আগে আমাদের থাকবার তাবুখানা বছরে একবার বদলে দেওয়া হতো। এবার আর বদলান হয়নি। পচে ছিঁড়ে যাওয়া তাবুর ফোকর থেকে উঁকি দিচ্ছে দিনের সূর্য রোদ রাতের চাঁদ তারা। বর্ষাকালের আর খুব বেশি বাকি নেই, তখন কী যে হবে কে জানে!
সমস্ত ক্যাম্পটা এখন থেকেও “নেই” হয়ে গেছে। শুধু সরকারি কাগজ পত্রেই নয়, পরিবেশ পরিস্থিতিতেও। আগে তবু বাচ্চারা কাঁদত, বুড়োরা কাশত। জলের কলের লাইনে দাঁড়িয়ে মহিলারা ঝগড়া করত, যা থেকে বোঝা যেত এখানে মানুষ আছে–প্রাণ আছে। কয়েক মাসের মধ্যে এখন ধুঁকতে শুরু করেছে সব প্রাণ। আর কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। মানুষ হাসে না, কথা বলে না। সব যেন মরে পচে গলে শেষ হয়ে গেছে।
আমার বয়েস তখন মনে হয় দশ বছর হবে। তবে বয়েসের তুলনায় রোগে, অপুষ্টিতে শরীরটা সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। যে কারণে মা আমাকে বাবার জেদাজেদি সত্ত্বেও, অন্য বাচ্চাদের তুলনায় একটু দেরি করে বিদ্যাশিক্ষার জন্য স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। কলে জল আনতে গিয়ে মা রোজ দেখতে পেত স্কুলের বাচ্চারা পড়া না পারলে কী নির্মম পেটাই হয়। তার ভয় ছিল আমার এই রোগা শরীরে মাষ্টারের বেত সহ্য হবে না। তাই বেত সহ্য করার মত গায়ে মাংস হবার অপেক্ষায়–আর স্কুলের পাঠ নেওয়া হয়নি আমার।
এখন আমার শরীরটা বাড়ছে। তাই পেটও বড় হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে পেটের খিদে। সেই খিদের কষ্ট আর সহ্য করা যায় না। খিদে পেলে তখন মনে হয় কেউ যেন নাড়িভুঁড়িগুলো ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। কান মাথা আঁ আঁ করে। চোখ ঘোলা হয়ে আসে। হাত পা বুক সব তিরতির করে কঁপে।
একদিন নিরূপায় হয়ে আমাদের ক্যাম্প থেকে বহু দূরের এক গ্রামে, মোটামুটি সচ্ছল এক মধ্যম চাষির বাড়িতে ছাগল গরু চড়াবার কাজ নিলাম। কথা রইল তারা আমাকে দু বেলা খেতে দেবে, আর এক বছর টিকে থাকলে পূজোর সময় দেবে একটা গেঞ্জি একটা প্যান্ট আর একখানা গামছা। যে বয়সে শিশুরা বাস করে নানা রঙের এক মায়াবী জগতে, হেসে খেলে নেচে গেয়ে দুষ্টুমি করে দিন কাটায়, জীবন আমাকে ঠেলে দিল রঙরস স্বপ্নহীন এক কঠোর বাস্তবতার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দুটো বালতি বাঁকে বেধে প্রায় দেড় মাইল দূর থেকে জল বয়ে এনে সবজি ক্ষেত ভিজিয়ে দুটো শুকনো মুড়ি চিবিয়ে ছাগল গরু নিয়ে মাঠে যাওয়া, দুপুরে এক ফাঁকে এসে ভাত খেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে থাকা।
লোকে বলে, সকালটা দেখলে নাকি বোঝা যায় সারাদিন কেমন যাবে। যে ভাবে আমার জন্ম, যেভাবে শুরু হয়েছে আমার বালকবেলা এরইমধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল সেই বার্তা–আগামীদিনগুলো কী নিয়ে অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য বড় হতভাগ্য এক বালক আমি যার কোন বাল্যকালই ছিল না। রঙিন ঘুড়ি রঙবেরঙের কাঁচের গুলি আমার বাবা কোনদিন আমাকে কিনে দিতে পারেনি। দুর্গা পূজার সময়ে বাচ্চারা যখন নতুন জামাপ্যান্ট পড়ে হুটোপুটি খেলে আমি তখন প্যান্টের পেছনের ছেঁড়া জায়গায় হাত দিয়ে ঢেকে দুরে দাঁড়িয়ে থেকেছি। দোল পূর্ণিমার দিন, যখন সবাই রঙে মাখামাখি হয়, আমি তখন রঙের ভয়ে ছুট মেরে পালিয়ে গেছি দূরে–বিবর্ণ নির্জনতার কোটরে। ভয়, গায়ে রং লেগে গেলে তুলব কী করে। সাবান কেনার পয়সা কই?
আমি সেই দুঃখী বালক যাকে তার দিদিমা কোনদিন কোলের কাছে শুইয়ে রাজারানির রাজকন্যার গল্প শোনায়নি। আমার শিশু স্বপ্নে কোন দিন লাল নীল পরীরা সোনালি পাখনায় ভর করে উড়ে আসেনি। আমার কোনদিন কোন স্বপ্ন রঙিন ছিল না, ছিল কৃষ্ণকুটিল অমানিশাঘন ভীতি দায়ক। আমি অনবরত দেখেছি দাঁত নখ বের করা এক রূঢ় রাক্ষসী বাস্তবতাকে। যে প্রেমহীন পৃথিবীর পথে উদ্দাম ছুটে বেড়াচ্ছে। তার মৃত্যুমাখা করাল মুখব্যাদান সর্বনাশা চোখের নীলাভ অগ্নিশিখা আমার জীবন যাত্রাকে ভীত ত্রস্ত ছিন্ন দীর্ণ করেছে সর্বক্ষণ।
জীবনের সেই প্রথম “চাকরিতে” আমি বোধহয় মাস তিনেক টিকতে পেরেছিলাম। তারপর আর পারিনি। যার কারণ অনেকগুলো। যা আমি আমার “অভিশপ্ত অতীত অন্ধকার ভবিষ্যৎ” নিবন্ধে বিস্তারিত লিখেছিলাম। তাই এখন আর জাবর কাটতে চাইনা। তবে কাজ ছেড়ে চলে আসার একমাত্র কারণ মালিকের ব্যবহারই নয়–তার চেয়ে বড় কারণ, মায়ের জন্য বড় মন কেমন করছিল। এর আগে মাকে ছেড়ে কখনও এতদূরে আসিনি, এতদিন থাকিনি।
ক্যাম্পে ফিরে এসে দেখি আমার একটি কালো কুচকুচে বোন হয়েছে। এর আগে একটা ভাই হয়েছিল মেজ ভাই চিত্তরঞ্জনের পরে! বোন হওয়ায় এখন আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত হয়ে গেল। সেই নিয়ে বাবার দুশ্চিন্তা সাতটা প্রাণী এই অবস্থায় বাঁচব কেমন করে। এ এমন এক সংসার যেখানে জন্ম কোন উৎসব নয়, একটা বাড়তি বোঝা। একজন উদ্বৃত্ত মানুষ।
এবার আমার বাবা স্থির করলেন যে অনেক হয়েছে, শিরোমণিপুর ক্যাম্পে আর থাকা নয়। যাবেন তিনি যেখানে আমার কয়জন কাকা জ্যেঠা থাকেন সেই দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ঘোলা দোতলার রিফিউজি ক্যাম্পে। দেশ থেকে আগে বের হবার কারণে যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে ওই ক্যাম্পে গিয়ে পড়েছে। আমাদের সেই আত্মীয়দেরও দণ্ডকারণ্য না যেতে চাওয়ার অপরাধে ডোল বন্ধ হয়ে গেছে।নাম কাটা গেছে ক্যাম্প রেজিস্ট্রার থেকে। এখন এরা–এইনাম কাটা যাওয়া মানুষেরা, আর এদেশের কেউ নয়। এদের আর দেশ বলে কিছু নেই। কোন দেশেরই এরা কেউ নয়। কলমের কী অসীম ক্ষমতা। যার এক আঁচড়ে হাজার লক্ষ মানুষ “নেই” হয়ে যায়।
