এই ফ্রন্টের সবচেয়ে বড়শরিক সিপিআই(এম)।এরা এদের ধূর্তবুদ্ধি দিয়ে বুঝেছিল এদেশের বেশিরভাগ মানুষ ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর, যাদের জীবন জীবিকা যুক্ত হয়ে আছে জমির সঙ্গে। এদের নিজের গোয়ালে ঢোকাতে পারলে ভোটের বাকসো উপছে পড়বে। তাই এদের সামনে টোপ হিসাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটা মনোলোভা শ্লোগান-লাঙল যার, জমি তার। শ্লোগানে বেশ কাজ দেয়, সংগঠন বেড়ে যায় চড়চড় করে।
একদল সরল সোজা মানুষ এদের উপর বিশ্বাস করেছিল, ভেবেছিল এরা ক্ষমতায় এলে সত্যি সত্যি আমরা, যে জমিতে আমাদের লাঙল চলে, ঘাম ঝরে, আর সেই ঘাম ঝরানো ফসল দখল নেয় জোতদার-জমিদারদের লোকজন, সেই জমির মালিকানা-দখলি স্বত্ব পেয়ে যাব। ফলে তারা উত্তরবঙ্গের বীর সিং জোতে নকশাল বাড়িতে শুরু করে দিয়েছিল জোতদারদের ধানের গোলা জমি দখল অভিযান। আর তখনইসিপিএম নেতাদের মুখ থেকে সরে গেল সব জনদরদী-কৃষক দরদীর রঙ বেরঙ-এর মুখোস। তারা তো শুধু ভোটের বাসো ভরাবার জন্য লাঙল যার জমি তার, বলে ছিল। সেটা তো সত্যিকারে চায়নি। কী করে চাইবে? বড় বড় কত জোতদার নেতা হয়ে বসে আছে এই দলে।
তাই তারা পুলিশ নামাল। আর পুলিশ, সেই পুলিশ যাকে চাকরি দেবার পর শেখানো হয়েছিল লাঠি কেমন করে চালাতে হয়, কেমন করে গুলি চালিয়ে ফুটো করে দিতে হয় বুক, মাথার খুলি। কেমন করে ঘর পোড়াতে হয়, ধর্ষণ করতে হয়, কঁচা কঁচা খিস্তি দিতে হয় মা বোন তুলে। শুধু শেখানো হয়নি জনগণের কারোর টাকায় টাকায় মাইনে নিলে জনগণের সেবক হতে হয়, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় বন্ধুর মতন। সেই পুলিশ, যাদের বিবিধ প্রশিক্ষণ দ্বারা ব্রিটিশ শাসকরা বানিয়ে তুলত মনহীন মস্তিষ্কহীন এক একটি যন্ত্র দানব। যাদের পরবর্তীকালে কংগ্রেস সরকারও অনুরূপ অপরিবর্তিত রেখে ব্যবহার করে গেছে, এই সরকারও ব্যবহার করল।
সেদিন গরিব দরদী শ্রমিক কৃষক দরদী’সরকারের পক্ষে একদল না খাওয়া গরিব আদিবাসী চাষি ক্ষেতমজুরের দিকে গুলি চালাল তারা। বুকে পেটে মাথায় গুলি লেগে শুয়ে পড়ল সাতজন মহিলা একজন যুবক একটি শিশু। পল্লী কবি গান বাঁধল, তরাই কান্দেরে, কান্দে আমার হিয়া, নকশাল বাড়ির মাঠ কান্দে সপ্ত কন্যার লাইগ্যা।
সিপিএম দল, যার পতাকার রঙ মানুষের রক্তের মতো লাল, যার গায়ে আঁকা থাকে কাস্তে হাতুড়ি তারা। যে পতাকা বাঁধা থাকে মোটা শক্তপোক্ত লাঠির মাথায়, যে লাঠির এক আঘাতে মাথা ফেটে ঘিলু ছিটকে পড়ে পাশের দেওয়ালে, পথের ধুলায়, তাদের কর্মী সমর্থকের সংখ্যা যাদবপুর অঞ্চলে অনেক। সেই যে যখন জবরদখল কলোনির পত্তন শুরু হয়েছিল, যখন চারখানা খুঁটি আর একখানা লাঠির জোরে স্থাপনা হচ্ছিল জনবসতির, তারা সেই লাঠির আগায় লালঝাণ্ডা বেঁধে নিয়েছিল।
যাদবপুর অঞ্চলে প্রায় গোটা তিরিশ-চল্লিশ এমন জবরদখল কলোনি রয়েছে। শুধু যাদবপুরই নয়, বলতে গেলে শহর কলকাতার আশে পাশে যেখানে যত উদ্বাস্তু কলোনি আছে–শোনা যায় এর সংখ্যা নাকি একশো উনপঞ্চাশ-এর প্রত্যেকটাই সিপিএম দলের এক একটা শক্ত ঘাঁটি। প্রথমদিকে এই উদ্বাস্তুদের নিয়ে আন্দোলন করেইসিপিএম পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের পরিচয় গড়েছিল। রাজনৈতিক জমি পেয়েছিল পায়ের তলে। তার আগে এই দলে নেতা ছিল, কর্মী ছিল না।
তবে একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেছিল বিজয়গড়ের বেলায়। পশ্চিমবঙ্গে এটাই সর্বপ্রথম সর্ববৃহৎ জবরদখল কলোনি। যখন এই কলোনির পত্তন হয় একে সর্বতো সহযোগিতা দান করেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। যার নেতৃত্বে বিজয়গড় কলোনির স্থাপনা হয় সেই সন্তোষ দত্ত ছিলেন বিধান রায়ের অতি পরিচিত এক কংগ্রেস নেতা। স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি জেলও খেটেছিলেন। এ কারণে এখানে প্রথম থেকেই একটা কংগ্রেসি ধ্যান-ধারণা রাজনীতির প্রচার প্রসার কেন্দ্র ছিল। এখানে দুর্গাপূজার সময় দেবী দুর্গার আদলে যে মূর্তির নির্মাণ এবং আরাধনা করা হতো এরা তাকে বলত ভারতমাতা। ধূমধামে পালন করা হতো নেতাজির জন্মদিন। পনেরোই আগস্ট পতাকা তোলা, প্রভাতফেরি এসব হতো।
এই মেরুকরণের ফলে বিজয়গড় এবং মে দিবস, নভেম্বর বিপ্লব পালন করা কলোনির মধ্যে একটা মতবিরোধ ছিল। তারা দেশ ভাগের জন্য কংগ্রেসকে দায়ী মনে করত, আর বিজয়গড়কে কংগ্রেসের দালাল। প্রতিক্রিয়াশীল, বুর্জোয়াদের তল্পিবাহক, সি.আই.-এর এজেন্ট। এই বিরোধ সত্তরের দশকে এসে বদলে যায় খুনোখুনিতে।
তরকারিতে যেমন নুন, রাজনীতিতে তেমনই খুন। নুন ছাড়া যেমন তরকারিতে স্বাদহয় না, লাশ না পড়লে গরম হয়না রাজনীতির আখড়া। রাজনীতির অঙ্গন উত্তপ্ত না হলে ভাষণে সে আগুন ঝরে না। জনগণ তেমন একটা তেতে-তেড়ে ফুড়ে ওঠে না। মার-কা-বদলা মার হ্যায়, খুন কা বদলা খুন হ্যায়, কেমন ম্যাড় মেড়ে শোনায়।
ধ্বনির যেমন প্রতিধ্বনি, আঘাতের যেমন প্রত্যাখ্যান, লাশেরও তেমনই পাল্টা লাশ। যত লাশ তত বক্তৃতা, মিটিং মিছিল শ্লোগান। তত হরতাল, ভাঙচুর বাস পোড়ানোতখন ঘরকুনো সাধারণ শান্তিবাদী মানুষের মধ্যেও আলোড়ন ওঠে, উৎসাহ দেখায় রাজনীতি চর্চায়, পক্ষপাত গ্রহণে এবং সক্রিয় সহযোগিতায়। দলের বাড়বাড়ন্ত ঘটে।
