যখন আমার চৌদ্দ কী পনের বছর বয়স, তখন একদিন দেখি পুরো শহরটা একেবারে লালে লাল হয়ে গেল। সন্ধ্যের পরে রাস্তার পাশে যেখানে যত দোকান, বাজার, যত লাইট পোস্ট, সব বাম্ব টিউবকে মুড়ে ফেলা হল লাল কাগজ দিয়ে। তখন টিভি তো ছিল না, তবে রেডিও ছিল। তা অবশ্য সবার ঘরে নয়। যারা আর্থিক দিক থেকে কিছু স্বচ্ছল, শৌখিন, তারাই রেডিও পুষত। তখন ঘরে রেডিও রাখার জন্য সরকারকে বছরে পঞ্চাশ টাকা ট্যাক্স দিতে হত। সেই সময় পঞ্চাশ টাকার মূল্য অনেক। আমার একমাসের শ্রমের মজুরি মাত্র দশ টাকা। যাদের তখন পঞ্চাশ টাকা ব্যয় করার ক্ষমতা ছিল তাদের বিনোদন এবং গৃহের শোভা বৃদ্ধি করত ওই বস্তুটি।
যাদবপুরে আর কার কাছে রেডিও ছিল তা কে জানে, তবে সন্তোষপুরের ত্রিকোণপার্কের বড়লাল সাউয়ের যে চায়ের দোকান সেই দোকানে একটা ছিল। আমি এখানে চা বানানো গেলাস ধোবার চাকরি করতাম।(চাকরগণ যাহা করিয়া থাকে তাহাই চাকরি) রোজ বেলা আড়াইটা থেকে তিনটা আধঘন্টা রেডিওর বিবিধ ভারতী অনুষ্ঠানে মনের মতো গান হতো। পথচলা লোকের হাতে সময় থাকলে দাঁড়িয়ে সে গান শুনত। আর যেদিন মোহনবাগান ইস্ট বেঙ্গলের ফুটবল ম্যাচ হতো সেদিন দোকানের সামনে খেলার ধারা বিবরণী শোনার জন্য লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত।
সন্ধে সাতটার খবর শোনবার জন্যও খুব ভিড় হতো। যে সংবাদ আগামীকাল পাওয়া যাবে খবরের কাগজের পাতায় তা আজই মানুষ জেনে যেত রেডিওর মাধ্যমে খবর পড়তেন বেশিরভাগ দিন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় তার গলার নাটকীয় স্বরের আবরাহ অবরোহনে মানুষ জেনে নিত সারাদিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির বিবরণ।
একদিন তারই গলায় পাওয়া গেল সেই অবিশ্বাস্য খবর, স্বাধীনতার পর থেকে একাদিক্রমে প্রায় তিরিশ বছর যে দলটার হাতে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা ছিল তারা এতকাল যারা বিরোধী ভূমিকা পালন করেছে সেই ছোট ছোট দলের এক সম্মিলিত ফ্রন্টের কাছে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গেছে। ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গেছে কংগ্রেস দল।
সেই প্রথম বঙ্গের মানুষ একটা অন্য ধরনের শাসন ক্ষমতার স্বাদ পেল। দেখল রাজার ছেলেই রাজা হয় সেই নিয়ম যেমন কিছুকাল আগে বদলে গিয়েছিল, এখন বদলে গেল সেই বিধান, যে রাজ্য শাসন করতে হলে সভ্য শিক্ষিত ধনবান হতে হবে। দেখা গেল এখন এমন কিছু এম.এল.এ. হয়েছে যারা সম্পূর্ণ নিরক্ষর এমন কিছু মন্ত্রী হয়েছে যারা এইট পাশ। সব জন্মেছে এমন পরিবারে যাদের পেটে ভাত, গায়ে জামা, পায়ে চটি, মাথায় তেল থাকে না। এরাই এখন চালাবে রাজদণ্ড-পাবে রাজসুখ।
মানুষ ভেবেছিল এরা যখন নীচুতলা থেকে গরিব ঘর থেকে ওখানে গেছে-নীচের লোক, নিজের লোকদের দিকে নিশ্চয় ফিরে তাকাবে। তাদের জীবন একটু যন্ত্রণামুক্ত করার উদ্দেশ্যে উদ্যোগ নেবে। মানুষ অনেক কিছু ভাবতে পারে অনেক আশা করতে পারে, কিন্তু চিরসত্য এই–”যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ”।
একটা প্রবাদ আছে যে বাঘ একবার রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে তার পক্ষে আর তা বর্জন করা সম্ভব হয় না। তেমনই যে নেতা একবার ক্ষমতার স্বাদ-সুখ পেয়ে যায়, আরাম আয়াসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সেই মধুর ভাণ্ডারটির লোভ সামলে আগের মতো মাঠে ময়দানে-ক্ষেতে খামারে, কলে কারখানায় মানুষের মাঝে-মানুষের কাজে প্রাণপাত করবার সদিচ্ছাকে ধরে রাখতে পারে না। তখন তার মধ্যে একটাই উদ্দেশ্য বড় বিকটভাবে বৃদ্ধি পায়–ছল বলে কলে কৌশলে যে কোনোভাবেইক্ষমতাকে ধরে রাখা। সে জন্য সে নীচতা হীনতা হিংস্রতার যে কোনো সীমা অতিক্রম করে যেতে পারে।
একদিন যেসব আমলা-অফিসার তাদের অবহেলা-অপমান করত, তারাই আজ স্যার স্যার করে হাত কচলে আগু পিছু ঘুরছে, লেজ নাড়ছে, সে যে কী আনন্দের, কী ভীষণ পরিতৃপ্তির, কী ভীষণ নেশার বস্তু–তা একমাত্র সেই জানে যার ভাগ্যে এসব জুটে গেছে।
ফলে, তখন ওইসব নেশাগ্রস্ত নেতাদের কাছে কোনো নীতি আদর্শ জনহিত কার্য নয় একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মধু ভাণ্ডারটির দখল রেখে নিজের ভাগে যতবেশি পরিমাণ সম্ভব মধু ঢেলে নেওয়া। আর তাই ভাগাড়ে গরু পড়লে যেমনভাবে শেয়াল-শকুনে ছেঁড়াঘেঁড়ি করে কামড়া কামড়ি করে, নিজেদের মধ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্টের নেতায় নেতায় কর্মীতে কর্মীতে শহরের গলি থেকে গ্রামের মেঠো পথ–সর্বত্র শুরু হয়ে গিয়েছিল তুমুল লড়াই। নিজেরাই নিজেদের লাশ ফেলা শুরু করে দিয়েছিল পাইকারি হারে। এখন যেমন একা ইজ্রাইল চারদিক ঘিরে থাকা আরব দেশগুলোকে ব্যাপক মার দেয়, একা সিপিএম প্যাদাচ্ছিল সবকটা রাজনৈতিক দলকে। জয়নগর কুলতলিতে এস.ইউ.সি., বাসন্তিতে আর.এস.পি.,প্রসাদপুরে সিপিআই, বর্ধমানে কংগ্রেস কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছিল ওদের নির্মম মারে।
তাই সেই প্রথম যুক্তফ্রন্ট আর পাঁচ বছরের মেয়াদকাল পূর্ণ করতে পারল না। বিল্টুদায় নিল মাঝপথে।
রাজনীতিতে যেমন চিরকাল বন্ধু বলে কিছু হয় না, চিরদিনের শত্রু বলেও কিছু হয়না। আজ যার নামে মুর্দাবাদ বলে হুংকার দেওয়া হচ্ছে, দেখা যাবে কাল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরছে। আজ যে বন্ধুর সাথে এক গেলাসে মদ্যপান করছে কাল তার প্রাণ নিতে চাকু হাতে ঝাপাচ্ছে।
তাই, যেসব দলের কর্মীরা নিজেরা নিজেরা খুনোখুনি করছিল একদা নেতা-ই যাদের ওই কর্মে নিয়োজিত করেছিল–সেইসব নেতারা পুনঃ ক্ষমতা কেন্দ্রে ফেরবার প্রয়াসে–নিজেদের মনোবিবাদ দুরে সরিয়ে রেখে দ্বিতীয়বার একত্র হয়ে গড়ে তুলল–আবার একটা ফ্রন্ট। পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা দখল করল সেই দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট।
