যখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভাসতে ভাসতে ছত্তিশগড়ে চলে যাই বা বলা চলে, চলে যেতে বাধ্য হই তখন সমস্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটা গ্রাম, নগর, শহর, জনপদ জুড়ে বয়ে যাচ্ছিল একটা উন্মত্ত, উত্তপ্ত, অস্থির, অশান্ত বাতাস। চারদিকে রোজই বোমাবাজি, মারামারি, হানাহানি, খুনোখুনি চলছিল। লাশ পড়ছিল। মনে হচ্ছিল কোনোদিন এই লাশ গাদায় আমাকেও কেউ শুইয়ে দেবে।
আর তখন, যখন ফিরে এসেছি, চারিদিক কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম শান্ত-নিঝুম নিঃস্তব্ধ। যেন কোন শিশু কাঁদছে না, কোনো বৃদ্ধ কাশছে না, যৌবন হাসছে না।
এককালে অনেকে আমাকে ভয় দেখাত, আমি ভয় পেতাম। এককালে আমিও কাউকে কাউকে ভয় দেখাতাম। সে ভয় পেত কিনা তা জানি না। তবে ভয়ের সঙ্গে সহবাস আমার অনেক দিনের। ভয়কে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি বলে গভীর ভাবে চিনি। জানি, বিষম ভয়ে মানুষ এমন বিষঃ-বধির-বাকহারা হয়ে যায়। মনে হয় আমার যেন সমাজদেহের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হচ্ছে ভয়ের নীল বিষ। তাই মানুষ এত মুহ্যমান এর নিঃস্তব্ধ।
অভিজ্ঞ মানুষ এই স্তব্ধতাকে অন্তদৃষ্টি দিয়ে চিনে নিতে ভুল করবে না। বুঝতে পারবে–এই শান্তি যথার্থ শান্তি নয় এর নাম শ্মশানের শান্তি। সব মানুষ যেন ভয়ে মরে–বেঁকে নুয়ে গেছে। বাঙালির যা ধর্ম সেই ছোটবেলা থেকে সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যেমন দেখেছি যে কোনো অন্যায় অবিচার দেখলে সুর্য সমান তেজে জ্বলে উঠে সমুদ্র গর্জনে ফুঁসে ওঠা, সেসব আর নেই। কেউ নিজেকে বিক্রি করছে কিছু প্রাপ্তির প্রলোভনের কাছে, কেউ ভয়ে ভীত হয়ে অত্যাচারীর পায়ের কাছে বসে পড়ছে আত্মসম্ভ্রম পরিত্যাগ করে।
অনেকদিন পরে এসেছি, তাই আমি যেন দেখতে পাই, এই শান্ততার চাপা দেওয়া কফিনের নীচে আগে যে হিংস্রতা ছিল তা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বলপ্রাপ্ত হয়ে বিরাজমান। তফাৎ শুধু এই যে তা আগের মতো উচ্চ-উগ্রতায় নয়, বহে চলেছে ধীরে অন্তঃশীলা চোরা স্রোতের মতো নিঃশব্দে।
যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, বিশেষ করে শহরে বসে তো আরওই নয়। বোঝা যায় সংবেদী আর নিরপেক্ষ মন নিয়ে সকালবেলায় সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রেখে। গ্রামবাংলা থেকে রাতের অন্ধকারে নিহত আর নিখোঁজ মানুষের বুক হিম করে দেওয়া পরিসংখ্যান দেখে। এবং এটাও হিমশৈলের চূড়া মাত্র। কজন বা এমন বুকের পাটা রাখে যে শাসক দলের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে থানায় গিয়ে বলবে আমার স্বামী বা ছেলেকে ওরা নিয়ে গেছে, আর ফেরেনি। কোনো থানার এমন অফিসার আছে যে শাস্তির ঝুঁকি নিয়ে ডায়েরি লিখবে।
আগের মানুষ–যারা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী বা পোষাগুণ্ডা, তারা প্রয়োজনবোধে লাঠিসোটা নিয়ে একে অপরের দিকে ধেয়ে যেত, খুব হৈচৈ বাধাত, এক আধজনার মাথা ফাটাতো। তাতে বাওয়াল খুব বেশি হলেও মানুষ মরতো কম। এখন রাঝনৈতিক দলের মাস্তান গুন্ডারা অনেক বেশি চালাকচতুর হয়ে গেছে। বিবেচক এবং দূরদর্শী হয়ে গেছে। এখন আর তারা মারামারির মতো তুচ্ছ জিনিস করে সময়ের অপচয় এবং মানসিক উৎকণ্ঠায় থাকা পছন্দ করে না। প্রতিপক্ষ দলের কাউকে যদি মারধোর দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, সে যে কোনো একদিন প্রতিশোধ স্পৃহায় আমার উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়বে না, সে গ্যারান্টি কে দেবে? সেদিন যে সে আমাকে মেরে ফেলবে না, সেটা কেমন করে বিশ্বাস করি?
সে সব যদি বা না করে থানাতে তো যাবে। যদি পুলিশ অফিসার আমাদের দলের কথা না শোনে, যদি কেস লেখে, যদি আমাকে এ্যারেস্ট করে? তখন মহা হ্যাপা। উকিল ধরো জামিন করো, তারিখে তারিখে কোর্টে যাও। গাদাগুচ্ছের টাকা ধ্বংস।
তাই তারা এখন কোনো এক অসতর্কমুহূর্তে প্রতিপক্ষ দলের নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর ওতপাতা শিকারি চিতার মতো অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে টুক করে গলার নালিটা কেটে দুক করে দেয়। তা না হলে খুব মেপে-নির্ভুল নিশানায় বুকে বিধিয়ে দেয় এক ঝাঁক বুলেট। যদি তেমন সময় সুযোগ থাকে মাটিতে একটা গর্ত করে, নীচে দু’বস্তা নুন, তার উপর লাশ, ফের দু’বস্তা নুন দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। এতে মারামারির চেয়ে সময় যেমন কম ব্যয় হয়, হত্যাকারীদের ভবিষ্যও বেশ নিরাপদ-নির্ঞ্ঝাট থাকে। মরা মানুষ আর যাই করুক বদলা নিতে পারে না, কোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্যও দিতে পারে না। প্রতি আক্রমণের ভয় না থাকায় শনাক্তকরণের উপায় না রাখায় হাতের রক্ত দাগ ধুয়ে, সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে, হনন বিলাসি রাজনেতা নিশ্চিন্ত মনে নিজের কাজ করে যেতে পারে। নির্ভয়ে বাড়ি ফিরে প্রিয় শয্যায় শুয়ে পড়তে পারে সঙ্গীনীকে নিয়ে।
বঙ্গভূমির বক্ষ-হৃদয় এই কলিকাতা মহানগর। এখানকার মানুষের বদলে যাওয়া মানসিকতার সাথে সাযুজ্য রেখে তারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঘটে গেছে সামুহিক পরিবর্তন। রাস্তাঘাট বেশ চওড়া আর দৃষ্টিনন্দন হয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে অজস্র ঝাঁ-চকচকে শপিং মল। সুপারমার্কেট, বিউটি পার্লার, ডিনার পাব, ম্যাসাজ বাথ, নাইট ক্লাব, মদিরালয় আরও কত কী। এখন শহরের এক রাস্তাকে আর এক রাস্তার সাথে জুড়ে বিশাল বিশাল উড়ালপুল। পুলের উপর দেশি বিদেশি দামি দামি গাড়ির মিছিল। মাত্র দশ পনেরো বছরে এই শহরটার এত পরিবর্তন হয়ে যাবে এ আমার কল্পনায় ছিল না। যে ছেলেটাকে দেখে গিয়েছিলাম একটা ছেঁড়া জামা গায়ে বসে থাকে সে নাকি এখন কয়েক কোটির মালিক। তার এত উন্নতি হয়েছে স্রেফ পার্টি করে। যেখানে যে বাড়ি তৈরি হবে ইট বালি সিমেন্ট সব কিনতে হবে তার বলা দামে তারই কাছ থেকে। জমি বাড়ি যা কেনাবেচা হোক একটা ভাগ তার নামে বরাদ্দ।
