সেই মদন যখন নকশাল করত, ভাবতে পারিস, আমি তার বুকে রিভালবার ঠেকিয়ে তুলে সোজা কামারপাড়ার নিয়ে এসেছিলাম। তুই যদি শের হোস তো আমিও সোয়াসের। বাপের বাপ।
সত্যিই আজ আমার দত্তদার মনে কষ্ট দেওয়া ঠিক হয়নি। যেটা হয়েছে সবটা একেবারেই অজ্ঞাতসারে। আগে ভাগে একটু জানান দেওয়া থাকলে একটা স্টেজ রিহর্সাল দিয়ে মূল মঞ্চে আসতাম। কিছু চোখা চোখা সংলাপ মুখস্থ করে রাখতাম। জীবনটাই যখন নাটক, এখন না হয়। আর একটু নাটকীয় হয়ে উঠতাম।
বুঝিয়ে বলি তাকে, অনেকদিন আগের কথা তো, মনে হয় সেটা বাহাত্তর সালের ঘটনা তাই? এতদিন পরে সে সব কী আর ঠিকমতো মনে থাকে। তাই কেমন করে যেন একটু ভুলভাল হয়ে গেছে।
মেঘ সরে গিয়ে ওনার চোখেমুখে ঝলমল করে উঠল রোদ–চল! গড়িয়াহাট থেকে বাসে করে আমরা এসে নামলাম বাঘাযতীন মোড়ে। এলাম আর এক বাড়িতে। এখানে তার এক অতি পরিচিত মহিলা থাকে। সে এক অঙ্গনওয়ারি শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষিকা।
এই মহিলার সঙ্গে মেলামেশা দত্তদার বউ মেয়ে যেমন সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি, পারেনি এই মহিলার স্বামীও। পুকুরে জাল দিয়ে বড় মাছটা এ বাড়িতে দিতে আসা দু পক্ষেরই অপছন্দের।
তবে স্বামী বেচারার দত্তদাকে যতই অসহ্য লাগুক কিছু বলতে পারে না চোখ কুঁচকে তাকানো ছাড়া। সিপিএম পার্টির সদস্য মানে দারোগার মত পাওয়ার। বিপদে ফেলতে কতক্ষণ।
বাড়ির ভিতরে ঢুকে দত্তদা এমন হাঁকডাক শুরু করে দিলেন যেন বাড়ির কর্তা অফিস থেকে বাড়ি ফিরল। মহিলার শাশুড়ির জন্য কিছু ফল পাকুড় এনে ছিলেন, ডেকে সেগুলো তাকে দিলেন দত্তদা। বললেন–মা, তোমাকে সামনের মাসে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। মহিলার মেয়েকে কাছে ডেকে গাল টিপে আদর করে হাতে ক্যাডবেরি দিলেন। মহিলাকে বললেন তোমার জন্য কিছু আনিনি, পাওনা থাকুক। পরে দেব। সে কথায় মহিলা মিষ্টি করে হাসলেন। বললেন-কবে? পুকুরে যেদিন জাল নামাবে? কেন কে জানে এ কথায় দত্তদা লজ্জিত হলেন।
এইসব টুকটাক একথা সে কথার পরে শুরু করে সেই কথা। যে কথা বলার জন্য এই সময়ে এখানে ছুটে আসা। শুরুটা এই রকম–একে চেনো? এক সময়ে এই অঞ্চলে নামকরা মাস্তান ছিল। বাঘাযতীন থেকে যাদবপুর, ওদিকে পালবাজার থেকে সেলিমপুর–এক ডাকে সবাই চিনত। এর নাম মদন। শুনেছ নাম? কী করে শুনবে, তোমরা এখানে আসার অল্প কয়েক মাস আগে ও ছত্তিশগড়ে চলে যায়। চার পাঁচটা থানা লালবাজার সব ওকে খুঁজছিল। ধরলেই গুলি। আশু মজুমদারের ডান হাত ছিল যে। একটু থেমে চোখে মুখে একটা আত্মপ্রসাদ এনে ফের বলে সে, পুলিশ যা পারেনি, আমাদের পার্টির কেউ যা পারেনি সেটা করেছিল এই দত্ত। ওকে যাদবপুর স্টেশন থেকে ধরে মাথায় রিভালবার ঠেকিয়ে সোজা কামারপাড়ায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম আমি। বল, নিয়ে যাইনি?
এখন আর কথা নয়, নাটকের এক চরিত্রের মতো ডান হাতের তর্জনিটা ট্রিগার টানার ভঙ্গিতে বাঁকা করে সেটা সজোরে আমার কানের পাশে রগের উপর চেপে ধরল। এই ভাবে–জায়গাটা ব্যথায় টনটন করে উঠল আমার।
হাত সেইভাবে চেপে রেখে দত্তদা গর্জে ওঠেন, যদি পালাবার চেষ্টা করত, খুলি উড়িয়ে দিতাম। বলেও দিয়েছিলাম, বাঞ্চেৎ চুপচাপ চল। যদি না যাস, যদি চেল্লাস কুকুরের মতো গুলি করে মারব। কোন বাপ আজ তোকে বাঁচাতে পারবে না।
হাত সরিয়ে নিয়ে এবার আমাকে হুকুম করেন, বলতো, সেদিন কীভাবে তোকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম, তুই তোর নিজের মুখেই বল। এ তাও
দত্তদা জানেন না, তার জানবার কথা নয় যে আমি এক সময় গল্প লিখতাম। শহর কলকাতার এবং জেলারও অনেক কাগজে আমার লেখা ছাপা হয়েছিল। পত্র পত্রিকার কারণে বহু মানুষ জানত যাদবপুরের এক রিক্সাওয়ালা লেখে।
এখন আমি দত্তদাকে সন্তুষ্ট করবার চেষ্টায় একখানা জব্বর শিকার এবং শিকারি বিষয়ক কাহিনীর নির্মাণ করি। আমি যেন এক ভয়ঙ্কর অরণ্য গভীরে থাকা নরখাদক। যে মাঝে মাঝে বন থেকে বের হয়ে এসে হানা দেয় লোকালয়ে আর তুলে নিয়ে যায় ঘুম কাতর মানুষ। এইভাবে কত যে মানুষ খেয়েছি গুনেও রাখিনি।
আর আমাদের পৌনে পাঁচ ফুট দত্তদা হচ্ছেন সেই শিকারি যে আমাকে মারবার জন্য মেড-ইন-চায়নার একটা ছ’ঘড়া রিভালবার নিয়ে প্রাণ হাতে করে সেই জঙ্গলে ঢুকেছে। সে যে কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কখনও বাঘ আগে শিকারি পিছনে, কখনও শিকারি আগে বাঘ পিছনে। কে যে কার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে কিছু ঠিক নেই। যে আগে কঁপাতে পারবে সে জয়ী হবে। যে একটু হিসাবে ভুল করবে তার মৃত্যু অবধারিত। জীবন মরণের খেলা, এখানে দয়াক্ষমার কোন প্রশ্নই নেই।
বলে চলি আমি, একবার খবর পেলাম যে উনি, নয় নাম্বার বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন। একা। ওনার তো খুব সাহস ছিল, যেখানে যেতেন সবখানে একাই চলে যেতেন। তো আমরা আট জনের একটা দল বানিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লুকিয়ে চলে এলাম নয় নাম্বার বাসস্ট্যান্ডে। আমাদের কাছে দুটো হেভি বোমাও ছিল। দূর থেকে দেখলাম খবর পাক্কা। উনি দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনার সামনে। খইনি ডলছেন। তখন খইনি খেতেন। এখন খান? ব্যাস ছুড়লাম একটা বোমা। আমাদের ভাগ্য খারাপ না ওনার ভাগ্য ভালো তা জানিনা, বোমাটা ফাটল না। সাথে সাথে আর একটা ছুড়লাম, সেটা পিছলে মেঘনার মধ্যে ঢুকে গেল, সেখানেইফাটল। শোকেস-ফোকেস সব চুরমার।
