সেই যেবার কালিয়ার ট্রেনে অ্যাকসিডেন্ট হল, স্টেশন এলাকার পকেটমার সর্দার হারার হাতের শিকো ঘড়ি কেড়ে নিয়ে বেচে তার চিকিৎসা করিয়েছিলাম। আর যেবার সেই বাঘা যতীন মাঠে দুটো মেয়ে খুন হল, পুলিশ কাউকে না পেয়ে যাদবপুর থেকে গণেশকে তুলে নিয়ে গিয়ে জুড়ে দিল সেই কেসে। ওকে ছাড়িয়ে আনার জন্য উকিল ধরে কেস লড়ার জন্য টাকার প্রয়োজনে ডাকাতি করেছিলাম আমি। হ্যাঁ যেটা করেছিলাম সেটা ডাকাতিই।
আর গণেশ? একবার কোটা পূরণ করার জন্য জি.আর.পি. আমাকে ধরলে স্টেশনের ক্যাম্পে হামলা করে সে আমাকে ওদের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। গুলি খেয়ে মরতে পারে তবু পরোয়া করেনি।
স্টেশন এলাকায় ভদ্রলোক জনদের কাছে আমাদের পরিচয় ছিল সমাজবিরোধী, সমাজ বিরোধীরা আমাদের জানত তাদের শত্রু বলে। আর নকশাল দলের কাছে আমরা ছিলাম লুম্পেন প্রলেতারিয়েত।
এক সময়ে এসে দাঁড়ালাম স্টেশনস্থ সেই রিক্সা লাইনটার সামনে। যেখানে বহু বছর রিক্সা চালিয়েছি আমি। যার পিছনে সেই বুড়ো বটবৃক্ষ। আমার জীবনের বহু ঘটনার সাক্ষী এই বৃদ্ধ বট। এক বৃষ্টির অন্ধকার রাতে একজন এই বৃক্ষের নীচে আমাকে আলিঙ্গন দিয়েছিল। দিয়েছিল এক ডজন চুমু। বলেছিল আজ এইটুকু। বাকিটা দেব বিয়ের পরে।
বিয়ের পরে সে বিহারে চলে গেছে। আর দেখা হয়নি, অপেক্ষায় আছি প্রায় তিরিশ বত্রিশ বছর। জানিনা কবে এসে বাকিটা দিয়ে যাবে।
বটগাছের গোড়ায় একটা মন্দির। সেখানে নানান দেব-দেবীর ভিড়। কেউ জানে না, একদা এখানে দেবস্থান বানাবার প্রথম উদ্যোগ আমিই নিয়েছিলাম। তখন বটগাছের গোড়ায় লোকে প্রস্রাব করত। বারণ করলেও শুনত না। প্রস্রাবের নাক জ্বালা গন্ধে আমরা রিক্সার লাইনে টিকতে পারতাম না। তাই সেটা বন্ধ করার জন্য কৌশল করেছিলাম। বিবেক নগরের মাঠ থেকে এক পরিত্যক্ত শীতলা মূর্তি তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছিলাম বটবৃক্ষের নীচে। শীতলার ভয়ে আর কেউ সেখানে প্রস্রাব করার সাহস করেনি।
এক ধুরন্ধর বামুনের মাথায় আসে জায়গাটা মন্দ নয়, লক্ষ লোকের চলাচলের পথ। এখানে একটা দেবালয় হলে একটা আয়-উপার্জনের দরজা খুলতে পারে। তাই সে একে একে শনি, মনসা, কালী, বহু দেবদেবীর মূর্তি এনে ভিড় বাড়ায়। যার যাকে ভক্তি প্রণাম করুক আর প্রণামী দিক। যা এক সময় পরিণত হয়ে যায় এক ভব্য মন্দিরে।
দেব দেবতার অসীম ক্ষমতা, চাইলে সে দীনদুঃখী মানুষের সব দুঃখ কষ্টের নিবারণ করতে পারে। স্টেশনের এই দেবদেবীরা আমাদের সেই চরম দারিদ্রের দিনে অনেক উপকার করেছে। সে সময় একবেলা না খেয়ে থাকলে পরের বেলা খাওয়া জোগান দিত এরাই। ভাঙা বেড়ার ফাঁক থেকে হাত গলিয়ে কাঠের বারকোষ থেকে তুলে নিতাম একমুঠো পয়সা। হোটেলে খাবার খরচা পরের দিন সকালে বামুন গাল পাড়ত–শনি, কালীকচাখেকো দেবতা। যে তার পয়সা নিয়েছিস মুখে রক্ত উঠে মরবি। আমরা হাসতাম আর বলতাম বাপ মায়ের পয়সা ছেলে খেলে কোনো পাপ হয় না।
দেখলাম সেই দেওয়ালটা, যেখানে এখন গণশক্তি সাঁটা হয়। সেই কবে কতযুগ আগে এক কিশোর জ্বর গায়ে নিয়ে সারারাত বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল এই দেওয়ালের পাশে পানের পিক, ধুলো, ছেঁড়া কাগজ, বিড়ির টুকরোর মধ্যে। দেওয়ালটা এখন আমাকে চিনতে পেরেছে। সে হাসছে আমাকে দেখে। গলায় একরাশ স্নেহ এনে জিজ্ঞাসা করে–আবার এলি?জানতাম আসবি। আসতে তোকে হবেই।
মনে পড়ল, বুড়ো হরেন ঘোষ বলত—যেই হালায় একবার যাদবপুরের জল খাইছে দুনিয়ার কোনখানে গিয়া টিকতে পারবো না। আইজ হোউক কী কাইল ঠিক ফিইরা আসোন লাগবো।
একটু অবাক হলাম আমি। এই যাদবপুরে এক সময় লক্ষ লোক আমাকে চিনত। তারা সব গেল কোথায়? কেউ সামনে এসে বলল কিরে কেমন আছিস? আসলে তারা চিনতে চাইছে না। চেনা দিলেই দাঁড়িয়ে দুমিনিট কথা বলতে হবে। সেইটুকু সময় আর অপচয় করার মতো কারও কাছে নেই।
মনে হচ্ছে শহরের সব মানুষ যেন পায়ে ঘোড়ার নাল লাগিয়ে ছুটছে। কে পিছনে রয়ে গেল, কে পিষে গেল পায়ের নীচে ফিরে দেখার সময় নেই। সে ছুটছে সামনের লোকটাকে অতিক্রম করে যাবার জন্য। অনবরত এক ভয় তাড়া করছে তাকে–আমি দৌড় থামালে আমাকে পিছনে ফেলে অন্য কেউ এগিয়ে যাবে। শহরের এত বিত্তবৈভব, এত জৌলুস, এত প্রাপ্তি সারা
দেশটাকে জোঁকের মতো শুষে একার পেট মোটা করছে এবং তার মরণদৌড় চলছে ‘আরও চাই’-য়ের পিছনে।
আরও চাই। আর কত চাই? কতখানি খেলে মিটবে শহরের রাক্ষসী খিদে? আমি ছত্তিশগড়ে ছিলাম। দেখে এসেছি কত অল্প পেয়েও আনন্দে থাকা যায় কত কম খেয়েও সুখে থাকা যায়।
এখন একটা গল্প মনে পড়ছে। একজন বিশাল বিত্তবান লোকের কী এক অসুখে যেন ডান চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে। পরীক্ষা পর ডাক্তার বলে একে তুলে ফেলা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বিত্তবান ভীষণ বিমর্ষ হয়ে পড়ে। আমার একটা চোখ থাকবে না। লোকে কানা বলবে।বলে ডাক্তার কোনো চিন্তা করবেন না। ওখানে আমি এমন একখানা পাথরের চোখ বসিয়ে দেব কেউ আসল নকল বুঝতেই পারবে না।
তখন তাইকরলেন তিনি, লাগিয়ে নিলেন একটা পাথরের চোখ। আয়না ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন সত্যিই বোঝা যাচ্ছে না। কোনটা আসল কোনটা পাথর। তবুও মনটা একটু খুঁতখুঁত। মানুষ তো। তাই বাড়ি ফিরে চাকরকে ডাকলেন-বলতে আমার কোন চোখটা পাথর? চাকর একবার তাকিয়ে বলে দিল–ডান চোখ। ড্রাইভারকেডাকলেন, সেও বলেদিল ডান চোখ। দারোয়ান সেও বলে দিল–ডান।
