আর ছেড়ে কী হবে। যা ক্ষতি হবার সে তত হয়েই গেছে। মদে মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে, স্মৃতিশক্তি ধ্বংস করে দেয়। তোর আর কিছু মনে রাখার ক্ষমতা নেই। যারা মদ খায় এইরকম হয়। কী সব ভুলভাল বকে গেলি। রিভালবারটা তো আমার হাতে ছিল। আমি তোর বুকে এইরকম চেপে ধরেছিলাম। আর তুই বললি নানুর নাম?
আমার মনে আছে, নানুর ডান হাতে–
বাল মনে আছে তোর। পথচলা লোকজন অস্বীকার করে দত্তদা চিৎকার করে ওঠে–আমি বলছিআমার হাতে ছিল। মেড-ইন চায়নার মাল। মোট চারখানা এসেছিল কামারপাড়ায়। আমাদের চারজনের কাছে থাকত। শিবুদা, খোকা, মোহিত আর আমি।নানু জীবনে ওই মাল চোখে দেখেছে?
একজন দুঃখী মানুষ। এই সময়কালে এই দেশে একজন সবচেয়ে দুঃখী মানুষ আমাদের দত্তদা। রামপ্রসাদের গান আছে–সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল সকলি ফুরায়ে যায় মা। জীবনে তার কত কিছু আশা ছিল সাধ ছিল কিছুই আর পূরণ হল না।
প্রথমে ভেবেছিল একজন নামকরা মস্তান হবে। সেইমতো সে হাঁটা চলা কথাবলার অভ্যাস করেছিল। তবে শুধু ওতেই তো হয় না একটা বলবান দেহও দরকার। সবল শরীরের মধ্যেই সাহসী মন নিরাপদে বাস করে। সাহসী মনের সাহায্য ছাড়া মাস্তানি মনোবৃত্তি উদ্বাহু হয়ে উড়ে যায়। দত্তদার উচ্চতা মাত্র পৌনে পাঁচ ফুট। তার উপরে দেহে নানা রকম বংশানুক্রমিক রোগের উৎপাত। ফলে হাড়ের কাঠামোয় মাংসের প্রলেপ খুবই কম। এই দেহকাণ্ড নিয়ে মেরে শেষ করে ফেলব’ হুমকি দিলে লোকে ভয় পায় না। মুখ লুকিয়ে হাসে। পরে ভাবল নেতা হবে। সে সময় অনেক মস্তানই পার্টিতে ঢুকে নেতা হচ্ছিল। তাই, সেই আশায় ঢুকে পড়ল সিপিএম পার্টিতে। কিছুদিন তাদের সাথে ঘুরে বুঝল নেতা হতে গেলে মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে গর্জন করে বক্তৃতা দেবার ক্ষমতা দরকার। রোগগ্রস্ত হাড় গিলগিলে শরীরে ততখানি দম নেই। একটা দুটো কথা বলার পরে বুকে হাঁপ ধরে। তাছাড়া বক্তৃতা দিতে হলে প্রচুর তথ্য তত্ত্ব সংগ্রহে রাখা দরকার। সে জন্য মোটা মোটা বই পড়তে হয়। বইটই পড়ায় ওনার চিরদিনের বিতৃষ্ণা। সেটা করলে তো কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণিটা উত্তীর্ণ হতে পারতেন।বই তো দূর, উনি ওনার পার্টির মুখপত্র গণশক্তিটাও ঠিকমতো পড়েন না। রাখতে হয়, তাই একটা রাখেন। মাসের শেষে কাগজগুঅলাকে পয়সাটা দিয়ে দেন।
নেতা হয়ে উঠতে হলে আর একটা গুণ দরকার–যাকে বলে জনসংযোগ। মানুষের কাছে যাও, তাদের কথা শোন। তাদের বিপদে আপদে বন্ধুর মতো পাশে গিয়ে দাঁড়াও। বিশ্বস্ত হয়ে ওঠো …।
ওসব করতে গেলে সঠিক সময়ে চান খাওয়া ঘুম, সব যাবে মায়ের ভোগে। আজ হাসপাতাল, কাল থানা, পরশু পঞ্চায়েত ভবন, তারপরের দিন আর কোথাও, সেই করতে গেলে ঘর সংসার, ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছু হবে বরবাদ। যাদবপুর এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিভিন্ন স্থানে প্রায় শ’খানেক পুকুর ভেরি লিজে নিয়ে তাতে মাছের চাষ করেন। উনি যদি জনসংযোগ করে বেড়ান। সে সব কে সামলে রাখবে?
তাই, তার অনেক পরে পার্টিতে ঢুকে অনেকে অনেক উঁচু পদে চলে গেছে, উনি এখনও পড়ে আছেন এক সাধারণ সদস্য হয়ে।
জীবন এক কঠিন সাধনার নাম। জীবন এক কঠিন লড়াইয়ের নাম। সেই যে একজন লোক বলেছিল “চালাকির দ্বারা কোনো মহৎকার্য সিদ্ধ হয় না”। ফাঁকিবাজি দিয়েও জীবনের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া যায় না কোনো মহোত্তম দান। তাকে পেতে হলে এক নিরলস সাধনার দ্বারা, হার না মানা লড়াইয়ের দ্বারা প্রাপ্ত করতে হয়। যে তা পারে পৃথিবী তাকে বরণ করে নেয়, যে তা পারে না বিস্মৃত হয়ে যায়। বুদ্ধ কিংবা আলেকজান্ডার, হিটলার কিংবা লেনিনমত পথ তাদের যাই হোক, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু ওই উচ্চতা ছুঁতে হলে শুধু ভাগ্য হলে চলবে না, সেই ভাগ্যকে চাবুক মেরে চালিয়ে নিতে নিজের মধ্যে প্রচণ্ড পুরুষকারকে জাগাতে হয়।
দত্তদার এটাই ব্যর্থতার বড় কারণ। উনি সবকিছু বড় আরামে, অনায়াসে পেয়ে যাবেন, আশা করেছিলেন। অনেক বছর পরে যখন হিসাব নিকাশের ঝুলি উবুর করলেন, দেখলেন, শুন্য ঝুলি শূন্যই রয়ে গেছে। কাউকে দেখাবার মতো ঝুলতে কিছু অবশিষ্ট নেই।
এই ব্যর্থতা দুঃখবোধের মধ্যে সারা জীবনের সঞ্চয় আর সান্ত্বনার-সফলতার অবলম্বন ছোট সেই ঘটনাটা। যাকে স্মরণ করে তিনি নিজেকে এক মহাকাব্যের নায়ক ভেবে পুলকিত হন।
তোরা জানিস না, এই যে পার্টিটাকে আজ এতবড় দেখছিস একে এই জায়গায় নিয়ে আসার জন্য আমরা কত কী না করেছি। তখন মরব না বাঁচব সে চিন্তা করিনি। এখন আমাদের বয়েস হয়ে গেছে, যখন অল্প বয়স ছিল বাঘের মতো সাহস ছিল আমার। নাম শুনেছিস মদন। তোরা কী করে জানবি, তখন তোরা কোথায়? সে জানে তোদের বড়রা। মদন, সে একখানা জিনিস ছিল। কামারপাড়ার মধ্যে একা ঢুকে কার্তিককে চাকু মেরে চলে গিয়েছিল। মারত মণি, শিবশংকরকেও। ওরা কোনোমতে পালিয়ে প্রাণে বাঁচে।
তোরা টিবি হাসপাতালের হরেরামের নাম শুনেছিস? মার্ডার হয়েছিল।হরেরামকেবাঁচাতে গিয়ে সেইদিন সেই জায়গায় তার এক বন্ধু কী যেন নাম–সেও মারা যায়। দুজনকেই গুলি করে মারে। যে হরেরামকে গুলি করে মারে কোথায় গিয়ে লুকিয়ে ছিল জানিস? পুলিশ তাকে খুঁজে পাচ্ছিল না–মদন তাকে খুঁজে বের করে কুপিয়ে মারে।
