প্রথমে এলাম সুলেখা কালি কোম্পানির সামনে শ্যামা কলোনির মোড়ে। এখন আর সেই কালি কোম্পানিটা নেই। কারখানার গেটে ঝুলছে পেতলের বড় তালা। বাঙালির বড় গর্ব বড় অহঙ্কারের সেই সুলেখা কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সকাল ছটা থেকে বেলা দুটো, আবার দুটো থেকে রাত দশটা দুশিফটে কাজ চলত। বেলা ন’টায় সাইরেন বাজত, হাজার বারোশো মানুষ কাজ করত, এখন কে কোথায় গেছে, কে জানে।
শুধু সুলেখা নয় এখানে অনেক কল কারখানাই বন্ধ। ওদিকে ঊষা, বেঙ্গল ল্যাম্প, এদিকে কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরি তার পাশে অন্নপূর্ণা, আর একটু এগিয়ে ডাবর। সবই বামফ্রন্টের অবদান। শুনতে পাই সারা পশ্চিমবঙ্গে নাকি পঁয়ষট্টি হাজার কারখানা এদের শাসনে বন্ধ হয়ে গেছে। ‘শ্রমিক শ্রেণির পার্টি’-র বদান্যতায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক মরছে না খেতে পেয়ে।
দেখলাম শ্যামা কলোনি মোড়ের কাছে যে জায়গাটায় আমরা থাকতাম সেখানে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটা বিল্ডিং। আমরা এখান থেকে চলে যাবার পর আগের মালিক জায়গাটা যদুবাবু নামে একজনকে বিক্রি করে। যদুবাবু মুলিবাঁশ টালির দোকান করেছিল। সেই দোকানে কিছু বিহারি মজুর কাজ করত। জীবনের এক পর্বে গৃহহারা এক যুবক রাতের আশ্রয় খুঁজতে এখানে এসে তাদের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ত। সেই পর্বে পুলিশ তাকে খুঁজত।
সুলেখার গেট থেকে রামকৃষ্ণ উপনিবেশের সি-ব্লকের মসজিদের সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকা সেই লাইট পোস্টটাকে দেখতে পেলাম। যেটায় একদিন আমাকে পিছমোড়া করে বেঁধে চোরের মতো ঠেঙিয়েছিল সিপিএম নেতা পিন্টু সেন। সেটা ঊনসত্তর সালের শেষ ভাগ। আমার অপরাধ ছিল এই যে, আমার বন্ধু রামকৃষ্ণ উপনিবেশের ‘আলু স্বপন’ এক অলস দুপুরে নিতান্ত ছেলেমানুষি বুদ্ধিতে একটা দেওয়ালে সিপিএম লেখা তিনটে অক্ষরের পাশে আর একটা অক্ষর ‘এল’ বসিয়ে দিয়েছিল। আমি তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তবে সেই লাইট পোস্টটা এখন আর ফুটপাতে নেই, চলে এসেছে রাস্তার অনেকটা উপরে। কারণ রাস্তাটা অনেক চওড়া হয়ে গেছে। কেননা গাড়ির সংখ্যা আগের তুলনায় হাজারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বামফ্রন্টের শাসনে এক শ্রেণির লোকের হাতে এই সময়ে প্রচুর টাকা। পরিবর্তিত পরিস্থিতি যেমন লক্ষ কোটি লোককে নিঃস্বনির্ধন বেঘর-সর্বহারা বানিয়ে ছেড়েছে, কিছু স্বঘোষিত ভিখারির বাচ্চারা হাজার কোটির উপর নাচছে।
এই সেদিন যে বাম নেতাকে ছেঁড়া পাঞ্জাবী পরে, ভাঙা চায়ের দোকানে বসে বিড়ি ফুঁকতে দেখে গেলাম তার ঠাটবাট বিলাস বৈভব দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছে আমার। শুধু এক কাউন্সিলার হয়ে যদি এত সম্পত্তি তাহলে যারা এম.এল.এ. মন্ত্রী তাদের কত হাজার কোটি কে জানে!
সেই পিন্টু সেন আজ আর নেই, মরে গেছে। মরে গেছে সেই আলু স্বপনও। আমি আছি, আছে সেই লাইট পোস্টটা, আছে একটা যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি। পিন্টু সেনের দিয়ে যাওয়া হাঁটুর ব্যথাটা এখন বড় বেগ দেয়। যখন বয়স কম ছিল অতটা মালুম পাইনি। এখন বয়স যত বাড়ছে ব্যথাটা বেড়ে যাচ্ছে। আর কিছুদিন পরে সে আমাকে চলৎশক্তিহীন অথর্ব বানিয়ে দেবে।
শ্যামা কলোনির যে জায়গাটায় আমরা থাকতাম তার উল্টোদিকে একটা বড় খাল ছিল। শহরের যত নোংরা জল এই খাল দিয়ে বানতলার দিকে চলে যেত। এখন সেখানে বানানো হয়েছে কবি সুকান্তের নামে একটা সেতু। আমি চলে যাবার পর এর নির্মাণ হয়েছে।
খালপার ধরে উত্তর দিকে কিছুটা হেঁটে এলে বাঁদিকে যাবার একটা সরু পথ ছিল টিবি হাসপাতালে যাবার। পথের ডাইনে-বাঁয়ে দুই দিকে দুটো ডোবা ছিল। তেমন একটা বড় ডোবা নয়, বাঁ দিকেরটায় পচা পাক হোগলা জোঁক ছিল, ডানদিকেরটায় সবুজ জল।
স্মৃতি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সেতুর উপর দাঁড়িয়ে সেই জায়গাটা চিনে নেবার চেষ্টা করি। এক সন্ধ্যায় মুখে মুড়ি নিয়ে বুকে গুলি খেয়ে যে সবুজ জলে ডুবে গিয়েছিল বাবলু। আমার বন্ধু। আর প্রাণভয়ে উল্টো দিকের পচা ডোবায় ঝাঁপিয়ে প্রায় চারঘন্টা লাশ হয়ে পড়েছিলাম আমি। সারা শরীরে প্রায় একশো নানা সাইজের জোঁক লেগেছিল।
দেখলাম সেই হাসপাতালের লাশ ঘরের ছাদটা, ভীত শিশু যেমন মায়ের কোলে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। আমি সেইভাবে কত রাত যে ওখানে লুকিয়ে কাটিয়েছি। সেই যেবার কার্তিককে কোপাই–দু’দিন এক রাত লুকিয়ে ছিলাম ওই লাশ ঘরে। দেখলাম টিবি হাসপাতালের সেই মাঠটা, যার ওপাশে একটা ময়লা পোড়ানো চুল্লি ছিল। তুলো, ব্যান্ডেজ, গজ, রোগীদের ব্যবহৃত বাতিল বিছানাপত্র এখানে পোড়ানোনা হতো। চুল্লির ওধারে ঝোঁপঝাড় ছিল, শুয়োর চরত। এধারে ছিল জমাদারদের কোয়ার্টার। দিলীপ, শিবুয়া, এইসব ছেলেদের সাথে কাটত আমার দিন। এখানেই নানুর চোলাই মদের ঠেক ছিল। যে নানু এক সময় পরম শত্রু ছিল আমার, পরে প্রাণের বন্ধু। একদিন সে আমাকে আর একটু হলে মেরে ফেলত, আর একদিন তার বল্লমের আঘাতে অর্ধমৃত দেহটা আমি কাঁধে করে বয়ে এনেছিলাম রণভূমি থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে।
সেতুর উপর দাঁড়িয়ে নীচে দেখলাম বড়লাল সাউয়ের সেই চায়ের দোকান। এখন তার ছেলে বাবুলাল এই দোকানের মালিক। ছোট বেলায় বাসা থেকে পালিয়ে এসে এই চা দোকানে চাকরি নিয়েছিলাম।
