বলেন দত্তদা, আসল মাওবাদী, ছত্তিশগড়ে থাকে। আগে এখানে থাকত। নকশালদের নেতা আশু মজুমদারের ডানহাত ছিল। এক সময়ে এর ফটো লালবাজারের বোর্ডে টাঙানো ছিল–যে ধরে দেবে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার। তাই এখান থেকে পালিয়ে ছত্তিশগড়ে চলে যায়।
এখন সব নাবালক আমাকে দেখে, যেন চিড়িয়াখানার বাঘ। এই মাত্র খাঁচা খুলে বাইরে বের হয়ে এসেছে।
দত্তদা বলে চলেন, দেখতে এই রকম হলে কী হবে এক সময় পাঁচটা থানার এলাকা ওর নামে থরথর করে কাঁপত। তোরা তখনও জন্মাসনি। তখন ওর সামনে যাবে এমন বুকের পাটা কারও ছিল না। সে সময় ও কত যে খুন করেছে গোনা গাঁথা ছিল না।
আমার এখন অস্বস্তি লাগছে, অসহ্য লাগছে দত্তদার বুকনি। সেই সত্তরের দশকে দুদিন কী একটু করেছিলাম, তাকে এত বছর পরে এমন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তিলকে তাল বানিয়ে বলার কোনো মানে খুঁজে পাই না। যা সে আমার সম্বন্ধে বলে চলে তাতে যে কেউ মনে করবে আমি সেই শোলে ছবির গব্বর সিংয়ের মতো এক নির্দয় ডাকাত। খুন যার কাছে পিঁপড়ে মারার মতো তুচ্ছ ব্যাপার।
আসলে এটা হচ্ছে মূল কাহিনির ভূমিকা। যে কাহিনির নায়ক উনি নিজে, উনি আমাকে যদি কাহিনিতে গব্বর সিং না বানান নিজে বচ্চন বনবেন কেমন করে? আমাকে যা বানানো হচ্ছে সে নাটকের দাবি মেটাতে। দর্শক শ্রোতাদের তৃপ্তি দিতে।
চা এসে গেছে সাথে নিমকি। চায়ে চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রেখে পিছনে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে চোখ নাচিয়ে মুখে এক গর্বিত হাসি এনে ফের বলেন দত্তদা, ও আমাদের পার্টির সে সময় খুব ক্ষতি করেছিল। যখন তখন কামারপাড়ায় ঢুকে আমাদের মূল ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে চলে যেত। কোনোমতে ওকে ঠেকানো যাচ্ছিল না। কেউ সাহসই পাচ্ছিল না ওর মুখোমুখি হতে।
চায়ে চুমুক। তখন আমাদের নেতা চৌধুরিদা আমাকে বলল আর কেউ পারবে না, তোকেই এই দায়িত্বটা নিতে হবে। যেভাবে পারিস ওকে থামিয়ে দে। থামিয়ে কথার মানে বুঝিস? বললাম চৌধুরিদাকে দায়িত্ব নিলাম। সাতদিন-মাত্র সাতটা দিন সময় দাও। ওকে জ্যান্ত ধরে কামারপাড়ায় নিয়ে আসব।
গল্প শোনা বছর বারোর একজন বড় অবাক, তোমার ভয় করেনি? যদি মেরে দেয়?
ভয়! হাসলেন দত্তদা, ভয় কাকে বলে এই শর্মা কোনোদিন তা জানে না। এখন বয়স হয়ে গেছে, দেখিসনি তো আমার সেই অল্প বয়সের মূর্তি। জানে এই মদন। বল তো রে তোকে যে কামারপাড়ায় ধরে নিয়ে গেছিলাম সেই গল্পটা বল। এরা সব সময় বলে আমার নাকি সাহস নেই। বলত সেই ঘটনাটা।
তখন সন্ধে নেমেছে। দোতলার এক কোণের ঘরে বসে আছি আমরা। সে ঘরে আলো অপ্রতুল। ভয়ের গল্প শোনার পক্ষে একেবারে যথাযথ পরিবেশ। চার পাঁচজন নাবালক ঘিরে বসে আছে আমাদের। তারা এত মারাত্মক মানুষ আগে আর দেখেনি। যে মুরগির মতো মানুষ ধরতো আর কচ করে গলাটা কেটে ফেলত। এমনিতে তাকে দেখে ভয় পাবার কথা। সেটা পাচ্ছে না, কারণ সেই দত্ত মামা সন্নিকটে আছে, যে লোকটার চেয়েও মারাত্মক।
দত্তদার আদেশে বলা শুরু করি–আমি সেদিন যাদবপুর স্টেশনে ছিলাম। আমার তো তখন ঘরবাড়ি ছিল না, স্টেশনেই থাকতাম। তো সেদিন ভোরবেলায় একদল ছেলে ফুটবল খেলতে খেলতে স্টেশনের পুলিশ ক্যাম্প থেকে রাইফেল ছিনতাই করে পালাল। দু’পক্ষের মধ্যে চাকু গুলি চলেছিল, তাই ভয় পেয়ে আমি হাসপাতালের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে রাজা সুবোধ মল্লিক রোডের দিকে যাচ্ছিলাম। যেই আমি ক্যান্টিনের কাছে এসেছি কোথা থেকে কে জানে উনি আর নানু দুজনে আমাকে ধরল। ছুট মেরে যে পালাব শরীরে শক্তি ছিল না। চারদিন পেটে একদানা খাবার পড়েনি, শুধু জল, তার উপর আট নয়দিন আমাশা হয়ে হাসপাতালে থেকে এসেছি। কী করব, ওনারা ধরে নিয়ে গেলেন।
সেই কথাটা বললি না?
কোন কথাটা!
তোর পিঠে রিভালভার ঠেকানো হয়েছিল।
ওঃ হ্যাঁ, নানুর হাতে রিভালবার ছিল একটা, সেই ভয়ে আরও ছুটতে পারিনি, ছুটলে যদি গুলি করে। এই আর কী!
এই গল্প এতই সাধারণ যে কারোরই ঠিক মন ভরল না। কোথায় সেই রহস্য রোমাঞ্চউত্তেজনা? এদিক থেকে গুলি চলবে, গুড়ুম। ওদিক থেকে গুলি চলবে গুড়ুম। কয়েক ঘন্টা ধরে যেন গুলির বৃষ্টি হবে। যেমন সিনেমায় হয়। এরপর দত্ত মামা বুকে হেঁটে গুলি বৃষ্টি উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গিয়ে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে ধরে ফেলবে। টানতে টানতে কামারপাড়ায় নিয়ে যাবে। এমন কিছু না ঘটায় দত্তদার মুখটা এখন মেঘের মতো কালো। আমি যেন তাকে বঞ্চিত করে দিয়েছি তার প্রাপ্য সম্মান থেকে। যেন তার পকেট থেকে হারিয়ে গেছে শেষ পারানির সম্বল। সব হারিয়ে বেচারা এখন নিঃস্ব রিক্ত–সর্বস্বহারা পথের পথিক।
আর অল্প কিছুক্ষণ সেখানে বসে কিছু এলোমেলো কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। শুধু শুধু বসে কী বা হবে কোনো গল্পই যে জমছে না। সব কেমন ছানা কেটে যাচ্ছে। গড়িয়াহাটের দিকে যেতে যেতে ক্ষুব্ধ গলায় বলে, মদ তোর বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
বলি, মদ আমি আর খাই না। ছেড়ে দিয়েছি।
কবে ছাড়লি?
আঠাশে সেপ্টেম্বর উনিশো বিরানব্বই। সেদিন নিয়োগীজির অন্তিম সংস্কার হল। আমার এক বন্ধু বলল যে, নিয়োগীজিকে মদের কারবারিরা মেরেছে। তার প্রতি আমাদের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি রইল আর মদ খাব না। সেদিন থেকে ছেড়ে দিয়েছি।
