আমার কাকাজ্যাঠাদের আর্থিক অবস্থা আমাদের চেয়ে ভাল নয়। এক দেশ এক বংশ এক রক্ত যে। তবে এই ক্যাম্প কলকাতা মহানগরের সন্নিকটে বলে এখানকার লোক সেখানে গিয়ে কোন কাজ কর্ম, ছোটখাটো ব্যবসাপাতি করে দু চার টাকা রোজগার করবার পথ করে নিয়েছে। কেউ সজি কেউ হোগলা পাতার মাদুর, কেউ ডিম যে যা পারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে আসে। কেউ কেউ যায় জনমজুর খাটতে।
একদিন বাবা আমাদের নিয়ে চলে এলেন সেই ঘোলা দোতলার ক্যাম্পে। কাকারা কেউ বাঁশ কেউ খড় কিনে দিয়ে খালপারে আমাদের থাকার জন্য একটা ঝুঁপড়ি বানিয়ে দিল। বানিয়ে দিল একখানা মাদুর বোনার তাত। সে সময় গড়িয়া স্টেশন থেকে শুরু করে বানতলা পর্যন্ত হাজার হাজার বিঘে জলাভূমি ছিল। এতে মাছ চাষ হত। এই সব মাছের ঘেরিতে প্রচুর পরিমাণে হোগলা জন্মাত। যে হোগলা পাতায় মাদুর বোনা হয়। ঘোলা দোলতলার রিফিউজিরা এই মাদুর শিল্পের সহায়তায় সেদিনের সেই ভয়ংকর দুর্দিনে কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছিল। এখানকার সব ঘরেই মাদুর বোনা হয়। আমরাও মাদুর বোনা আরম্ভ করলাম।
প্রথমদিকে হোগলা পাতা বিনামূল্যে পাওয়া যেত শুনেছি। ঘেরি মালিকরা ঘেরি সাফ করার জন্য এমনি এমনি দিয়ে দিত এবং খুশি হতো এই ভেবে যে এ কাজে তার পকেটের পয়সা লাগেনি। পরে যখন বুঝতে পারল এর একটা ব্যবসায়িক দিক আছে, তারা দাম হাঁকতে লাগল!
এখন দু আঁটি হোগলার দাম একটাকা, সুতলির দাম আট আনা। এই পুঁজির সাথে দুজন মানুষের সারা দিনের শ্রম যুক্ত হলে যে দুখানা মাদুর তৈরি হবে তার বিক্রয় মূল্য বর্তমান বাজারে তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা। সেই সাড়ে তিন টাকা থেকে পরের দিনের হোগলা সুতলির দাম সরিয়ে রেখে যে টুকু যা পয়সা বেঁচে থাকে তা দিয়ে আমাদের এত মানুষের পেট কী চলে।
সেটা সেই কুখ্যাত ছয়-এর দশকের শুরুর দিক। যখন গ্রাম বাংলা ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দিকে হাটিহাটি পাপা করে এগিয়ে চলেছে। শোনা যাচ্ছে আর এক অঘোষিত মন্বন্তরের পদধ্বনি। তখন ঘোলা দোতলার বাজারে সবচেয়ে মোটা চালের পালি (আড়াই সের) একটাকা বারো আনায় পৌঁছে গেছে। একপালি চাল না হলে আমালের সংসার চলে না। এর সাথে আছে নুন লংকা আর জ্বালানি। তাই চাল কেনবার সামর্থ আমাদের ছিল না। সে সময় কোথা থেকে কে জানে বাজারে বস্তাবস্তা খুদ আসত। যার অর্ধেক ছিল ধুলো কঁকড়। খুদ যে কোথায় সে বহুকষ্টে খুঁজে পাওয়া যায়। ছয়আনা সের সেই ধুলোকাকড় আমরা দুসের বারো আনা দিয়ে কিনে আনতাম। মা তাকে পুকুরে নিয়ে গিয়ে ঘন্টা খানেক ধরে চেলে চেলে ধুয়ে আনতেন। তারপর তা জ্বাল দিয়ে পাতলা জাউ বানিয়ে, না চিবিয়ে আমরা নুন লংকা দিয়ে গিলে গিলে খেতাম। এর চেয়ে আর একটু সস্তায় পাওয়া যেত মাইলোর আটা, আধভাঙা ভুট্টা। এসব খুদ ভুট্টা মাইলো সবই মুরগির খাদ্য। পোলট্রি জন্য তৈরি করা “সুষম আহার”। কী আমাদের ভাগ্য, মানুষ হয়ে আমরা তখন তাই খেয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছি।
আমরা মনে হয় ১৯৬০ সালের প্রথমদিকে ঘোলা দোতলার ক্যাম্পে এসেছিলাম। এর দু বছর পরই তো সেই ভারত চীন সীমান্ত সংঘর্ষের সময় কাল। যার দু বছর পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন। এরই এক বছর আগে ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলন। যে আন্দোলনে পুলিশ মানুষকে সাপ পেটার মত পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। আমি ঠিক জানি না, সেদিন আট না আশি কতজন মানুষ মারা গিয়েছিল। তবে এটা জানি সেদিন শুধু খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন করা মানুষইমরেনি, মারা গিয়েছিল একনির্দয় পাষণ্ড সরকারের সব বিচারবুদ্ধি বিবেচনা শক্তি। জনগণকে খাদ্য বস্ত্র শিক্ষা বাসস্থান চিকিৎসা দেবার জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকার বুভুক্ষু জনগণের উপর এমন নির্মম আক্রমণ চালাতে পারে এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
সেই ছয়-এর দশকে প্রায় সারা দশক জুড়ে পুরো পশ্চিমবঙ্গে নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ আকাল। খাদ্যাভাবে চারদিক যেন জ্বলতে আরম্ভ করেছিল তীব্র ক্ষুধার দহনে। মানুষকে তখন আর মানুষ বলে চেনবার উপায় ছিল না। কিছু ধনী আর মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাদে সারা গ্রামবাংলা জুড়ে দেখা যাচ্ছিল আপামর মানুষের কঙ্কালসার মৃতপ্রায় এলোমেলো চলাচল।
আমাদের সেসব দিনে আর ভুট্টা মাইলো খুঁদ কেনবার মতো ক্ষমতাও ছিল না। তখন মাদুর যে আর বিক্রি হয় না। মানুষের পেটে খাদ্য নেই, মাদুর কিনে কী করবে! সেই সময় আমাদের বঙ্গদেশের একবুদ্ধিমান মুখ্যমন্ত্রী অন্নহীন বঙ্গবাসীকে বাণী দিয়ে ছিলেন-কঁচাকলা খাও, কাঁচাকলায় ভাতের চেয়ে প্রোটিন বেশি। মনীষীদের বাণী কোন ফালতু জিনিস নয়। কিন্তু কলা তা সে পাকা হোক বা কঁচা সে তো মুফতে মেলে না। পয়সা দিয়ে কিনতে হয়। পয়সা কোথায় আমাদের কাছে। অবশ্য নিজের কলা বাগান থাকলে সে কথা আলাদা। আমাদের তো বাগান করার মত একফালি মাটিও নেই। আমরা এক খাল পাড়ে কুড়েঘর বানিয়ে বাস করি। সে এমন কুড়ে যার মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়ান যায় না, ঘরের চাল মাথায় ঠেকে যাবে। ঘরে ঢুকতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে, বের হতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। মনে হয়, সেই আদিম অতীতকালে প্রথম গুহাবাসী মানুষ গুহা ছেড়ে যেদিন বাইরে এসেছিল আর বসবাসের প্রয়োজনে সেদিন তার অনভিজ্ঞ হাতে প্রথম যে কুড়ে ঘর খানা বানিয়ে ছিল, সে-ও ছিল এর চেয়ে মজবুত এবং সুন্দর।
