কী ব্যাপার রে? কাছে এসে দত্তদাকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি।
একটু তোমার কাছে এসেছি। একটা কথা বলতাম।
কী কথা তাড়াতাড়ি বল।
এই ছেলেটা আমার চেনা। আমাকে দেখান দত্তদা, একে একটা কাজে লাগিয়ে দাও।
কী কাজ?
যে কাজ হোক খাটুনে ছেলে, সব কাজ পারবে।
বাড়ি কোথায়? ভালো করে চিনিস তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ স্টেশনে রিক্সা চালাত, স্টেশনেই থাকত।
দত্তদাকে নিয়ে বড় সাহেবের এই এক ভয়, যাকে তাকে যেখান সেখান থেকে ধরে নিয়ে এসে বলে–আমার অনেকদিনের চেনা। সেই সত্তরের দশকে কোথা থেকে কে জানে কল্যাণ নামের একটা ছেলেকে পাড়াছাড়া পার্টি কর্মীদের কামারপাড়ার শেল্টারে রেখে দিয়েছিল। একদিন সে সুযোগ বুঝে ছয় হাজার টাকা আর দুখানা রিভালবার নিয়ে পালায়। কিছুদিন পরে সেই রিভলবার দিয়ে আসানসোলে এক ব্যাঙ্কে ডাকাতি করে ধরা পড়ে। তবে সে একটাই ভালো কাজ করেছিল
অস্ত্র কোথা থেকে পেয়েছে পুলিশকে বলেনি। সেটা বললে মহা কেলো হয়ে যেত।
এখন দত্তদার জবাবে নিঃশঙ্ক হয়ে বলেন তিনি, কী কাজ দেব বল দেখি! তারপর হঠাৎ কী যেন ভেবে বলেন–রান্না জানে?
এবার আমি জবাব দিই, জানি।
আমি যে রান্নাও করতে জানি সেটা দত্তদা কী করে জানবেন! তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে একটা বিস্ময়।
সিডিউল কাস্ট?
আমি যে সিডিউল কাস্ট, আমার নাম যে মদন দত্ত নয়, মনোরঞ্জন ব্যাপারী সেটাও দত্তদার জানবার কথা নয়। সেই কবে কতকাল আগে এক বুড়ো রাঁধুনি নরেশ ঠাকুরের সাথে এক অনুষ্ঠান বাড়িতে রান্নার কাজে গেলে যে বলেছিল নামটা বদলে বলিস, নাহলে উঁচু জাতের লোক তোর হাতে জল খাবে না। তাই মদন দত্ত হয়েছিলাম, সে কাজটা ছেড়েছি অনেক দিন আগে, নামটা আমাকে কিছুতে ছাড়ছিল না।
বড় সাহেব প্রশ্নটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। জবাব আমিই দিলাম–সিডিউল কাস্ট।
সেই যে এক দাড়িঅলা বুড়ো বলেছেন জীবনের ধন, কিছুই যাবে না ফেলা। আজ মনে হচ্ছে সত্যিই ফেলা যায় না। তখন আমার বয়স উনিশ কুড়ি সেই সময় নরেশ ঠাকুরের সাথে কাজে যেতাম। তার কাছেই শিখেছিলাম বিবিধ রান্না। তারপর এক গ্রাম্য বামুনবাড়ি নাম ভঁড়িয়ে রান্না করে ধরা পড়ে অপমান অপদস্ত হয়ে ক্ষোভে দুঃখে সে কাজ করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ জীবনের এক কঠিন মোড়ে এসে সেই বিদ্যা যে এমন উপকারে আসবে তা কী কোনোদিন ভাবতে পেরেছিলাম। হ্যাঁ, আমি রান্না জানি, বলার সময় তাই আমার গলা কেঁপে ওঠেনি।
দত্তদা আমার অনেক কিছু জানে, চা দোকানে গেলাস ধুয়েছি মুটে মজুর খেটেছি, রিক্সা চালিয়েছি, বোমা ছুঁড়েছি, জেল খেটেছি। এই প্রথম জানল আমি রান্নাও করেছি।
দেখি বড় সাহেবের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত। যেন হারানিধি খুঁজে পেয়ে গেছেন। হয়ত এখন ওনার ইচ্ছে করছে ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে ওঠেন। তবে সেটা পদমর্যাদার পক্ষে শোভন হবে না এই বিবেচনায় সংযত থাকেন।
যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখেন বিশেষ করে বৈষ্ণব ধর্মমতের তারা বলে থাকেন–ভক্ত যেমন পাহাড়ে জঙ্গলে তীর্থে শ্মশানে পাগল হয়ে ভগবানকে খুঁজে বেড়ায়, ভগবানও অনুরূপভাবে হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরে তার প্রকৃত ভক্তকে। পেলেই বুকে তুলে নেন।ঠিক সেইভাবে আমি যেমন একটা কাজ পাবার আশায় পায়ের চপ্পল ক্ষুইয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি, একটা কাজও দেখি আমার জন্য কাম কাতর কামিনীর মতো দুবাহু তুলে দাঁড়িয়ে আছে, এসো সবল, এসো সক্ষম, আমাকে গ্রহণ করো।
সেই কবে থেকে শুনে আসছি–এই পোড়া পশ্চিমবঙ্গে নাকি লক্ষ লক্ষ লোক বেকার। তারা যেমন তেমন একটা কাজ পাবার জন্য পাগলের মতো পায়ের চটি ক্ষয় করে এদিকে ওদিকে ছুটে মরছে। এই তথ্য যদি সত্য হয় তবে এই বঙ্গে যে পত্রিকার ষাট লক্ষ গ্রাহক, যেখানে মাত্র দশ সেন্টিমিটার একটা বিজ্ঞাপনের ধার্য মূল্য নাকি দশ হাজার, যেখানে বিজ্ঞাপন দিয়ে কেউ কেউ কাতর আবেদন জানায় কেন? এসো হে বেকার যুবকগণ প্রচুর কর্মখালি আছে, লোভনীয় বেতন–তোমরা এসে চাকরিটা গ্রহণ করে আমাকে উদ্ধার করো–এটাও তো সত্য। একজন কাজ খুঁজছে পাচ্ছে না, একজন কর্মী খুঁজছে পাচ্ছে না, এই দুই সত্যের মধ্যে আছে সেই মহাসত্য–যাকে বুঝতে হলে সত্যকে শব-চোরাই টেবিলে চিৎ করে ফেলে চিরে চিরে দেখতে হবে।
এই বড় সাহেব বহুঁকায়লিশ বছর পার্টি করছেন। এক সাধারণ সদস্য থেকে পরিণত হয়েছেন ডাকাবুকো প্রথম সারির নেতায়। এর জন্য তিনি কত কী না করেছেন। যেটা করা হয়নি সেটা হল জনসেবা। এবার তিনি সেটাই করবেন। সেই উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছেন একটা প্রতিবন্ধীদের জন্য সংগঠন। সেই সংগঠনের অধীনে গড়ে তোলা হয়েছে মুক এবং বধিরদের জন্য একটা আবাসিক স্কুল।
শহরের সীমার বাইরে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বছর খানেক আগে, এই স্কুলের যেখানে স্থাপনা করা হয়েছে, সেখানকার অধিকাংশ মানুষই বড় গরিব। দিন আনি দিন খাই লোক। এদের কেউ রিক্সা চালায়, ভ্যান চালায় জনমজুর খাটে কেউ কেউ অনুষ্ঠান বাড়িতে রান্নার কাজও করে। এদের স্ত্রী মেয়ে যায় বাবুর বাড়ি বাসন মাজতে কাপড় কাঁচতে রান্নার কাজ করতে।নারী পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ কোথাও কোনো ছোট ছোট কারখানায় সাপ্তাহিক মজুরিতে কাজ করে। এমন একটা দুঃস্থ দরিদ্র অঞ্চলে একটা স্কুলের কাজে লোক পাওয়া যাচ্ছে না এর কারণ কী?
