এইসব পার্টিতে যেসব নেতা–তারা এসেছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে। মনের গোপন অন্দরে লালসা ছিল উচ্চে যাবার। যেদিন তারা ক্ষমতা হাতে পেল–পার্টি আর সরকারি ক্ষমতা, দুটোকে সিঁড়ির মতো ব্যবহার করে এক একজন হয়ে গেল এক একটা ধনকুবের। যারা একদিন জবরদখল কলোনির দরমার ঘরে বাস করত, এখন তারা কে যে কত হাজার কোটির মালিক সে জানে বিদেশের ব্যাঙ্ক।
এই নেতাও তাই। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এপার বাংলায় এসে এনার বাবা কালীঘাটের এক ডালার দোকানে কাজ করতেন। শোনা যায়, বাবা মারা গেলে তাকে দাহ করে শ্মশান থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলেন এই নেতা। বাস ভাড়ার দশ পয়সাও কাছে ছিল না।
আর এখন? চল্লিশ বছর পার্টি করার পর যত টাকার তিনি মালিক পশ্চিমবঙ্গের কতজন শিল্পপতির তা আছে কে জানে! ইনি এখন আর ডি ক্লাস, কমরেড এই সব পাতি শব্দ পছন্দ করেন না। তাই সাহেব। বড় সাহেব।
এক সময় এ দেশেইংরেজ শাসন ছিল। লোকে ইংরেজদের সাহেব বলত। সাহেব এই শব্দটার সাথে জড়িয়ে আছে ভয় মিশ্রিত সম। সাহেব মানে শাসক, কোনো হেঁজিপেঁজি লোক নয়।
এদেশের মানুষ দুশো বছর গোলাম ছিল। বাঙালি রক্তধারায় সেই গোলামির বীজ আজও সুপ্তাকারে বিদ্যমান। এরা একজন স্বাধীন কৃষিজীবীর চেয়ে চাকরিকে বেশি সম্মানের মনে করে। চাকরি যে চাকর বৃত্তি এটা তাদের মনেও থাকে না। সেই গোলাম সুলভ মানসিকতা থেকে চাটুকার প্রবৃত্তি থেকে এরা ওই নেতাকে বড় সাহেব বলে ডাকে। শুনে নেতা খুশি হন।
এখন সব বাম নেতাদের জীবনে বিপ্লব–অর্থাৎ আমূল পরিবর্তন এসে গেছে। অন্য কোন বিপ্লব তাদের দরকার নেই। এখন এসি বসানো ঘরে বাস করেন। এসি গাড়িতে ভ্রমণ করেন। কোথাও নামতে হলে ড্রাইভার আগে নেমে দরজা খুলে দেয়। বড় বড় অফিসার স্যালুট মারে। আগে পিছে বডিগার্ড ঘোরে। পুরো দস্তুর সাহেবি জীবন। আর তিনি শোষিত নন–শাসনকর্তা।
.
সেদিন আর অন্যথা করলেন না, দত্তদা আমাকে নিয়ে গেলেন সেই বড় সাহেবের দরবারে।
তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে। আমি আর দত্তদা গিয়ে পৌঁছেছিশহরের কলরব কোলাহল থেকে বেশ খানিকটা দূরে বাইপাশের সন্নিকটে এক স্টেডিয়ামে। চারদিক উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। অনেক গাছগাছালি। আলো আছে প্রচুর তবে সেই গাছগাছালির কারণে এখানে ওখানে জমাট বেঁধে আছে চাপ চাপ অন্ধকার। এখানে এসে এই সময় জায়গাটাকে কেন কে জানে ভীতিকারক বলে মনে হল। সেই যেমন কোনো পাহাড়ি স্টেশনে গভীর রাতের নির্জনতায় গা ছমছম করে, তেমনই এক অজানা ভয় আঁকড়ে ধরল আমাকে। মনে হল যেন ওই সব অন্ধকারে কোনো অতৃপ্ত বিদেহী আত্মা বসে আছে। কাঁদছেনিঃশব্দে। তার বেদনা বিধুর তপ্ত নিঃশ্বাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
এখানে অল্প কিছু লোক আছে। কর্মচারি বলে মনে হয়। তারা চারদিকে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হয় সব যেন এক প্রেতপুরীর বাসিন্দা। মাটি থেকে কিছুটা শুন্যে তাদের জোড়া জোড়া পা ভাসছে, ছায়া মানুষের মতো তারা দূর থেকে দুরে সরে সরে যাচ্ছে।
বড় সাহেব রোজ সন্ধ্যায় এখানে আসেন, অনেক রাত অবধি থাকেন। বিশেষ বিশেষ লোকের সাথে বিশেষ পরামর্শ করেন। আগামীকাল কী ঘটবে তারই পরিকল্পনা রচেন। সব মানুষেরই ক্ষুধাতৃষ্ণা ঘুম আছে, জৈবিক তাড়না আছে, প্রিয়স্থান পছন্দের গান আছে। সেই রকম শহরের শব্দ দূষণ থেকে দুরে কিছুটা নির্জন কিছুটা নিরিবিলি–এই জায়গাটা বড় সাহেবের বড় প্রিয়। উনি এখানে এসে মনে বড় শান্তি পান।
আমার ব্যাপারটা ভিন্ন। আমি এই স্টেডিয়ামের জন্ম রহস্যের নেপথ্য ইতিহাস কিছুটা জানি। অনেক রক্তপাতময় সেই ইতিহাস। এই স্টেডিয়ামের নামের সাথে জড়িয়ে আছে আঠারোজন অবধূত সন্ন্যাসীর জীবন্ত দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারাবার সেই মর্মন্তুদ কাহিনি। আমার সেই ৮২-র দাউ দাউ দেহ নিয়ে ছুটে বেড়ানো মানুষগুলোর আর্ত মখগুলো চোখের সামনে ভাসে। তাই বুকটা বড় পোড়ে।
আমি আর বেঁটে খাটো দত্তদা দাঁড়িয়ে থাকি গাড়ি পার্কিং-এর জায়গায়। বড় সাহেব যখন বাড়ি যাবেন তখনই আমরা গিয়ে দাঁড়াব তার সামনে। এখন উনি দেখা দেবেন না। জরুরি কাজে ব্যস্ত আছেন।
রাত বাড়ছে, আমাদের চারপাশে ঘনগাঢ় হচ্ছে এই শতাব্দীর তীব্র অন্ধকার। দমচাপা অশরীরী অবয়ব অস্বস্তি আমাকে ছিন্নভিন্ন করছে। বুঝতে পারছি না কী ঘটবে। মনে হচ্ছে কিছু একটা নিশ্চয় ঘটে যাবে আজ। অনেকক্ষণের অধৈর্য অপেক্ষার পর দেখতে পেলাম একটা দরজা খুলে গেল। বের হয়ে এলেন বড় সাহেব। ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলেন গাড়ি পার্কিং-এর জায়গায়।
আমি এই সাহেবকে চিনি যখন তিনি সাহেব হননি সেই ৬৪ সাল থেকে। বলতে গেলে আমি তো এই যাদবপুরেরই মানুষ। সেই যে বাল্যকালে এখানে এসেছিলাম আর ফিরে যাওয়া হয়নি। তাই এখন ওনাকে দেখে সারা শরীরে কেমন একটা অস্থির স্পন্দন অনুভব হল। তিনি ফিনফিনে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে আছেন। সেইপোষাককে আমার মনে হল টকটকে লাল। যেন বহু মানুষের রক্তে ভিজে চুপচুপে। আমার চোখের সামনে সারি দিয়ে উঠে এল অসংখ্য মৃত মানুষের মুখ। তাদের সবাইকে চিনি না, কাউকে কাউকে চিনি।
উনি দত্তদাকে চেনেন। দূর থেকে চোখ কুঁচকে তাকালেন আমাদের দিকে। আমি ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলাম। আশঙ্কায় দুলে উঠল আমার মন–আমাকে চেনে নাকি! যদি চেনে, আর কী কাজ দেবে?
