এবার বিত্তবান লোকটা ছুটে গেল ডাক্তারের কাছে, আপনি বলেছিলেন কেউ বুঝতে পারবে না, কিন্তু আমার চাকর বাকর সবাই তো বুঝে যাচ্ছে কোনটা নকল। এটা কেন?
তখন শান্ত গলায় বলে ডাক্তার–এই পাথরের চোখটা যাতে আসল চোখের মতো দেখতে হয়, মানুষের আসল চোখে যে যে উপাদান থাকা দরকার সেই দয়া দরদ করুণা এতে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে আপনার কর্মচারীরা ওই চোখে সেগুলো দেখতে পেয়েছে তাই চিনে ফেলেছে। তবে এতে আপনার অত বিচলিত হবার কিছু নেই। এক দুমাস অঙ্গে লেগে থাকার পর দেখবেন ওসব মুছে গিয়ে ঠিক আপনার আসল চোখের আকার নিয়ে নেবে।
ভাগ্যিস এই দেওয়ালটা কোনো উচ্চতল ইমারতের দেওয়াল নয়। যে দেওয়ালের মধ্যে বাস করে কতগুলো হৃদয়হীন যান্ত্রিক জীব। তাই সে আমাকে চিনতে পেরে ডেকে কথা বলছে।
এরপর গেলাম পালের বাজার, গড়ফার শিব মন্দির, বিবেক নগরের মাঠ, সেলিমপুর রেলগেট। সেই সত্তর দশকে একদল দুরন্ত দামাল তরুণ দুচোখে সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে জীবনমরণ তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এদেশের অগণিত মানুষের দুর্দশা মোচনে। তারা আমূল পরিবর্তন চেয়েছিল পোড়া দেশটার। সব মানুষের পেটে থাকবে অন্ন, পরিধানে বস্ত্র, মাথার উপর ছাউনি। সেই দেশই তাদের পরিবর্তন করে দিয়েছে। সব এখন মানুষ থেকে পরিবর্তিত হয়ে গেছে মোড়ে মোড়ে ইট পাথরের বেদীতে।
একদিন সময় আমাকে তাদের সঙ্গী বানিয়ে দিয়েছিল। এক সাথে হেঁটে গিয়ে ছিলাম কয়েক পা। তারপর আর পারিনি পায়ে পা মিলিয়ে সমান তালে হাঁটতে। অনেক পিছুটান পিছিয়ে দিয়েছে আমাকে। এখন তাদের এক পলক দেখার জন্য মনটা বড় কাঁদে। আশুদা, বড়দা, তুলসিদা, বাবলাদা, গৌতমদা, সেলিমপুর বস্তির কত ছেলে–কে কোথায় চলে গেছে কে জানে। রাজনীতি আমি বুঝতাম না, এখনও বুঝি সে দাবি করব না। তবে এটা বুঝতাম এরা যা করছে তার পিছনে কোনো স্বার্থ নেই। আছে গভীর ভালোবাসা। ভালোবাসা এমন একটা ভাষা যা অনুবাদ ছাড়াই বোঝা যায়। মানুষ বুঝতে পারে। শঙ্কর গুহনিয়োগী একজন বাঙালি, তিনি ছত্তিশগড়ের গোণ্ড মুরিয়াদের কাছে গিয়েছিলেন। উনি তাদের ভাষা জানতেন না, তারা জানত না ওনার ভাষা। তবু তাদের পরস্পরকে চিনে নিতে বিশ্বাস করতে বিলম্ব ঘটেনি।
তখন সেলিমপুর রেল লাইনের ধারে হোগলা, পাতাকাঠ, চট পচা, টিনের অনেক ঝুপড়ি ছিল। সেই সব ঝুপড়িতে বাস করত দিন আনা দিন খাওয়া অসংখ্য পরিবার। কেউ এসেছিল দেশভাগের বলি হয়ে। কারও ঘর বাড়ি ভেসে গেছে সুন্দরবনের কোনো নদীর ভাঙনে।নকশালদের এখানে একটা ঘাঁটি সেই সন্দেহে পুলিশ বস্তি থেকে তুলে দেয়। কী যে ভালো তারা বাসত আমাদের। যাকে আমরা মাসি বলে ডাকতাম, সেই দুলালী মাসি বাবুর বাড়ি বাসন মাজত, কাপড় কাঁচত ঘর মুছত। সারাদিন খেটে বাসায় এসে আমাদের জন্য রুটি তরকারি বানাতে বসে যেত হাসিমুখে। প্রায় দু-তিন কিলো আটার রুটি হতো রোজ। তবু তাকে কোনোদিন বিরক্ত হতে দেখেনি। মুখে হাসিটা লেগেই থাকত। আর সেই ভালোবাসা মাখা ঘুঁটের মতো মোটা রুটির স্বাদ আজও যেন মুখে লেগে রয়েছে।
এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে দিন ফুরিয়ে গিয়ে রাত নামল। এক সস্তার হোটেলে ডাল ভাত খেয়ে শুয়ে পড়লাম রেল স্টেশনে। আমরা পরিব্রাজক তাই পথে রাত কাটাবার মতো কিছু চাদর কাপড় আমাদের সাথেই থাকে। রাখতে হয় কিছু শুকনো খাবার, জলের পাত্র।
শুয়ে পড়ার পর আমি যেন কান পেতে কংক্রীটের চাঙ্গরের নীচে মাটির বুকের হৃদপিন্ডে ধ ধক্ আওয়াজ শুনতে পেলাম। সে যেন আমাকে কিছু বলছে। মাটি কী কথা বলে? বলতে পারে? তাহলে আমার কেন মনে হচ্ছে সে কিছু বলছে। শুধু মাটি নয়, এই নির্জন হয়ে আসা রাত, ওই বট গাছের পাতার শনশন, পাশের পচা পুকুরের কালো জল সবাই এখন আমার সাথে কথা বলছে মৌনতার ভাষায়। মানুষ আমাকে চিনতে চায়নি, কথা বলেনি, সে কষ্ট আর থাকে না।
রাত কেটে যাবার পর সকাল বেলায় সেই পুরাতন নিয়মে মুখে নিমডাল নিয়ে রেল লাইনের ধারে গভীর আত্ম বিশ্বাসের সাথে বসে সেরে নিলাম প্রাতঃকৃত্য। পাশের পুকুরে জলশৌচ করে মুখ হাত ধুয়ে এসে দাঁড়ালাম প্ল্যাটফর্মে। এবার এককাপ চা খেয়ে ট্রেনে চাপব। খোঁজ নিয়ে জেনেছি আমার সেই ভাইয়ের চেয়ে বেশি গণেশ সুভাষগ্রামে বাড়ি করেছে। যে মেয়েটিকে সে বিয়ে করেছে তারই বাবা কিনে দিয়েছে দুকাঠা জমি। কলকাতায় এসে গণেশের সাথে দেখা না করাটা পাপ হবে।
এমন সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সেই লোকটার সাথে যে আমাকে একদিন পিঠে গুলিভরা রিভলবারের গুঁতো দিতে দিতে নিয়ে গিয়েছিল সেই কামারপাড়ায়। যেখানে মানুষ যায় তো হেঁটে ফিরে আসে লাশকাটা ঘর ঘুরে।
সেদিন যে কী বাঁচাটা বেঁচে গিয়েছিলাম, ভাবলে আজও বুকের রক্ত বরফ হয়ে যায়। শুধু মাত্র একটা পদবির জন্য প্রাণটা রক্ষা পেয়ে গেছে আমার। যদি থোকা চক্রবর্তী না হয়ে থোকা দাস হতো আমার নামের আগে চন্দ্রবিন্দু বসে যেত।
অনেকদিন পরে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিনানা পাটেকরের। সেই ছবিতে দুই অফিসারের মধ্যে এই নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা চলছিল কে কটা খুন করে এক নাম্বার হতে পারে। সেই রকম একটা গোপন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থোকা দাস আর মোহিত বর্মনের মধ্যেও ছিল। কে কাকে টপকে যাবে। সেই অবস্থায় নাগালে পেয়ে আমাকে না মেরে ছেড়ে দেবার পাত্র খোকা দাস ছিল না। সে সব আমি বিস্তারিত লিখে দিয়েছি প্রথম ভাগে। তবে সেদিনের সেই ঘটনার পর ওই লোকটার সাথে আমার আর কোনো বিবাদ বিরোধ ছিল না। তার বেশ কটা রিক্সা ছিল, ভাড়া খাটত। তার একটা আমিও নিয়েছিলাম দৈনিক দু’টাকা ভাড়ায়।
