এখানে আমাদের নেতা ছিলেন আশু মজুমদার। খবর পেয়ে বেলা ন’টা নাগাদ তিনি এলেন। মহিলাকে দেখলেন, তার মুখে সব শুনলেন এরপর আমাদের ডাকলেন। খুব শান্ত গলায় বললেন–আমরা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। আমাদের প্রতিটা আচার-আচরণ-কর্মে সেই কমিউনিস্ট পরিচিত থাকা বাঞ্ছনীয়। যেভাবে লোকটাকে তোমরা মেরেছে সেটায় একটা ফ্যাসিস্ট সুলভ হিংস্রতার প্রকাশ ঘটেছে। এটা কাম্য নয়। তোমরা লোকটার উপর অত্যাচারের মধ্য দিয়ে একটা বিকৃত আনন্দ উপভোগ করেছো এসব তো ফ্যাসিস্টরা করে, আমরা কেন করব। তাহলে আমাদের সাথে এক সাধারণ অত্যাচারীর কী তফাৎ রইল।
তাহলে কী অপরাধীকে আমরা ছেড়ে দেব? না ছেড়ে দেব না। যদি দেখা যায় অপরাধীর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য, অপরাধী একেবারে সংশোধনের বাইরে সেক্ষেত্রে হয়ত গলার নলিটা কেটে দেব কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রণা দেব না। এই মনোভাব আমাদের মানুষের কাছে ঘৃণ্য বলে প্রতিপন্ন করে তুলবে। কমিউনিস্ট না ভেবে কসাই বলে ভাবতে শেখাবে।
ফ্যাসিজম কী? একদিন আমাদের এক নেতা ননীদা বলেছিলেন–ফ্যাসিজম হচ্ছে একটা প্রবৃত্তি। জনগণের উপর নিজের মত বল প্রয়োগ দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া এবং তাকে মেনে নিতে বাধ্য করা। মানুষের সমস্ত মানবাধিকারকে খর্ব করে তাকে দাসানুদাসে পরিণত করা। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টু-শব্দ করবে তার উপর চরম অত্যাচার নামিয়ে আনা এবং নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এটাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। নামে কমিউনিষ্ট হলেওসিপিএম পার্টির মধ্যে এই প্রবণতা তার জন্মলগ্ন থেকেই বিদ্যমান ছিল। যা পরবর্তীকালে ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পায়।
এরপর এল সেই ঐতিহাসিক সাতাত্তর সালের নির্বাচন। পঁচাত্তর সালে ইন্দিরাগান্ধি সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দেশ জুড়ে একটা দমন-পীড়ন-হত্যালীলার মধ্য দিয়ে শাসন ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার অপচেষ্টায় জনগণের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যান। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জয়প্রকাশ নারায়ণ সমস্ত বিরোধী দলকে এক মঞ্চে নিয়ে আসতে সমর্থ হন, গড়ে ওঠে একটা নতুন দল-জনতা দল। সেই দল নির্বাচনে জয়লাভ করে। সেই প্রথম দিল্লিতে গঠিত হয় এক অকংগ্রেসি সরকার।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে বামফ্রন্ট। না, তারা যে সেই সময় শুধু ছলচাতুরি বা ভয় দেখিয়ে ভোটে জিতেছিল এটা বলা অন্যায় হবে। সে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে কিছু পরে। তখন মানুষ সত্যিই তাদের বহুমূল্য ভোট এদের পক্ষেই দিয়েছিল। একদিকে তারা যেমন কংগ্রেসের অপশাসন থেকে মুক্তি খুঁজছিল, সিপিএম বা অন্য বাম দলগুলো কিছু জনহিত কাজ করেছিল।
যার প্রথম এবং প্রধান–’অপারেশন বর্গা’।তখন জোতদার জমিদারদের দখলে রাখা সিলিং বহির্ভূত হাজার হাজার বিঘে জমি লাল ঝাণ্ডা পুতে দখল করে ভূমিহীনদের মধ্যে বিলিবন্টন করে বলে দেওয়া হচ্ছিল যদি তুমি আমাদের দলে থাকো দল শক্তিশালী থাকবে। যদি তুমি ভোট দাও দল ক্ষমতায় যাবে। দল ক্ষমতায় থাকলে কারও বাপের ক্ষমতা নেই তোমাদের জমি কেড়ে নেবার। যদি দল ক্ষমতায় না থাকে জানিনা কী হবে। এই দুয়ের যোগফল রাইটার্স দখল এবং দীর্ঘকাল দখল করে রাখা।
সেই যে তারা এসে গেল–আর যাবার নাম নিল না। অজগরের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে আরাম কেদারার উপর পড়ে রইল চৌত্রিশটা বছর। এদের বিষ নিঃশ্বাসে বিষাক্ত হয়ে গেছে। বঙ্গের বাতাস, পুড়ে গেছে কত শান্ত গ্রাম, কতো মায়ের কোল খালি হয়েছে, মুছে গেছে কত সিথির সিদূর। কেউ এদের ঠেলে ফেলতে পারেনি ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে। কারণ তারা তখন শিখে গেছে ক্ষমতাকে ধরে রাখার চাণক্য কৌশল শিখে গেছে ভোট বাসো ভরাবার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
এই সময় এদের দ্বারা সংঘটিত হয় এই শতাব্দীর সবচেয়ে ক্রুর জঘন্য নির্মম হত্যাকাণ্ডের সেই ঘটনা–যার নাম ‘মরিচঝাঁপি’। কত হাজার মানুষকে হত্যা করে পেট চিরে নদীগর্ভে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে, কত আহত নিহতকে জঙ্গলে ফেলে আসা হয়েছে বাঘের খাদ্য হিসাবে, কেউ তা জানে না। কতশত গরিব গৃহবধু, যুবতী নাবালিকা শিকার হয়েছে বর্বর বলাৎকারের কেউ কোনোদিন তার হিসাব পাবে না।
বস্তুত, এক সময় সারা বাংলায় সিপিএম দল যে ধর্ষণ সংস্কৃতি দ্বারা প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে উদ্যোগ নেবে তার প্রথম সূচনা হয় এই নির্জন দ্বীপ মরিচ ঝাপিতেই। এরপর তো বানতলা, ধানতলা, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম–শত শত ঘটনা।
সেদিন মানুষ আক্ষেপে মাথার চুল ছিঁড়বে। বুঝবে, যে দৈত্যকে একদিন তারা বোতলের ছিপি খুলে দিনের আলোয় এনেছিল, মুক্তি দিয়ে দিয়েছিল বন্দিদশা থেকে, কী তার আসল চরিত্র।
তবে মানুষ–খালি গায়ের মানুষ, খালি পায়ের মানুষ খালি পেটের মানুষ চোখের কোণে জল চিকচিক করা মানুষ, জন্মদ্বারে রক্ত দাগ বহন করা মানুষ, ফুটো হয়ে যাওয়া মানুষ। মানুষ…মানুষ…মানুষ…।এরাই সংঘবদ্ধ হলে মহাশক্তিমানও ভয়ে কেঁচো হয়ে যায়। এরাই আবার সেই বোতলের দৈত্যকে বোতলে ঢুকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসবে মহাসমুদ্রের অতল জলে।
তবে তার কিছু বিলম্ব আছে এটা তো সবে ১৯৯৭ সাল। অত্যাচারীর সূর্য এখন মধ্য গগনে। কী তার তাপ কী তার তেজ। চারদিক যেন ঝলসে যাচ্ছে সেই তাপে তেজে।
***
০৮. হাওড়ায় নেমে তারপর বাসে
ট্রেন থেকে আমরা দুই প্রবাসী হাওড়ায় নেমে তারপর বাসে চড়ে এসে পৌঁছলাম যাদবপুর। এ ছাড়া আর যাবই বা কোথায়! যাদবপুর ছাড়া আর তো কোনো জায়গা এত গভীরভাবে চিনি না। সে চেনা ঘামের চোখের জলের রক্তের। হ্যাঁ, শরীর থেকে ঝরে পড়া ফোঁটা ফোঁটা তরল গরম লাল রক্তের। লবণাক্ত এই ত্রিবেণী বন্ধনে যে আমাকে বেঁধে রেখেছে–সে এই যাদবপুর। দক্ষিণ কলিকাতা।
