পশ্চিমবঙ্গের বক্ষস্থল কলকাতা মহানগর। শিক্ষা সভ্যতা সংস্কৃতির পীঠস্থান। বাঙালির বড় গর্ব কলকাতার জন্য। এখানে বড় বড় হোটেল-রেস্টুরেন্ট-বার। যেখানে এক কাপ চায়ের দাম নাকি দুশো টাকা। এক রাতের খাবারে উড়ে যায় দু-পাঁচ হাজার। গাড়ির মিছিল দেখলে বোঝা যায় এখানে দেদার লোকের আনাগোনা। রাত যত বাড়ে তাদের সংখ্যা বাড়ে। মদ মেয়ে জুয়ায় লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন চলে।
আবার সেই হোটেলের উল্টো দিকের ফুটপাতে এক ভিখারি স্রেফ একখানা শুকনো রুটির জন্য সারারাত কেঁদেঝাঁকিয়ে ভোরবেলায় মরে যায়। ভোগবাদী স্বার্থপর সমাজ তার দিকে ফিরেও তাকায় না।
এখানে বড় বড় হাসপাতাল, চিকিৎসালয়, নার্সিংহোম, কত দামি দামি যন্ত্র, কত নামি দামি ডাক্তার। তাদের সেবা পরায়ণতা বিষয়ে কত বিজ্ঞাপন।সেই হাসপাতালের সামনে শুয়ে অবহেলায় অবলীলায় প্রাণ হারায় দুর্ঘটনাগ্রস্ত পথচারী, দরিদ্র গ্রামের চাষি, কোনো দুঃস্থ কারখানার মজুর। সামান্যতম দয়া দরদ মানবিকতার দরজা খোলে না হৃদয়হীন যান্ত্রিক মানুষ।
এই কলকাতা–যেখানে গ্রাম থেকে নিয়ে এসে কোনো অভাবি মা বাপের কিশোর পুত্র, কিশোরী কন্যাটিকে কোনো উচ্চশিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারে চাকর ঝিয়ের কাজে লাগিয়ে দিয়ে যাবার কিছুদিন পরে আবার সেই মা বাপকে বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসতে হয় কলকাতায়। এসে দেখে তার পুত্রকে কাজের বাড়ির লোক কাজ করতে না পারায় গায়ে গরম জল ঢেলে দিয়েছে বা ছ্যাকা দিয়েছে গরম খুন্তি দিয়ে। থালা ছুঁড়ে মাথাও ফাটিয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
আর নাবালিকা কন্যাটিকে কেন কে জানে মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছে পাখার হুকে। গায়ে আগুন ধরিয়েও দিতে পারে। পারে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিতে। যদি পোস্টমর্টেমে প্রমাণ হয়, এই সব করার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল, প্রমাণ হবে না, সে কাজটি এই বাড়ির কারও দ্বারা কৃত। ছিঃ তারা কী আর তা পারে! সভ্য শিক্ষিত ভদ্রলোক বলে কথা। তারা শিক্ষক, অধ্যাপক, অফিসার, ডাক্তার কত কী। তারা অনেক কিছু পারে–শুধু ধর্ষণ পারে না। তাই পুলিশ তিনশো ছিয়াত্তর ধারায় কেস লেখে না। যা লেখে তাতে সাজা হয় না।
এই পশ্চিম বাংলা, যেখানকার বাঙালিদের আত্মহনন বিলাসী বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত নিজেরা তাদের নিজেদের মত মানুষকে মেরে ফেলেছে, অনেক কটা ছেচল্লিশ দাঙ্গার যোগফল অতোটা হবে কিনা সন্দেহ। আর এত খুন এত রক্তপাত ঘটানো হয়েছে মাত্র কয়েকজন রাজনেতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। ক্ষমতার শীর্ষে আরোহনের অসৎ অভিপ্রায়ে।
এই বাঙালি, যে তার নেতার নির্দেশে ভিয়েতনামে বন্যা হলে পিতৃবিয়োগ বেদনার মতো শোকাতুর হয়, কেঁদে বুক ভাসায়, চিনে রোদ উঠলে উদ্দাম নাচ শুরু করে উন্মাদের মতো, সেই বাঙালি ১৯৭৮ সালে বোবা বধির অন্ধ আর মেরুদণ্ডহীন প্রাণি হ য়েছিল সেই নেতারই নির্দেশে।
সুদূর দণ্ডকারণ্য থেকে প্রায় একলক্ষ কুড়ি হাজার ছিন্নমূল বাঙালি পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে সুন্দরবনের এক দ্বীপ মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নিয়েছিল। আর তাদের চারদিক চল্লিশখানা লঞ্চ দিয়ে ঘিরে দুর্বল অসহায় বন্য পশুর মতো নির্বিকারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কতো মানুষকে মারা হয়েছিল সেদিন? কেউ বলে দু’হাজার কেউ বলে চার হাজার কেউ আরও বেশি। দলিত লেখক রণজিৎ শিকদার হত বলেছেন–কুড়ি হাজার।
সেদিন এই বঙ্গের কোনো বুদ্ধিজীবী, কোন নেতা মন্ত্রী, কোন জনদরদী মানবাধিকার সংগঠন, হত্যাকারী শাসকদের বিরুদ্ধে একটা আঙুল পর্যন্ত তোলেনি। বলেনি এই হত্যালীলা বন্ধ করো। আর পশ্চিমবঙ্গের জনগণ, রাজনীতি সচেতন জনগণ, এক নয়া পয়সা ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধি হলে সেই শোকে উথলে ওঠা জনগণ, সেদিন যেন লেজ গুটানো প্রভুভক্ত হয়ে ঢুকে গিয়েছিল যে যার গর্তে।
যে পিতা পুত্রের মৃতদেহ শনাক্ত করতে ভয় পায়, কবি তাকে ঘৃণা করেন, বলেছেন। যে জনগণ এমন খুনি শাসকদের দুধকলা দিয়ে পোষে, তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না–আমি ঘৃণা করি, দুরে থাকতে চাই তাদের কাছ থেকে। কিন্তু কেনারাম নাছোড়, তারই চাপে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক বছর পরে আবার আমাকে আসতে হল পশ্চিমবঙ্গে।
কে যেন একজন বিখ্যাত নাট্যকার বলে গেছেন–জীবনটা হচ্ছে একটা নাটক আর এই পৃথিবীটা একটা রঙ্গমঞ্চ প্রতিটা মানুষ সেই নাটকের এক একটা চরিত্র। সবাই স্রেফ অভিনয় করে চলেছে। তার নিজের কিছু করার নেই। অদৃশ্যে বসে নাট্য পরিচালক যেভাবে তাকে পরিচালনা করবে, তার দেওয়া সংলাপতারই নির্দেশমতো মঞ্চে ফুটিয়ে তুলতে হবে। ব্যাস, এই তার ভূমিকা।
আমি এখনও ঠিক জানিনা সেই অদৃশ্য নাট্যকার আমার জন্য ঠিক কোন ভূমিকা নির্ধারিত করে রেখেছেন। বিগত জীবনটার দিকে চোখ ফেরালে নিজেকেঅকুল দরিয়ায় ভেসে চলা শেকড়হীন পানার মতো মনে হয়। যে শুধু ভেসেই চলেছে। কোথায় গিয়ে থামবে কিছুই জানে না।
তবে জীবন যখন একটা নাটক তখন সব নাটকের মতো এর একটা শেষ দৃশ্য অবশ্যই আছে। না থেকে পারে না। আর সেই দৃশ্যটাই সমগ্র নাটকের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ। সমগ্রের মূল্যমান নির্ধারক।
আমি জানি না আমার জীবনদেবতা নাটকের শেষ দৃশ্যে আমার জন্য কী চমকপ্রদ সংলাপ-সমাপ্তি রেখেছেন যে অভিনয়টুকু শেষ হওয়া মাত্র হলঘর ফেটে পড়বে করতালিতে। নাকি উড়ে আসবে একখানা ছেঁড়া হাওয়াই চটি। এখন আমার কাজ শুধু ভেসে থাকা আর অপেক্ষা করে যাওয়া।
