সব লোকের একটা করে নাম থাকে। এরও আছে। ধরা যাক তার নাম দত্তদা। যখন আমি যাদবপুর স্টেশনে ঘাঁটি গেড়ে ছিলাম সেই সময় গায়ে সিপিএম গন্ধ মাখা কিছু গুণ্ডাদের সাথে মাঝে মধ্যে ছোট ছোট গণ্ডগোল হয়েছিল আমার। তারা আমাকে মারুক কী আমি তাদের মারি–এমন কী খোকা দাসের শাগরেদ কার্তিককে কামারপাড়ার ভিতরে চাকু মেরে চিৎ করে দিয়ে আসার পরেও উনি আমাকে দোষারোপ করেননি। যেন একটুখানি আক্ষেপ ছিল তার গলায় এ তুই কী করে দিলি। কামারপাড়ার ইতিহাসে যা কোনোদিন ঘটেনি কোনোদিন ঘটবে কেউ ভাবতে পারেনি তাই করে ফেললি।
এটা সত্যি যে আজ পর্যন্ত কেউ কামারপাড়ার বুকের ভিতর ঢুকে এক মহাবীরকে চাকু গেঁথে চলে আসবে, কারও কল্পনায় ছিল না। কী করে সেটা আমার দ্বারা সংঘটিত হয়ে গিয়েছিল কে জানে। তবে সেই ঘটনার পর মানুষের মনে হয়েছিল মাস্তানির ময়দানে আর এক মল্ল অনুপ্রবেশ করল। যে কয়দিন না মরে, জেলে না যায় খুব দাপাবে।
দত্তদা আগে টিবি হাসপাতালের এক কোয়াটার্সে থাকতেন। ওনার বাবা ওখানে চাকরি করতেন। তিনি মারা যাবার পর দত্তদাকে কোয়াটার্স ছেড়ে দিতে হয়। তখন উনি জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে বাইপাশের ওদিকে এক সদ্য গড়ে ওঠা উপনগরিতে চলে আসেন। আজকাল আর খুব একটা স্টেশনের দিকে আসা হয়ে ওঠেনা। বহুদিন পরে মর্নিংওয়াক করতে কেন কে জানে এদিকে এসেছিলেন, তাই আমার সাথে দেখা হয়ে গেল।
আমার জীবনে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। আমি যাকে মণিহারা ফণীর মতো পাগল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি, ক্ষ্যাপা যেমন খোঁজে পরশ পাথর–খুঁজে বেড়াচ্ছি কিন্তু পাচ্ছি না। পেয়ে গেলাম তাকে যাকে কোনোদিন খুঁজিনি। আর সেই আকস্মিক সাক্ষাৎ আমার জীবনে এক একটা মাইল ফলক হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
আমি গিয়ে দত্তদার সামনে দাঁড়াই, আর আমাকে দেখে যেন সে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। শেষে এক মহাবিস্ময় গলায় ঢেউ খেলে, তুই মদন না। এখনও মরিসনি। কোন্ ভাগাড়ে গিয়ে পড়েছিলি? জেলে ছিলি নাকি?
খ্রিস্টানের যেমন যিশুর সামনে কনফেস করে সেইভাবে বলি, আমি ছত্তিশগড়ে চলে গিয়েছিলাম। কাল ফিরেছি।
আমি একটু ভাবনা চিন্তা করেই ছত্তিশগড় বলেছি। দণ্ডকারণ্য বলিনি। এতে সেই অশ্বত্থামা হত ইতি গজঃ বলার মতো সত্য বলা হল আবার বলা হল না। এক সময় দণ্ডকারণ্য থেকে হাজার হাজার বাস্তুহারা মানুষ এই বাংলার এক কোণে একটু আশ্রয়ের জন্য এসেছিল। তখন সিপিএম দল প্রচার চালিয়েছিল ওই সব লোক স্রেফ বিরোধীদের উস্কানিতে গরিব দরদী বামফ্রন্টকে বিপন্ন বিব্রত করার বদ উদ্দেশ্য নিয়ে এমনভাবে ঝাঁকে ঝাকে পশ্চিমবঙ্গে আসছে। এরপরই ক্ষুধার্ত হায়নার মতো বামফ্রন্টের পুলিশ আর ক্যাডাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের উপরে। খুন, জখম, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, মিথ্যে মামলায় জেল–এইসব অস্ত্রের প্রয়োগে মরিচঝাঁপি থেকে উৎখাত করা হয় তাদের।
দত্তদা সিপিএম কর্মী। যদি সে জেনে যায়, দণ্ডকারণ্য থেকে এসে মরিচঝাঁপিতে বুকের হাড় ভেঙে আবার দণ্ডকারণ্যে ফিরে গিয়ে মরে যাওয়া এক বাপের সন্তান আমি, কে জানে যদি সেই বামফ্রন্টকে বিপদে ফেলা দ্বেষ উথলে ওঠে। আমার প্রতি ভুলে যাওয়া রাগ চাগাড় দেয় আবার। তাহলে যে বিপদে পড়ে যাব। কে আমাকে বাঁচাবে সেই বিপদ থেকে? তাই ছত্তিশগড় বলা। তবে ছত্তিশগড় নামটাও তার ত্রাসের বিষয়। আঁতকে উঠে বলে দত্তদা, ওখানে শুনি নকশালদের জব্বর ঘাঁটি। তুই সেখানে কী করতিস? আবার ওদের সাথে ভিড়ে গেছিস নাকি?
বলি আমি, নিয়োগীজির সংগঠনের কাজ করি।
নিয়োগী। কোন্ নিয়োগী?
শঙ্কর গুহনিয়োগী।দল্লী রাজহরায় থাকতেন। মস্ত বড় নেতা। পশ্চিমবঙ্গের লোক।ভিলাইয়ের শিল্পপতিরা ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে খুন করে দিয়েছে ওনাকে। এখানকার পত্র পত্রিকায় তো খুব হৈ চৈ হয়েছিল।
ও ওইটা। ওতো একটা নকশাল ছিল।
শঙ্কর গুহ নিয়োগী কোনো সাধারণ নেতা নন। সারা দেশে বীরসা-মুণ্ডা, সিধু-কানহু বীর নারায়ণ সিং, ভগৎ সিং–এই সব শহিদের সমতুল্য–সৎ, সাহসী নির্ভীক এক জননেতা হিসাবে সম্মানের আসন দখল করে আছেন। সেই মহান মানুষের নাম এমন তাচ্ছিল্য সহকারে উচ্চারণ করতে শুনে মনটা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আমার।
বলি,উনি বন্দুকের উপর আস্থা রাখতেননা। আস্থা রাখতেন মানুষের উপর। গণআন্দোলনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায় দাবি আদায় করতেন। এই কারণে মানুষ তাকে ছত্তিশগড়ের গান্ধি বলে।
একটু থেমে আবার বলি, আমি ওনাকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। ওনার সংগঠনের কাজ করতাম যে।
কী কাজ করতি?
যে কাজের ভার দিতেন।
কথাটা বলার পরে আমার মনে হল, অনেক বেশি বলা হয়ে গেছে। এসব কথা একে বলার কোনো দরকার ছিল না। আমরা এসেছি ঘুরতে, ঘুরে চলে যাব। এখানে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা অর্থহীন। তাই সামলে নেবার জন্য বলি, পশ্চিমবঙ্গে তো কোনো কাজ-টাজ পাইনি। আমার এক কবিদাদা বলতেন ছত্তিশগড়ে যাও, ওখানে কাজের লোক খুব দরকার। গেলে কাজ করতে পারবে। তাই গেছিলাম।
তবে যে বললি সংগঠনের কাজ করি।
সংগঠনেরই কাজ তো। একটা সংগঠনে কত রকম কাজের লোক লাগে। সব কাজ কী সদস্য সমর্থকরা করে, না করতে পারে।
দত্তদা বুঝতে পারলেন আমি যে কাজ করতে ওখানে গিয়েছিলাম তার নাম শ্রমদান। যার জন্য একটা পারিশ্রমিক ধার্য করা থাকে। পশ্চিমবঙ্গের পার্টিরও এমন সব লোক লাগে। যে ঘরদোর সাফ সাফাই করে, জমাদার, ড্রাইভার এরা মাইনে নেয় কাজ করে। মদন সেই রকম কোনো কাজ করত। দত্তদা বেশ কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। দাবার বোর্ডের সামনে বসে পাকা খেলোয়াড় যেমন অনেক ভেবে বুঝে সামনে ঘুটি ঠেলে দেয় উনি আমার দিকে কথা ঠেলে দিলেন, পশ্চিমবঙ্গে কী ফিরে আসতে চাস? তাহলে বল, তোকে এখানে কোনো একটা কাজে কর্মে লাগিয়ে দিই।
