তারপর? প্রশ্নটা মহিলার বাচ্চা মেয়ের।
আমরা তো বোমা মেরেই ছুটে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর যে কী হল কী করে জানব। তারপর আপনি কী করলেন দত্তদা?
আমার একটুখানি জিরোনো দরকার। অনেক খেলিয়েছি। মুখ ব্যথা হয়ে গেল। এবার সে খেলুক। গল্পের বলটা দত্তদার গোলে ঠেলে দিলাম। উনি লুফে নিলেন। তারপর সে যা বলে শুনে সারা শরীর কেঁপে ওঠেআমার।কীবরাত জোরে বেঁচে গেছি সেদিন। জানতে পারি দশ সেকেন্ড-মাত্র দশটা সেকেন্ড পালিয়ে যেতে দেরি করলে আট জনই লাশ হয়ে যেতাম। প্রথম বোমটা পড়ার পর দত্তদা একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল। কী পড়ল ওটা? পরের বোমাটা পড়ার সাথে সাথে বুঝে যান ব্যাপারটা। আর চকিতে কোমর থেকে হাতে তুলে নেন থ্রি এইট ক্যালিভারের মেড-ইন চায়না। ধাওয়া করে যান আমাদের দিকে লেভেল ক্রশিং পর্যন্ত। সেদিন তার কোমর থেকে হাত পর্যন্ত রিভালবার উঠে আসতে যেটুকু সময়–সেই সময়টুকু এগিয়ে থাকায় উনি আমাদের রিভালবারের রেঞ্জে পাননি। না হলে সব কটাকে শুইয়ে দিতেন।
এইভাবে গল্প এগিয়ে চলে শেষ পরিণতির দিকে। বলে চলেন তিনি-কী ভেবেছিলি সেদিন, আমাকে এ্যাটাক করে পার পেয়ে যাবি? পারলি? আমি সেইদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যদি তুই দশ হাত মাটির তলে গিয়েও লুকাস, আমি তোকে টেনে বের করব।
একটু থামলেন তিনি। একটু হাসলেন–বুঝলে রমা, ওকে ধরে তো নিয়ে গেলাম। নিয়ে গিয়ে ভাবলাম–মেরে তো ফেলতেই পারি সেটা কোনো ব্যাপার না। শত হলেও গরিব ঘরের ছেলে। কেউ ওকে ভুল বুঝিয়ে ওই পথে নিয়ে গেছে। যদি একটা চানস দিই, যদি কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক বুঝতে পারে আমাদের একজন লোক বাড়বে। তাই শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলাম।
শেষ পর্যন্ত তাহলে গল্পটা, না না গল্প নয় সত্যি কাহিনিটা এই দাঁড়াল যে উনি আমাকে ধরে নিয়ে যান এবং উনিই আমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসেন। আর যেভাবে জেনারেল নিয়াজি পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে মেজর জেনারেল মানেকশার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল–আমি স্বীকার করে ছিলাম দত্তদার বশ্যতা। সেদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম–আজ থেকে আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব। ন্যায় অন্যায় বুঝি না, আপনার হুকুম হলে দিনকে রাত বানিয়ে দেব।
সেদিন সেইরাতে সেই বাড়িতে বসে লক্ষ লক্ষ মিথ্যা এই জন্য বলতে হচ্ছিল শুনতে হচ্ছিল, শুনে দাঁত কেলাতে হচ্ছিল–দত্তদা আনন্দ পাচ্ছেন। তিনি আনন্দ পেলে আমাকেও আনন্দিত হবার ব্যবস্থা করে দেবেন, পাইয়ে দেবেন একটা কাজ। যে কাজে মাইনে মেলে। যে মাইনেয় খেয়ে পরে বেঁচে থাকা যায়। আর তা হলে আমি আমার বউ বাচ্চাদের সেই আদিম অরণ্য থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারব আধুনিক শহরে। বাংলার কোনো এক কুঁড়ে ঘরে। আবার ওরা বাংলার জলমাটি হাওয়া গায়ে মেখে বাঙালি হয়ে উঠতে পারবে। বাংলা ভাষায় কথা বলবে বাংলায় হাসবে বাংলা স্বপ্ন দেখবে।
আমার বন্ধু দিবারাত্রির কাব্য পত্রিকার সম্পাদক আফিফ ফুয়াদ একবার দণ্ডকারণ্যে আমার ঠিকানায় আমাকে খুঁজতে গিয়েছিল। চারপাঁচ দিন ছিল আমার ওখানে। তখন সে আমার ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখে বড় কষ্ট পেয়েছিল। ওরা আর বাংলায় কথা বলতে পারে না। যে ভাষায় কথা বলে সে বাংলা হিন্দি ছত্তিশগড়ি আর গোণ্ডবুলির এক জগাখিচুড়ি। দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বলেছিল ফুয়াদ–এ কী করলে মদনদা, ছেলেমেয়ে দুটোকে আদিবাসী বানিয়ে দিলে।
আদিবাসী আমার কাছে এক সম্মানীয় শব্দ। এক সহজ সরল অনাবিল জীবন। বাংলার এক কবি সেই জীবন চেয়ে করুণ স্বরে বলে ছিলেন দাও ফিরে সে অরণ্য, লহ এ নগর। নাগরিক সভ্যতার নাগপাশ ছিঁড়ে সে জীবনে যুক্ত হওয়া সোজা কথা নয়। আমার চেনা একজনই তা পেয়েছিলেন তিনি শঙ্কর গুহনিয়োগী।
আমি পারিনি। আজও আমার মন কাঁদে বাংলাদেশ বাংলা ভাষা বাঙালি সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতা মহানগরের জন্য। আমার মনেহয় আমার ছেলেমেয়েকে সেই মহান উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ওদের জন্যই আমার বড় কষ্ট। এখন আমার একটাই কামনা–ওদের শেকড়ের কাছে নিয়ে আসা। বাঙালি হয়ে উঠতে সাহায্য করা। এই কারণে হজম করে চলি এক আত্মপূজা-আত্মস্তুতি ভরা বাঁচাল বাখান।
অনেক রাত তখন। তা প্রায় দশটা তো হবেই। গল্প শেষ হবার পর পথে বের হই আমরা। দত্তদা এখন খুবই তৃপ্ত। খুউব খুশি। হাঁটতে হাঁটতে বলেন তিনি, যার কাছে তোকে নিয়ে যাব বলেছিলাম, আজ তো যাওয়া হল না। কাল নিয়ে যাব। কাল সকাল সাতটার মধ্যে আমার বাড়ি চলে আয়।
রাতে ফিরে এলাম সুভাষগ্রাম–গণেশের বাড়ি। আমিই কিছু টাকা দিলাম আমাদের খাবার খরচা। গণেশ কিছুতে নেবে না। বললাম টাকা না নিলে খাব না। শেষে নিল।
রাতটা সেখানে কাটিয়ে পরের দিন আবর এলাম দত্তদার বাড়ি। আজ উনি আমাকে নিয়ে গেলেন এক বৃদ্ধার কাছে। যাকে এই অঞ্চলের ছোট বড় সব সিপিএম বড়মা বলে ডাকে। বড়মার ছেলে বলা বাহুল্য এক বড় নেতা। বড় নেতার বাড়িখানাও বড়। সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে আবার আর এক বাড়ি। তারপর আর এক বাড়ি। এরা সব নেতা। প্রতিবার প্রত্যেকটা বাড়িতে সেই এক গল্প ফেনিয়ে ফুঁপিয়ে ফুলিয়ে বলা হচ্ছে। অভিনয় করে দেখানো হচ্ছে। আমি এক সময় দিন কয়েক বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যের নাটকের দল নবান্নতে যুক্ত হয়েছিলাম। ‘দেবী গর্জন’ নাটকে অভিনয় করেছিলাম। সেই শিক্ষা এখন বেশ কাজে লেগে যাচ্ছে।
