষবাবুর একটা বিশেষ ব্যাপার এই যে উনি ভদ্র ভাষায় পরিচিত জনের সাথে কথা বলতে পারেন না। যে ভাষায় পুঁথি পুস্তক লেখা হয় তাকে পুঁথি পুস্তকের জন্য বরাদ্দ রেখে উনি নিজের মনোভাব প্রকাশের জন্য বেছে নেন পদ্মাপারের বাঙাল বুলি। এখন তিনি স্মিত হেসে সামনে রাখা ধূমায়িত চায়ের কাপে একটা চুমুক মেরে জানতে চাইলেন, কী জইন্য তোমাগো এই সাত সকালে আমার এ্যাইখানে আগমন?
যেমন গান তার সাথে তেমন বাজনা না হলে জমে না। আমাদের দত্তদাও এখন নিজস্ব বক্তব্য পেশ করার জন্য বাঙাল বুলির শরণাপন্ন হলেন–আপনের কাছে বড় সাহেব পাঠাইল। এই পোলাডারে বোবা ইকুলে রান্নার কামে লাগাইয়া দেবার জইন্য।
ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন ঘোষবাবু–কতো তো লাগাইলাম। এ্যাক জোনও তো টেকে না। কেউ এ্যাকদিন কেউ এ্যাক বেলা কইরা পালান দেয়। কয় জোন তো আমার বাড়ি বইয়া কামের কতা শুইন্যা আর ইসকুলেরে দ্যাখতে পর্যন্ত গেল না। এ্যাইখান থিকা হাঁটা দিছে।
না, না, এ করবে। আর বাঙাল বুলির উপর আস্থা রাখতে পারলেন না দত্তদা, কলকাত্তাইয়া শুদ্ধ ভাষায় বলেন, একে লাগিয়ে দিয়ে দেখেন এ টিকে যাবে।
কইতে আছো যখন দিমু লাগাইয়া, দেহ কয়দিন টেকে।
দত্তদা, আমার জ্ঞানমতে কোনদিন জ্যোতিষ বিদ্যার চর্চা করেননি। তবু সেদিন যেভাবে বলেছিলেন “টিকে যাবে” মনে হয় আমার ভবিতব্য মানস নেত্রে অবলোকন করে নিতে পেরেছিলেন। বুঝেছিলেন একবার ফাটা বাঁশে আটকে গেলে আর রেহাই পাবার পথ পাবো না।
এবার ঘোষবাবু কোন পথে কোন্ বাসে কী ভাবে সেই বোবাদের স্কুলে যেতে হবে পথ বলে দিলেন। ওই মোড় থিকা বাস পাইবা। এক্কেবারে লাস্টস্টপে গিয়া থামবা, একটু দূরেই যোবা ইসকুল, হাইট্যাও যাইতে পারো, রিকশাতেও যাইতে পারো। তবে পেরথম দিন তো রিকশাতেই যাইও নাইলে চেনবা কী চেনবা না। হোস্টেল সুপারেরে গিয়া আমার কথা কইবা। রাইখ্যা নিবো।
আমি সত্যিই বোকা, বিশ্বজগত সম্বন্ধে একেবারে অনভিজ্ঞ। কদিন আগে ভেবেছিলাম যার কাছে দত্তদা আমাকে নিয়ে যাবে একটা কাজ পাবার জন্য আমার হাত কচলাতে হবে। কাতর হয়ে বলতে হবে, বাবু গো আমি খুব গরিব মানুষ। বউ আর দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে আমার। বউটা একটা আদিবাসী গ্রামে আই.সি.ডি.এস.-এর একটা স্কুলে বাচ্চাদের পড়ায়। যার মাইনে মাত্র সাড়ে চারশো টাকা। এতে সংসার চলে না। প্রায়দিন একবেলা অনাহারে থাকি। দয়া করে আমাকে একটা কাজ দিন। যে কোন কাজ, যাতে খেয়ে পরে বাঁচতে পারি। এসব কথা বলার কোনো দরকারই পড়ল না।
আর এখন? এখন তো কাজই আমার সামনে কাতরাচ্ছে–আমাকে করো। সুখ পাবে।
বলেন ঘোষবাবু, কাজটা কইরো, ছাইড়া দিও না। গরমে কষ্টো হইবো, মাইনা পাইতেও দেরি হইবো, কিন্তু যদি লাইগ্যা পাইড়া থাকো সুখ পাইবা।
চা খেতে দিলেন আমাদের সাথে মুচমুচে নিমকি। বুদ্ধিমান লোক ঘোষবাবু বুঝলেন কিছু লোকের ইহ জগতের চাইতে পরলোকের চিন্তা বড় প্রবল। এই জীবনের সময় সীমা তো পঞ্চাশ একশো বছর। তারপর যে লক্ষ কোটি বছরের অনন্ত জীবন সেটা কাটবে কী করে? উনি ধর্মগুরুর ব্যবসায়িক কৌশলে সেই জীবনের সুখময় সম্ভাবনার দিকটাও তুলে ধরলেন, জগতে যতো রকম মানব স্যাবা আছে সব স্যাবার চাইয়া বড় স্যাবা হইল গিয়া–এইসব কানা খোঁড়া বোবা কালা মাইনষের স্যাবা। এয়ার চাইয়া পুণ্যকাম আর নাই, সেই জইন্য আমি রিটায়ার করনের পর এই কামে মোন দিছি। বড় সাহেব জানে এ্যাক পয়সাও নিইনা। বিনা পয়সায় স্যাবা করতাছি। তোমারেও কই কামডা করো দেখবা ভগবান তোমার ভালো করবে। কী? করবা তো কামড়া?
