দুজন অজানা অচেনা বিদেশী মানুষ আজকের পরে আর যাদের সাথে কোনদিন দেখা হবার নয়, তাদের এমন আদর আপ্যায়ন করে নিয়ে গিয়ে অন্নদান করার আকুলতা, এর উৎসভূমির অনুসন্ধান আমি করে উঠতে পারিনি আজও। শুধু নীরবে মাথা নত করেছি এমন মানুষের পায়ের ধুলোয়।
.
আমার জীবনটা যেন হাল ভাঙা পাল ছেঁড়া কান্ডারি বিহীন একটা নৌকার মত। ছোট ঢেউ বড় ঢেউ মেজ ঢেউ সেজ ঢেউ–এক একটা ঢেউ এসে লাগছে আর নৌকা কুলহীন অতল অজানার দিকে ভেসেই যাচ্ছে। কেন যে যাচ্ছে কি করে থামবে–কোনদিকে গেলে যে কুল পাবে সে তা জানে না।
সেই যে বালক বেলায় এক অজানা উদ্দেশ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম–হাজার মাইল পথ হেঁটে এসেও আজও তার সমাপ্তি হলো না। ক্রমাগত চলতে হচ্ছে। আমি শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে থামতে চাইলে–কে যেন পেছন থেকে ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়। কে সে? সেকি আমার অদেখা অজানা-নিষ্ঠুর ভবিতব্য!
কিন্তু আমি যে আর পারছি না। ভীষন ক্লান্ত আমি। দেহ মন যে বিশ্রাম চাইছে। চাইছে পায়ের নিচে একটা স্থির ভূমি। যেখানে নিশ্চিন্তে দুদন্ড বসা যায়। পাশে পাওয়া যায় কোন প্রিয়জন। পরম নির্ভরতায় যার কাঁধে মাথাটা রাখা যায়। একটু হাসা যায়, একটু কাঁদা যায়।
তেমন এক জীবনের তপস্যায় উন্মাদপ্রায়, প্রচলিত অপ্রচলিত কত পথ হাঁটলাম, হাঁটতে হাঁটতে এসে গিয়েছিলাম এই সবুজ অন্ধকারে। সেই যে কবিগুরু বলেছেন ‘দাও ফিরে সে অরন্য লহ এ নগর’। অমি সেই অরন্যে একটি বৃক্ষ হতে চেয়েছিলাম। বনস্পতি নয়–গৃহস্থের উঠোনের এক ধারে একটা ছোট তুলসি চারা। মাটিতে শেকর বসাবার আগেই এক ঝড়ে ছিন্নভিন্ন ভুলুষ্ঠিত হয়ে গেছে সব সম্ভাবনা। আবার শুরু হয়ে গেছে ঘুরে বেড়ানো উড়ে বেড়ানো ভেসে বেড়ানো, শেকড়হীন জীবন। অপ্রতিরোধ্য ভবিতব্য আবার প্রবল ধাক্কা দিচ্ছে। তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে স্থান থেকে স্থানান্তরে। সে বলছে এই জীবন তোর জীবন নয়। আমি ক্লান্ত কাতর স্বরে জানাতে চাইছি–তাহলে কোন জীবন আমার জীবন। সে বলছে এগিয়ে চল–সামনে আছে।
আমার ভবিতব্য আমাকে বাধ্য করেছে সামনে আগাতে। তুচ্ছ মানুষের কি ক্ষমতা তাকে উপেক্ষা করা! তাই আবার পা রাখলাম পথে। পিছনে পরে রইল আমার স্বজন-স্ত্রী-সন্তান-আর আমার আট বছরের তপঃভূমি দন্ডকারন্য।
আবার যাবো সেই হিংস্র নরখাদক সদৃশ্য মানুষের বাস ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল–কলকাতা মহানগর। সেই মহানগর যেন আমাকে ডাকছে–আয়। যেখানে শুরু করেছিলি সেখানে এসে শেষ কর। এইখানে না এলে চন্ডালজীবনের ইতিবৃত্ত অসম্পূর্ন রয়ে যাবে।
.
অনেক বছর আগে–তা সে প্রায় আট দশ বছর নিশ্চয় হবে, অনেক দুঃখ কষ্ট অনেক অপমান অত্যাচারের শরীরময় দাগ আর বুক বোঝাই বিষজ্বালা নিয়ে চলে গিয়েছিলাম বঙ্গভূমি ছেড়ে। আবার যে একদিন বিদেশবিভূঁই থেকে এখানে ফিরে আসব তেমন কোনো আশা বা ইচ্ছা কোনোটাই অবশিষ্ট ছিল না। জানতাম সেখানেই আমার শেষ নিঃশ্বাস পড়বে–বাংলা আর বাঙালিদের প্রতি তীব্র অভিমানে। যে ব্যবহার তাদের কাছ থেকে পেয়েছি তাতে বাংলা আমার প্রিয় স্বদেশ, বাংলা আমার প্রাণের ভাষা, বাঙালি আমার স্বজন এই ভাবনায় আর অবগাহন করতে মনের কোনো সায় পাই না। এর চেয়ে গোণ্ড মুরিয়া হলবা কয়া এইসব আদিম উপজাতির দেশ দণ্ডকারণ্য আমার কাছে বহুগুণে শ্রেয়।
তবু একদিন পশ্চিমবঙ্গে আসতে হল। যেন আমার ভাগ্য আমাকে পেছন থেকে তাড়া দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এল ঠিক সেই স্থানে–যেখান থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম বহুদূর পাথর, পাহাড়, মোরাম মাটির দেশ ছত্তিশগড়ের বস্তার জেলার পারালকোট নামক স্থানে। এই স্থানটির আর একটা নাম দণ্ডকারণ্য।
আমাকে যে ভাগ্য প্রবল চাপ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসতে বাধ্য করল তার নাম–কেনারাম। বছর পঁচিশের এই বাংলাভাষী ছেলেটির জন্ম দণ্ডকারণ্যের ঘন গভীর জঙ্গল গ্রামের এক রিফিউজি পরিবারে। সেই যখন ১৯৫৮ সালে কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন প্রকল্পের অন্তর্গত দণ্ডকারণ্যে রিফিউজি প্রেরণ শুরু হয় ওর বাবা এখানে আসেন এবং পারালকোটের ১নম্বর ‘ভিলেজে’পুনর্বসতি পান। এখানেই কেনারামের জন্ম হয়। সে কোনোদিন বাংলাদেশটা কেমন চোখেই দেখেনি। শুধু সেই দেশের মন কেমন করা হাজার গল্প শুনেছে। আর দেখেছে শুধু বাবা-কাকা পাড়া প্রতিবেশী বৃদ্ধদের সোনার বাংলার জন্য দিনরাত–হুঁতাশ, দীর্ঘশ্বাস, চোখের জল। তাই তার বুক মোচড়ায় সেই দেশটা একবার স্বচক্ষে দেখে নেবার গভীর আকুলতায়। যেদিন থেকে সে জেনেছে আমি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে অনেক বছর ছিলাম দর্শনীয় স্থানসমূহ সব চিনি, অস্থির করে তুলল আমাকে–দাদা একবার আমাকে নিয়ে চলো। দিনসাতেক থেকে ফিরে আসব। সব খরচা আমার।
চাঁদটাকে দূর থেকে খুব সুন্দর দেখায়। যারা তার কাছাকাছি গেছে দেখে এসেছে সেখানে অসংখ্য খানাখন্দ, পাহাড় আর অক্সিজেনহীনতা। পাহাড়টাকেও দূর থেকে মনোরম মনে হয়। সেখানে গেলে দেখা যায় ঝোঁপঝাড় জঙ্গল। জঙ্গলে সাপ বিছে চিতা হায়না।
কেনারাম বয়সে তরুণ। সে বয়সে যুক্তি থাকে অনেক কম আর আবেগ থাকে অত্যাধিক।ও জানেনা শোনা কথা সর্বাংশে সত্য হয় না। শোনা কথায় বিশ্বাস করতে নেই। আমি ওই দেশটাকে দেখেছি বহু বছর। চিনেছি ওখানকার মানুষজনকে হাড়ে মাংসে মজ্জায়। এমন দয়ামায়া শুন্য মানুষ এত বিশাল সংখ্যায় আর কোথায় আছে আমার জানা নেই।
