দেখে এলাম রামকৃষ্ণ উপনিবেশের সেই দেওয়ালটা। আর সেই কালী মন্দিরটা। দরমার ভাঙাচোরা বেড়ার মন্দিরের সেই দরিদ্র প্রতিমা এখন আর নেই। পাকা দেওয়াল, ছাদ, ছাদে গম্বুজ। এই মন্দিরের যজ্ঞের পোড়া কাঠে কপালটা পুড়ে গেছে আমার, রক্তখাকি দেবী বলি নিয়েছে আমার গোটা জীবনটা।
আজ ভাবি, সেদিন যদি স্বপন সেই শিল্পকর্মটা না করত, সেই অপরাধে পিন্টু সেন আমাকে মারত আর বদলার আগুন আমার বুকে এমন দাউ দাউ করে না জ্বলে উঠত, কেমন হতো সেই জীবনটা? তাহলে কী আমি মেতে উঠতাম মরা আর মারার মর্মন্তুদ খেলায়? পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথে পথে ঘুরে কাটালাম শেকড় ছাড়া জীবন?
সব ওলোট পালট হয়ে গেছে এই কালীর জন্য আর কাঁপালিক পিন্টু সেনের জন্যে। সিপিএম যে কতখানি হিংস্র একটা দল, সে বিষয়ে তো আগে আমি যা বলার বলে দিয়েছি। সেই নকশাল বাড়ির সাত রমণীর মৃতদেহ মাড়িয়ে যে যাত্রা তারা শুরু করেছিল তা থামবে নেতাই পর্যন্ত এসে আরও কিছু নারীমেধের পরে। আর চৌত্রিশ বছর কালের যাত্রাপথের দু’ধারে পড়ে থাকবে লক্ষাধিক লাশ আর পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি ধর্ষিত নারীর দেহ।
এরপর দেখতে গেলাম কামার পাড়ার সেই কালভার্ট। এই সেই কালভার্ট যেখানে আমাকে ধরে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছিল একদিন খুন করবার জন্য। বন্দুকে গুলিও ভরা হয়ে গিয়েছিল, বাকি ছিল শুধু ট্রিগারটা টিপে দেওয়া। দেখলাম, সেই ঘরটাও, যে ঘরে ঢুকিয়ে কার্তিকনামের এক সিপিএম চাকু চালিয়ে আমাকে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত করেছিল। আর আমি ওরই চাকু কেড়ে নিয়ে ওকেই শুইয়ে দিয়েছিলাম সেই ঘরের ধুলোময় মেঝেতে।
সেই সময় কামারপাড়া সম্বন্ধে মুখে মুখে একটা প্রবাদ চালু হয়েছিল–এখানে যে আসে হেঁটে, ফিরে যায় খাটে। আমার ভাগ্য আমাকে দুবারই ফিরিয়ে দিয়েছিল জীবিত। অনাত্মীয় শহরের পথে পথে কী খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমি খুঁজছিআমাকেই। এইসব পথের ধুলোয়, ইট-পাথর-কংক্রীটের জঙ্গলে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে থাকা আমার আমিকে জুড়ে জুড়ে দেখে নিতে চাইছি আজকের আমির অখণ্ড স্বরূপটাকে। অদৃশ্য অক্ষরে এখানকার দেওয়ালে লেখা হয়ে আছে আমার জীবনের ইতিহাস। সেই লেখাগুলো একটু পড়ে নিতে চেষ্টা করছি।
সুকান্ত সেতুর পাশে একটা চায়ের দোকান। বিহারি এই চা-অলার নাম বড়ভাই। আগে কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরির শ্রমিক ছিল। ডিউটির পরে চা বেচত। সে কাজটা গেছে, দোকানটা আছে, আমি তাকে চিনতে পারি, সে আমাকে চিনতে পারে না। মনে আছে একদিন কাছে পয়সা ছিল না, খুব খিদে পেয়েছিল, এক কাপ চা বাকিতে দেবার জন্য ভিখারির চেয়েও কাতর হয়েছিলাম এর কাছে, দেয়নি। পরে অবশ্য বাকি তো বাকি, বিনা পয়সায় চা খাওয়াতে পারলে ধন্য হয়ে যেত। তার এই মানসিক পরিবর্তন ঘটেছিল আমি পরিবর্তিত হয়ে যাবার ফলে।
সে যাইহোক, এখন আমরা সেই দোকানে বসে চা খাই। তারপর বড়ভাইকে জিজ্ঞাসা করি, এখানে মদন বলে একটা ছেলে থাকত না? সে এখন কোথায়?
বড়ভাই বুড়ো হয়ে গেছে, চোখে ভালো দেখতে পায় না। বলে-কৌন মদন, যে সুলেখায় কাজ করত?
না না, যে নরেশ ঠাকুরের সাথে রান্নার কাজে যেত। পরে রিকশাও চালিয়েছে।
ও তো মরে গিছে।
সে কী! কী করে?
বুরা সঙ্গত হোয়ে গিছিলো তো। এই সব লোক জাদা দিন বাঁচে না। কোথায় না কোথায় গিয়ে মার্ডার হয়ে গিসে।
বড়ভাই এটা জানে মদন মার্ডার। জানে না, কে তাকে মেরেছে–আর কেন মেরেছে।
আমিই মেরেছি। না মেরে উপায় ছিল না। বীজের মৃত্যু না ঘটলে বৃক্ষের জন্ম হয় না। মদনের মৃত্যু না হলে মনোরঞ্জন কী করে জন্ম নিত? রত্নাকরের মৃতদেহের উপর যে বাল্মীকির আসন পাততে হবে। তাই রত্নাকরকে মরতে হবে। মারবে সে নিজেকে নিজে। তারই কণ্ঠ থেকে একই সঙ্গে বর্জন এবং আবাহন ধ্বনিত হবে, দুর হটো রত্নাকর, কাছে এসো বাল্মীকি।
চা খেয়ে ব্রীজের সিঁড়িদিয়ে নেমে এসে দাঁড়ালাম যাদবপুর রেল স্টেশনের দুনাম্বার প্ল্যাটফর্মে। যে জায়গাটায় গামছা বিছিয়ে শুয়ে রাতের পর রাত, দিন মাস বছর কাটিয়েছি, সেই জায়গাটায় চোখ পড়তে বুক জুড়ে একটা হাহাকার একটা সর্বহারার বেদনা তুফান তুলল। সেইসব দিনে নিজেকে আমার রাজা বলে মনে হতো। কালীঘাট: শানে এক ডোমকে দেখেছিলাম, যে নিজেকে রাজা বলেছিল। বলেছিল, সে রাজা হরিশচন্দ্রের বংশধর। পৃথিবীর যেখানে যত শ্মশান সবশ্মশানের মালিক রাজা হরিশচন্দ্র। উত্তরাধিকার সূত্রে সেও সেই রাজত্বের অংশীদার–এক রাজা।
আমি ছিলাম সেইরকম এক রাজা। সম্পূর্ণ রেল স্টেশন, এটা ছিল আমার রাজত্বের সীমা। রাজধর্ম পালনই ছিল আমার কর্তব্য। এই কাজে দশ বারোজন সঙ্গী ছিল আমার। ওরাই মন্ত্রী, ওরাই সেনাপতি। কত তাদের নাম, নামের সাথে উপনাম। হাতকাটা গণেশ।বড় গোপাল, কালো গোপাল, বাঙাল নারান, মেদিনীপুরিয়া নারান, লাথখোর বিমল, কালিয়া, ভোলা, ভীম, কালাচাঁদ, বাচ্চা অমল। এরা কেউ রিক্সা চালাত, কেউ স্টেশনে মোট বইত, কেউ মাছের দোকানে মাছের আঁশ ছাড়াতো, কেউ কাগজ কুড়াত, মদের দোকানে কাজ করত বাচ্চা অমল। এদের কারো মা কারো বাবা ছিল না, কারো মা বাবা দুজনেই মারা গেছে, কারও মা বাবা থেকেও নেই। কেউ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, কাউকে কেউ স্টেশনে বাসয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে। এদের মা বাবা দাদা অভিভাবক সব ছিলাম আমি। ওরা আমার জন্য জীবন বাজি রেখে যে কোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত, আমি পারতাম ওদের জন্য যে কোনো কাজে ন্য, অন্যায় বিচার না করে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে।
