এইসব কারণে নয় কোটি জনসংখ্যার পশ্চিমবঙ্গে লাখ পঞ্চাশ লোক দাবি করে এই সরকারের শাসনে বঙ্গের বিশাল উন্নয়ন ঘটেছে, মানুষ খুব সুখে আছে। এই সুখ অক্ষয় হোক। আসুন চোখের মণির মতো রক্ষা করি এই সুখে যারা সাঁতার কাটতে সুযোগ করে দিয়েছে সেই পার্টিকে। যারা তাকে অপসারণ করতে চায় সব প্রতিক্রিয়াশীল, আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের দালাল।সি.আই.এ.-র চর, দেশীয় বুর্জোয়াদের চামচা।
এই দল তার কর্মীদের গভীরভাবে বুঝিয়ে দেয়–যে বিরোধী দলে, ভিন্ন মতাবলম্বী, আমাদের মিটিং মিছিলে যায় না, তাকে যেভাবেই শায়েস্তা করা হোক সেটা অন্যায় নয়, এতে পার্টির কাজই করা হয়। পার্টি সন্তুষ্ট থাকলে তুমি প্রমোটারি দালালি, সাপ্লাই সিন্ডিকেট, এইসব করে মহাসুখ প্রাপ্ত করতে পারবে। জীবিত কালে ভোগ করতে পারবে স্বর্গের যাবতীয় সুখ।
গতকাল সকালে ট্রেন থেকে হাওড়ায় নেমে বাস ধরে এসে পৌঁছেছি যাদবপুরে। তারপর থেকে আমার চেনাজানা জায়গাগুলোয় ঘুরে ঘুরে কী বা কাকে যেন পাগলের মতো খুঁজে খুঁজে বেড়িয়েছি। কাকে খুঁজি? কে আমার আপনজন-আত্মীয় এই শহরে? ঘুরছি আর বুকটা কী এক বোবা বেদনায় যেন টন টন করে উঠছে। চোখে ছল ছল করে ঢেউ ভাঙছে বাঁধ ভাঙা নোনা জল।
এ সেই শহর–বাল্যকাল থেকে যুবা–সারা জীবন, অপমান অত্যাচার অনাহার ছাড়া আর কোনোদিন কিছু দেয়নি। কতবার যে মেরে ফেলার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। চোখ বুজলে দেখতে পাই সেই অন্ধকার সময়ের গর্ভে খোলা চাকু হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একদল আততায়ী মুখ। এই শহর আমার শত্রু, একে ভালোবাসার প্রশ্নই ওঠেনা। তবু বুকটা এমন দুমড়ে মুচড়ে উঠেছে কেন! কেন চোখে জল ভরে আসছে!
কাদছো দাদা? কেনারাম শুধায়।
না তো!
তাহলে চোখে জল?
কী যেন একটা গেল চোখে। ধুলো টুলো মনে হয়।
যাদবপুর। একদার সেই বাস্তুহারাদের আশ্রয়স্থল। এখন এর পুরানো ভৌগোলিক বিন্যাসও বদলে গেছে ভীষণভাবে। আড়ে-বহরে ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে গেছে। আগে চারিদিকে ছিল দরমার বেড়া দেওয়া ঘরে বাঁশের খুঁটির উপর পোড়া মাটির টালি। যাতে বসবাস করত ওপার বাংলা থেকে পালিয়ে আসা ছিন্নমূল হতদরিদ্র মানুষ।
এখন সেইসব ঝুপড়িগুলো আর নেই। সেখানে মাথা উঁচু করেছে বিরাট বিরাট এক একটা দালান। সেই সব বাড়িতে বাস করা মানুষগুলোর ভাষা বা পোষাকে বাঙালিয়ানার নাম গন্ধ অতি কষ্টে খুঁজতে হয়। এখন এরা কলোনির লোক বলতে লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। ইতিমধ্যে কিছু কলোনি আগের নাম বদলে পল্লী করে ফেলেছে। সেই কলোনির এই প্রজন্মের যুবক যুবতীরা এখন ভাষা এবং পোষাকে সংস্কার এবং সংস্কৃতিতে মিশ্রণ করে নিয়েছে ইঙ্গ-বঙ্গ খিচুড়ি ধ্যান ধারণা। এখন এদের দেখে আর সেই পদ্মাপাড়ের বঙ্গসন্তান বলে মনে হয় না, মনে হয় যেন সাগর পারের কোনো সাহেবের কোনো বাঙালি গর্ভে ফেলে যাওয়া বীজে উৎপন্ন ফসল।
এরা আর নিজেদের বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে কোনো আনন্দ, গর্ব, অহঙ্কার খুঁজে পায় না। সেটা যেন কোনো অনুন্নত জাতি গোষ্ঠীর পরিচয়, পিছিয়ে পড়ার কারণ। তাই এদের ঐকান্তিক প্রয়াস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশটাকেবিদেশ বানিয়ে তুলবে। যে কারণে নিউইয়ার, ভ্যালেন্টাইন-ডে, লিভ-টুগেদার, বয়ফ্রেন্ড এইসব বিদেশি জঞ্জাল সাদরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সমাজ করে।
এরা আর বঙ্গ সংস্কৃতি-কৃষ্টি ভাষা সাহিত্য এইসব নিয়ে খুব একটা আন্তরিক নয়। লোক লৌকিকতা, নীতিনৈতিকতা এমনকী শালীনতা অশালীনতা এই সবেরও খুব একটা ধার ধারে না। যান্ত্রিক জীবনে, যান্ত্রিক নিয়মে যেটুকু একেবারে না করলে নয় সেটুকু করে দায় সেরে দেয়। যার মধ্যে সেই পুরাতন দিনের প্রাণের উত্তাপ-আবেগ, আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
যারা এখানে বসবাস করে, এই জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাদের চোখে নাগরিক জীবনের এই পরিবর্তনটা তেমন প্রকটভাবে ধরা পড়ার কথা নয়। আমার পড়ছে। কারণ আমি এখানে ছিলাম না। অনেকদিন পরে এসে দেখছি। তাই পদে পদে হোঁচট খাচ্ছি আর ভাবছি কী দেখে গিয়েছিলাম, আর এখন কী দেখছি।
আমার চোখের দৃষ্টিতে এখন পরিলক্ষিত হচ্ছেশহরের সারা শরীর জুড়ে কদাকার ভোগবাদের স্বেচ্ছাচারী সংস্কৃতির জোয়ার। উদ্দাম-উৎশৃঙ্খল যৌনাচারের অবাধ প্রত্যোৎসাহন, স্বাধীন শব্দের রক্ষা কবচের আড়ালে চূড়ান্ত বেলেল্লাপনা। মনে হচ্ছে একদল পক্ককেশ বদমাশ অতি সুপরিকল্পিতভাবে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে দেশের যুব সমাজকে ওই দিকে এগিয়ে যেতে প্রলুব্ধ করছে। একটা গোটা প্রজন্মকে গড়ে তুলতে চাইছে আত্মসুখ সর্বস্ব-ভোগবাদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত একদল চেতনাহীন প্রাণী হিসাবে। আর এইসব করছে তারাই যারা একদিন গলার শিরা ফুলিয়ে, মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশে ছুঁড়ে বলত–এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব।
যে বছর চিন ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ হয় সেইবছর কী তার পরের বছর তীব্র অনাহারের ছোবল থেকে বাঁচতে বাড়ি থেকে পালিয়ে আমি এই যাদবপুরে আসি। এখানে খাবার মতো, থাকার মতো কোনো জায়গা ছিল না। আমার দিন কাটত পথে পথে ঘুরে আর রাত কাটত রেল স্টেশনে শুয়ে। তখন এই পোড়া পেটটা ভরাবার জন্য কত কী যে করেছি। তবে কলকাতা ছেড়ে ফিরে যাওয়া হয়নি পুরাতন ঠিকানায়, যেখানে আমার মা-বাবা সবাই থাকে। তবে কিছু পরে বাবা সবাইকে নিয়ে এই যাদবপুরে এসে ওঠে।
