বলি, বাংলার মানুষ। কাজের জন্যই তো বাংলা ছেড়ে অতদূরে যেতে হল। যদি এখানে একটা কাজ পেয়ে যাই সেখানে আর কেন যাব।
দত্তদার চোখে মুখে খেলে গেল চালাক হাসি। সঠিক চালটা দিয়ে আমাকে কাত করে ফেলেছেন। আমার সঙ্গী কেনারামকে দেখিয়ে জানতে চান, এ কে?
বলি–আমার সাথে ঘুরতে এসেছে।
এখন কোথায় যাচ্ছিলি? আর
আমার এক ভাই গণেশের বাড়ি।
যা, তাহলে ঘুরে আয়। সন্ধের সময় একবার আয়। দেখি তোর জন্য কী করতে পারি। কথা যখন দিয়েছি কিছু একটা তো নিশ্চয় করব।
এরপর কেনারামের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে আমাকে বলে, তুই একা আসিস। তোকে নিয়ে আমি এক জায়গায় যাব।
কিছু লোক আছে সারা পৃথিবী জুড়ে যতই পরিবর্তন হয়ে যাক সে নিজেকে কিছুতেই পরিবর্তিত করবে না। এক সাথে আমরা যারা রিক্সা চালাতাম কেউ কেউ এখন ড্রাইভারি শিখে বাস ট্যাক্সি চালাচ্ছে। রিক্সাওয়ালা অনন্ত এখন জমির দালালি করে মোটর বাইক চেপে ঘোরে। কেউ কেউ পার্টির নেতা ধরে কর্পোরেশনে চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু গণেশ রয়ে গেছে অবিকল আগের মতোই। এখনও সে রিক্সাই চালায়।
এই সব লোক যেখানে থাকে সবাই তাকে চিনবে। ঘরের খেয়ে অথবা না খেয়ে পরের মোষ চরিয়ে বেড়াবার বদ অভ্যাস আছে যে। কার কী সমস্যা একবার তার কানে গেলে হলো, নিজের সমস্যা ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে ওর স্ট্যান্ড। সেই যে আমার ইউনিয়নে থাকার জন্য কামারপাড়ার পার্টি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল তারপরে আর স্টেশনের রিক্সা লাইনে জায়গা পায়নি। সেই থেকে এখানে থাকে।
খুঁজে খুঁজে ওখানে গিয়ে শুনলাম বেশ কয়েক দিন গণেশ আসছে না। একজন বলে দিল কী ভাবে তার বাড়ি যেতে পারব, সুভাষ গ্রাম স্টেশনে নামবে। একটু রেল লাইন ধরে হেঁটে আসবে পিছন দিকে। দেখবে একটা রাস্তা উত্তর দিকে চলে গেছে! হাঁটার পথ মিনিট দশ। ফের বাঁদিকে একটা রাস্তা। ওটা ধরে কিছুটা গিয়ে বাঁদিকে দেখবে একটা ক্লাব। ক্লাবের পিছনে গণেশের বাড়ি। যাকে বলবে দেখিয়ে দেবে। সুভাষগ্রামে পৌঁছে সেই পথে হেঁটে পেয়ে গেলাম গণেশের বাড়ি। একটু শরীর খারাপ, তাই রিক্সা চালাতে যেতে পারছে না, বাড়িতেই পেয়ে গেলাম ওকে।
প্রায় দশ বছর পরে দেখা। এত বছরের জমে থাকা সব কথা কী বলে শেষ করতে পারে? হাউ হাউ করে বলে গেল সে, বড় গোপাল তালদির গোবিন্দনগরে বাড়ি করেছে, অটো চালায়। বড় বিমল সন্ধ্যা বাজারে দোকান দিয়েছে। তাদের সাথে কখনো কখনো দেখা হয়, অন্য সবাই কে কোথায় ছিটকে গেছে, কোনো খবর নেই। আর গণেশ সেই মার্ডার কেস দুটোয় চার বছর মামলা লড়ে বেকসুর খালাস পেয়েছে। বিয়ে করেছে। একটা ছেলে একটা মেয়ে। আমিও আমার কথা বলি। আরও বলি, দত্তদা আমাকে একটা কাজ দেবে বলেছে। যদি দেয় আর যাব না। এখানেই থাকব।
গণেশ দত্তদাকে চেনে। বলে সে, দেখ গিয়ে। আমার তো মনে হয় দিতে পারবে না। ওর কথা কে মানে। খুব বদনাম হয়ে গেছে না। তবু বলেছে যখন গিয়ে দেখ।
কেনারামকে গণেশের বাড়ি রেখে সেদিন সন্ধেবেলায় এলাম দত্তদার বাড়ি। জামা প্যান্ট পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আমার আসবার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে বসেছিল সে। এত দেরি করলি কেন? চল তাড়াতাড়ি চাটা সেখানে গিয়ে খাব।
আমাকে কাজে লাগিয়ে দেবে। আমি মাস গেলে মাইনে পাব। আমার উপকার হবে। আমার উপকার–। আবার আমি আমার ছেলে মেয়ে বউকে দণ্ডকারণ্যের গভীর অরণ্যের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারব। আবার ওরা বাংলার জল মাটি হাওয়া গায়ে মেখে বাঙালি হয়ে উঠবে। বাংলা ভাষায় কথা বলবে হাসবে, বাংলায় স্বপ্ন দেখবে। বিশ্বাস হয় না এমন পরোপকারি বাংলাদেশে কী কেউ আছে। এক ছিলেন শঙ্কর গুহনিয়োগী তিনি মারা গেছেন। এক বাঙালি বিনায়ক সেন তিনি বাংলা ছেড়ে চলে গেছেন। যোগীন সেনগুপ্ত দিল্লিতে থাকেন, শৈবাল জানা বাংলায় আসেন না। তাই দত্তদার এমন উপকারি প্রবৃত্তি দেখে একটু অবাক না হয়ে পারি না আমি। ছিঃ, সিপিএম পার্টি সম্বন্ধে একটা ভুল ধারণা ছিল আমার। আমি ধারণা করে বসেছিলাম,বিজয়গড়ের খোকা চক্রবর্তী মারা যাবার ফলে এই পার্টির সর্বশেষ ভালো লোকটা মারা গেছে। আর একজনও অবশিষ্ট নেই। ভুল, এই তো দত্তদা আছেন।
আমাকে তিনি নিয়ে গেলেন বালিগঞ্জের এক বাড়িতে। যে বাড়ির কম বয়সের ছেলেমেয়েরা তাকে মামা ডাকে। একজন বলে, কী মামা হঠাৎ করে আমাদের বাড়ি। পথ ভুলে নাকি? সেই যে বলে গেলে তোমার ভেরির তাজা মাছ এনে খাওয়াবে, আর তোমার দেখা নেই।
বলেন দত্তদা, মাছের কথা পরে হবে, আজ তোদের সবাইকে একটা আশ্চর্য জিনিস দেখাব। যা তোরা কেউ কোনোদিন দেখিসনি। গল্প শুনেছিস বইয়ে পড়েছিস সিনেমায় দেখেছিস। সামনা সামনি দেখবি আজ।
দত্তদার গলার শব্দে বলার ভঙ্গিতে বাড়ির সব লোক জমা হয়ে যায় আমাদের চারপাশে। সবার চোখে মুখে ঝিলিক মারছে একটা হালকা কৌতুকমাখা হাসি। বোঝা যাচ্ছে কেউ তার কথা গভীরতার সাথে নিচ্ছে না। একজন বলে–তাহলে দেখিয়ে দাও তোমার ঝুলিতে কী ম্যাজিক আছে।
দত্তদা আমার দিকে তর্জনি তুলে দেখালেন–একে দ্যাখ, তোদের দেখাব বলে সাথে করে নিয়ে এলাম। চিনিস একে?
সব চোখ আমার দিকে ছোট টর্চের মতো ঘুরে যায়। আঁতিপাঁতি জরিপ করে। বুনো বুনো, মজুর মজুর, না খাওয়া না খাওয়া চেহারায় তারা বিশেষ কিছু খুঁজে পায় না।
