মোটামুটিভাবে উনসত্তর সালের প্রথম দিক থেকে সিপিএম যাদবপুর এলাকায় লাশ ফেলা কার্যক্রম শুরু করে দেয়। তারা প্রথম যে খুনটা করে সেটা রাজাপুরে। পরিমল দে নামে একটি ছেলেকে নকশাল রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার অপরাধে বল্লম কুঁড়ে মেরে ফেলা হয়। “রক্ত বড়ই সংক্রামক”। এরপর তো লাশের পরে লাশ পড়েই যেতে থাকে। এদিক থেকে ওদিক থেকে সেদিক থেকে যে দল যেদিকে বলবান যেমন ভাবে পারে শুধু লাশ গাদায় লাশ জমা করে চলে।
শোনা যায় হত্যা নিয়ে, মৃত্যু নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা করেছিলেন হিটলার। একটা মানুষ কত কষ্টের পরে মারা যায় তার পরীক্ষা করার জন্য পরীক্ষাগার ছিল। একটা লোককে হাত পা বেঁধে বরফ জলে ফেলে ঘড়ি ধরে দেখা হতো কতক্ষণ বাঁচে।
এই নারকীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা পশ্চিমবঙ্গে আমদানি করে সিপিএম। খুনটা যেন শুধু মাত্র একটা খুন হয়ে রয়ে না যায়, যেন সেটা চায়ের দোকানে, রাস্তার মোড়ে, স্টেশনে বাজারে একটা জনচর্চার বিষয় হয়ে ওঠে, সেটা যেন একটা বীভৎস রসের মৃত্যু শিল্প হয়, যে মৃত্যু দেখে, যে মৃত্যুর কথা শুনে মানুষের বুক আতঙ্কে হিম হয়ে ওঠে, নড়বড়ে হয়ে যায় সাহসের ভিত। সিপিএম পার্টির বিরুদ্ধে কিছু বলা বা করার কথা ভাবলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই নৃশংস নির্মমভাবে নিহত শবদেহটির কথা।
এটা তারা বস্তুবাদী বিচার বুদ্ধি দিয়ে আবিষ্কার করে যে, চাকু বোমা গুলি নয়, মানুষকে মারতে হবে আরও ক্রুরভাবে, হাজার চোখের সামনে প্রকাশ্য দিনের আলোয়। তবেই একটা স্থায়ী ভয় গেঁথে বসে যাবে জনগণের মনে, যা স্থায়ী ফল দেবে। একটা জীবন্ত মানুষের দেহে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এটা তাদের গভীর চিন্তার ফসল। একজন দুজন নয়, একের পর এক আঠারো জন। শহর কলকাতার বক্ষস্থলে দিনের আলোয়, হাজার হাজার মানুষের চোখের সামনে পুলিশ ফাড়ি থেকে দুশো গজ দুরে–গায়ে আগুন নিয়ে মানুষ দৌড়াচ্ছে, এ দৃশ্য যে দেখছে চিরদিনের জন্য মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে হিমশীতল মৃত্যু ভয়। বিরোধ করার সাহস উড়ে যাচ্ছে কর্পূরের মতো। ভোটের বাক্সের কাছে গিয়ে বুক শুকাচ্ছে যদি ওদের ভোট না দিই জেনে ফেললে আমার কী হবে।
যাদবপুরে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক কারণে যাকে খুন করা হয় সে সময় ওটা করার খুব একটা দরকার ছিল না। সেই সময় সবে নকশালবাড়ি থেকে একটা ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক মতবাদ কলকাতা শহরে অনুপ্রবেশ করেছে। একদল তরুণ, যুবক, ছাত্র আবেগের নৌকায় সওয়ার হয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে আর দেওয়ালে দেওয়ালে মাও-সে-তুং-এর ছবি আঁকছে। আর কিছু নয়। তবু পরিমল দে-কে মরতে হল। মারা হল বিনা প্ররোচনায়, স্রেফ এলাকাকে উত্তপ্ত করে তোলার প্রয়োজনে।
সব মৃত্যুই দুঃখের, সব হত্যাই বিভৎস। তবে সিপিএমের কাছে পরিমলের মৃত্যু ততটা বিভৎস নয় যতটা তারা চায়। তাই কিছুদিন পরে এই রাজাপুরে মনুয়া নামে আর একটি ছেলেকে মারা হল সারা শরীরে আঠারোটা গজাল পেরেক পুতে। একটা ছয় ইঞ্চিগজাল ঠোকা হয় ব্রহ্মতালুতে।
এর কিছুদিন পরে কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরির পিছনে একজনকে মারা হয় পায়ুদ্বারে কঁচি ঢুকিয়ে, একজনকে মারা হয় বস্তায় ঢুকিয়ে ইট দিয়ে থেতলে। এসব ছাড়া আরও নানা ধরনের হত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছিল গ্রামবাংলা থেকে। জ্যান্ত কইমাছ গিলিয়ে, অ্যাসিড খাইয়ে কত কষ্ট দিয়ে মানুষ মারা যায় তার একটা পৈশাচিক পরীক্ষা সর্বত্র চালানো হচ্ছিল পরিকল্পিতভাবে। জনগণকে ভীত এস্ত করার লক্ষ্যে।
এখন আমার একটা পুরাতন দিনের ঘটনা মনে পড়ছে। আমি সেই সময় কিছুদিনের জন্য নকশাল দলের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। কেন হয়েছিলাম সেটা সবিস্তারে এই বইয়ের প্রথম ভাগে লেখা রয়েছে। সেই সময় একরাতে অনেকে মিলে রাত পাহারা দিচ্ছিলাম যাতে এলাকায় পুলিশ না ঢুকতে পারে। ওখানে একটা ভাড়াটে বাড়ি ছিল যেটায় আট-দশঘর ভাড়াটে বাস করত। সবই দরিদ্র শ্রেণির। এক ঘরে থাকত এক রিকশাঅলা তার যুবতী স্ত্রীকে নিয়ে। সে ভোর চারটেয় রোজ রিক্সা নিয়ে মাছের ট্রিপ মারতে চলে যেত। সেদিনও সে রোজকার মতো চলে গেছে। আর পাশের ঘরের এক ভাড়াটে খোলা দরজা পেয়ে চুপিসারে ঢুকে পড়েছে অন্ধকার ঘরে। আর শুয়ে থাকা বউটার শরীরে শুয়ে পড়েছে আসঙ্গ লিপ্সায়। বউটা প্রথমে ভেবেছিল হয়ত স্বামী ফিরে এসেছে, পরে বুঝতে পারল এই স্পর্শ আলিঙ্গন পেষণ অপরিচিত। অবাঞ্ছিত কেউ দখল নিতে চাইছে তার দেহকে। তাই সে বাধা দিল। চিৎকার আর জাপটে ধরল অপরাধীকে। অপরাধী ভেবে রেখেছিল এই রকম পরিস্থিতির তৈরি হলে তখন কী করবে। একটা চাকু নিয়ে গিয়েছিল সে। সেই চাকুটা দিয়ে মহিলার গলায় আঘাত করে মহিলার বাহুর বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে ছুট দিল। কপাল খারাপ তার, পালাতে পারল না, ধরা পড়ে গেল আমাদের হাতে।
এরপর যা হয়, শুরু হল শাস্তিদান পর্ব। আমাদের কেউ ব্লেন্ড দিয়ে চিরে চিরে নুন দিতে লাগল তার গায়ে, কেউ সিগারেটের ছ্যাকা। কেউ নখে সেপটিপিন ঢোকাল, কেউ ভাঙল আঙুল। সেই ভোর চারটে থেকে সাতটা তিনঘন্টা চলল অমানুষিক অত্যাচার। তারপর তাকে আধমরা অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হল।
