সেদিনও তার কাছে যাওয়া হল না যার কাছে গেলে আমি একটা কাজ পেতে পারি। সকাল দুপুর হলে দত্তদার বাড়ি এসে, সেখানে খেয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে ফের বিকেল নাগাদ যেতে হয় আর এক বাড়িতে গল্পের ঝুলি নিয়ে। সেখান থেকে আবার আর এক বাড়ি। প্রতিবার সেই গল্পে কিছু না কিছু নতুন সংযোজন করে পরিবেশন করে গেলাম দক্ষ কথক ঠাকুরের মতো অঙ্গভঙ্গি সহকারে।
এইভাবে চার পাঁচ দিন কেটে গেল। সকাল সাতটা সাড়ে সাতটায় আসি, রাত দশটায় ফিরে, যাই। বকর বকর করতে করতে মুখ ব্যথা হয়ে গেল আমার। যেটা একটা ছোট গল্প ছিল তা এখন থানইট মার্কা উপন্যাস। আর ভালো লাগে না। ওদিকে কেনারাম সেও বিরক্ত হয়ে উঠেছে। এসেছিল বাংলাদেশটাকে একটু নয়নভরে দেখতে, এখন তাকে সারাদিন একা একঘরে লকআপে বন্দী আসামির মতো শুয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।
গণেশ এখন সকাল বেলায় রিক্সা চালাতে চলে যায়। তার বউ যায় রান্নার কাজে। একটা ছেলে একটা মেয়ে, তারা যায় স্কুলে। ফাঁকা বাড়িতে একা কেনারাম কী করে সময় কাটাবে? ক্ষুব্ধ গলায় বলে সে–আর বাংলা দেখার দরকার নেই, এবার বাড়ি যাব।
শেষে একদিন অধৈর্য হয়ে বলি, কী হল দত্তদা, কার কাছে যেন আমাকে নিয়ে যাবেন বলেছিলেন। যাবেন না?
দত্তদা মানব চরিত্র সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান রাখেন। তিনি জানেন খুড়োর কলের অপার মহিমা। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল কোনো একটা ছলছুতোয় প্রলোভনের শেকলে বেঁধে দিন কয়েক আমাকে আটকে রেখে আমারই স্বকণ্ঠে তার সেই বীর কথন পরিচিতজনের মধ্যে প্রচার দ্বারা এইটেই প্রমাণ রাখা যে উনি একদা যোদ্ধা ছিলেন। আজকের পার্টিটা দাঁড়িয়ে আছে তাদের সেই কর্মকাণ্ডের ভিত্তিমূলে।
সে কাজ সারা হয়ে গেছে। এখন আর তার এমন কোনো পরিচিত মুখ মনে পড়ছে না, যার কাছেগিয়ে এই গল্প শোনানোয় কোনো লাভ আছে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক সূত্র ব্যবহারিক মূল্যে। এখন আর আমাকে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ফলে আমি থাকলাম, না গেলাম একই গুরুত্বের।
আমার কথায় যেন একটু বিব্রত বোধ করেন দত্তদা। দিয়ে ফেলা প্রতিশ্রুতি থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজেন। বলেন, দ্যাখ, তোকে বলেছিলাম নিয়ে যাব। সে তো যেতেই পারি, কোনো ব্যাপার না। ভাবছি যদি মুখের উপর না বলে দেয়, তখন কী হবে!
তখন কী হবে! কী আর হবে? সজোরে বলি, আমার বোঁচকা বাঁধা আছে। সেনা বলবে, আমি গিয়ে ট্রেনে চেপে বসব। চলে যাব যেখানের লোক সেখানে। এখানে থাকার জন্য তো আসিনি। এসে ছিলাম একটু ঘুরতে। থাকার যদি সুযোগ পাই–ভালো। না পাই আরও ভালো। আপনি একবার নিয়ে তো এবার হাসি ফোটে দত্তদার মুখে। চোখ চকচক করে। যে আত্মগ্লানি তাকে পীড়ন করেছিল তা থেকে অনায়াসে মুক্তি পেয়ে গেছেন। বলেন, তা হলে ঠিক আছে। আজকের সন্ধেবেলায় নিয়ে যাব তার কাছে। সে অনেককে কাজ দিয়েছে। দেবার ক্ষমতা আছে তার। ইচ্ছা করলে তোকেও দিয়ে দিতে পারে। যদি ভাগ্য ভালো থাকে পেয়ে যাবি। দ্যাখ কী হয়।
কার কাছে নিয়ে যাবেন আমাকে? নাম কী?
তুই তাকে চিনিস। গেলেই দেখবি।
তবু! নামটা বলেন না?
বড় সাহেব।
বড় সাহেব! অনেক আগে তখন আমি খুব ছোট, তবু মনে আছে আমার সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির একজন আর একজনকে দেখা হলেই কমরেড বলে সম্বোধন করত। এটা তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় সম্ভাষণ ছিল। যে বলত আর যাকে বলা হতো দুজনের বুকে কী যেন এক মাদলের গুড়গুড় বাজত। এই সম্ভাষণের মধ্য দিয়ে একটা সুমহান বার্তা ছড়িয়ে যেত চারিধারে। শোষণ শাসন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে যে যুদ্ধ প্রস্তুতি চলছে–যার সর্বশেষ পরিণাম আমূল পরিবর্তন-বিপ্লব, সেই বিপ্লবী যুদ্ধের, শেষ যুদ্ধের আমরা সৈনিক।
সে কাল কবে চলে গেছে। সে যেন এক বিস্মৃত অতীত। আর কোন কমিউনিস্ট–যাদের আমরা আমাদের চারপাশে ঘুরতে দেখি–কেউ আর কাউকে হৃদয়ের উত্তাপ মিশিয়ে সেই গালভরা নাম–কমরেড বলে ডাকে না।
মনে আছে আমার, এখনও মনে আছে সেই দিনটার কথা যেদিন একজন আমাদের কমরেড বলে ডেকেছিল। সেদিন গর্বে বুকটা যেন দশহাত ফুলে গিয়েছিল আমার। সেইদিন তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কমরেড কথার অর্থ আর বুর্জোয়া পেটি বুর্জোয় প্রতিক্রিয়াশীল কাকে বলে। বোড়ালের ওদিক থেকে সাদা পায়জামা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি কাঁধে সাইড ব্যাগ নিয়ে তিনি এসেছিলেন। বিড়ি চেয়ে খেয়েছিলেন আমার কাছ থেকে। আর ফিরে যাবার সময় দোতলা বাসের পাদানিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন–চলি কমরেড।সবার দেখাদেখি আমিও মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুলেছিলাম।
সেই বিগত কালে বলা হয়েছিল–প্রত্যেকটি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীকে অবশ্যই ডি-ক্লাসড হতে হবে। বর্ণ ব্যবস্থায় যেমন চতুর্থবর্ণ–অর্থাৎ শুদ্ৰশ্রেণির মানুষ, বাম রাজনীতিতে ডি-ক্লাসড় মানে যারা কায়িক শ্রমের দ্বারা জীবন নির্বাহন করেন। প্রত্যেকটি পার্টি কর্মীর বাক্যে ব্যবহারে মননে, শ্রদ্ধা এবং সম্মানীয় স্থানে সর্বোচ্চ স্থান থাকবে শ্রম জীবনের প্রতিশ্ৰম পুত্রদের প্রতি। কারণ কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিকশ্রেণির পার্টি।
তখন বামপন্থীরা ক্ষমতার স্বাদ পায়নি। চরণদাস চোর যখন প্রতিজ্ঞা করেছিল রাণীকে বিয়ে করবে না, সোনার থালায় ভাত খাবে না, হতিতে চড়বে না–তখন তার দূরতম কল্পনাতে ছিল না যে, কোনোদিন এমন অবস্থা আসতে পারে। তাই প্রতিজ্ঞা করা সহজ হয়েছিল। যেমন বামপন্থীরা জানত না একদিন রাজ সিংহাসনে বসবে। তখন এদের ডালভাতের জোগান আসত শ্রমিকদের চাঁদার টাকায়। তাই তাদের মন ভোলানো একটা দুটো বাণী। যার মধ্যে একটা চটক ছিল সদিচ্ছা ছিল না।
