আমি গিয়েছিলাম ওনার কাছে অঞ্চলটিতে পরিভ্রমণের পারমিশান নিতে। ওনার ধারণা হল গেছি অনাথদের জন্য সাহায্য চাইতে। খবরের কাগজ ভাজ করে রেখে উনি উঠে জামার পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট এনে আমার হাতে দিয়ে দুঃখ করলেন, মাসের শেষ, এর বেশি দেওয়া যাবে না। তারপর হাঁক দিলেন সহকর্মীদের–সব লোগ ইধার আও। দেখো, এ আদমি হাম। সবকে পাশ আয়া হ্যায়। কোন ক্যা মদত কর সকতে হো।–করো!
পুলিশ সম্বন্ধে আমার ধারণা এরা ঘুষখোর অভদ্র অত্যাচারী নির্দয়। কিন্তু জানা ছিল না যে এদের মধ্যে এমন তিরিশজনও আছে যারা শুধু নিতে জানে না, ভালো কাজের জন্য দিতেও জানে। প্রত্যেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একের পর এক নাম লিখিয়ে, বিল নিয়ে, দশ টাকা করে তুলে দিল আমার হাতে, লাখনপুরীতে বাস করা অনাথ বাচ্চাদের জন্য। যখন আমি সব কাজ সেরে ফাঁড়ি থেকে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে চলেছি, দেখি একজন পুলিশ–হেই রোকো হেই রোকো করতে করতে ছুটে আসছে। আমি থামতে সে এসে আমাকে দিল এক তীব্র ভৎর্সনা, সবার কাছ থেকে চাঁদা নিয়েছি আর তাকে কিনা বাদ দিয়ে চলে যাচ্ছি। চাঁদা নিতে গিয়ে ভর্ৎসনা খেতে হয় তা জানতাম, জানতাম না যে না নিলেও তা খেতে হতে পারে।
দিন পনেরোর মধ্যে আমি বেশ পরিণত হয়ে গেলাম। কালীপুজো দুর্গাপুজো এবং রাজনৈতিক দল কারও জন্য কোনদিন চাঁদা তুলিনি। আমি যে এত ভালো চাঁদা তুলতে পারি আগে জানতাম না। বক্তৃতা দেবার অভ্যেস ছিল, কথার সাথে কথা জুড়ে কি ভাবে নিজের বক্তব্য জোরালো করে তুলে চাঁদার বিলে একটা মোটা অংক বসিয়ে নিতে হয় সেটা শিখে গেছি। দিনে এখন তিন চারশো টাকা অনায়াসে তুলে ফেলি। ভিড়ভাড় আর বড় শহরের মানুষ একটু যান্ত্রিক, আবেগ শুন্য ও সংবেদনশীলতাহীন হয় তাই আমার পছন্দ ছোট শহর নগর আর ফাঁকা ফাঁকা অঞ্চল। একবার এক পারাল কোটের বাঙালী গ্রামে চাঁদা চাইতে গিয়ে চাঁদা না নিয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরতে হল আমাকে। কারণ আর কিছুই নয়-এদের কাছে নগদ টাকা নেই। নিতে হলে চাল নিতে হবে। কিন্তু আমার কাছে বস্তা নেই। বস্তা বইবার লোকও নেই।
আমার বাবা মাঝে মাঝে বলতেন–নিজের খাবার ঠিক নেই কেডি (কুকুর) পালে বরগা। অর্থাৎ যে লোকটা নিজেই খেতে পায়না সে আধা ভাগে কুকুর পুষতে নিয়েছে। আমি এখন তাই করি। কেনারাম নামে একটি ছেলেকে আমার সঙ্গে রাখি।
পারালকোটে একশো তেত্রিশটি গ্রাম, উমরকোটে পয়ষট্টি আর মালকানগিরিতে দুশোর কিছু বেশি। একদিনে এক গ্রামের বেশি ঘোরা যায় না। তাহলে সব কটি গ্রাম ঘুরতে বছর শেষ হয়ে যাবে। আর বছরে একবার তো সব বাড়িতে যাওয়াই যায়। যারা নাগপুর থেকে এখানে আসে, এসেই বলে–বছরে একবারই আসি। ওদেরও নিশ্চয় তিনশো পঁয়ষট্টিটা শহর নগর গ্রাম এলাকা ধরা আছে। বাংলা আমার প্রাণের ভাষা বাঙালী আমার আপনজন। দণ্ডকারণ্যের বাঙালীদের গ্রামগুলো আমার অধিকারে নিতে হবে। বছরে একবার যেতে হবে সব দরজায়। যদি প্রতি ঘর থেকে বেশি না এক কিলো চালও দেয়। তো বস্তা ভরে যাবে আমার।
কেনারাম বলল–পারাল কোট এখন থাক। সবাই এখানে চেনে তাই একটু লজ্জা লজ্জা করে। আগে চলো উমর কোট তারপর মালকানগিরি। ও দিকে যদি আমাদের চলে যায় তাহলে এদিকে আর যাই না। তাই একদিন কেনারামের সাথে গেলাম উমরকোট। সরাসরি বাসে নয়, কোল্ডাগাও থেকে পথে চাদা তুলতে তুলতে।
উমরকোট! উড়িষ্যার এক রুক্ষ ঊষর ভূমির নাম। পূর্ববঙ্গের একদল মানুষকে সেই কবে যেন মায়ের কোল থেকে তুলে এনে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এই অহল্যা মাটিতে। সেই মাটিকে মানুষ তার কঠিন শ্রমে আজ বাসযোগ্য করে নিয়েছে। মৃত্যুকে পরাস্ত করে বেঁচে আছে। তারা। কঠোর জীবনযাত্রা, অগ্নিবর্ষি রোদের তাপ তাদের শরীর ঝলসে দিলেও মনটা কিন্তু রেখে দিয়েছে এখনও সেই আগেরই মত নরম কোমল। এখনও তারা তাদের কৃষ্টি সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে ঝিনুকের বুকের মুক্তোর মত। সেই কবে কে যেন তাদের বলেছিল–ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও তৃষ্ণার্তকে জল দাও আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দাও, সে তারা আজও ভোলেনি। কে যেন তাদের বলেছিল-অতিথি নারায়ণ। বলেছিল নারায়ণ নররূপ ধরে মাঝে মাঝে মানুষের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, তাকে পরীক্ষা করার জন্য। তাই নর মাত্রেই নারায়ণ জ্ঞানে সেবা করো।
বড় আশ্চর্য এই গরিব বাঙালী গ্রামগুলো। যে বাড়িতে গিয়ে দাঁড়াই “ভিক্ষা দেয় পরে আগে চাটাই পেতে বসায় জল বাতাসা দেয়, কুশল জিজ্ঞাসা করে। দুপুর হলে তো কথা নেই, তেলের শিশি আর গামছা এগিয়ে দেয়–চান করে দুটো ডালভাত সেবা করুন। বাকি কথা পরে। রাত হলে যে বাড়ি গিয়ে বলি—খেতে দিতে হবে না, রাতটা একটু থাকতে দেবেন? জবাব আসে, না খেলে আমার বাড়িতে থাকার জায়গা হবে না। এত অভাব এত দুঃখ কষ্টের মধ্যেও মানুষের মনের প্রসারতা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারি না। নিম্নবর্ণের মানুষের এমন উচ্চ মনোবৃত্তি উচ্চদের মধ্যে নেই। আমি ধর্ম মানি না, কিন্তু যে ধর্ম মানুষকে এমন মহান বানিয়ে দেয়–উদার বানিয়ে দেয় তাকে প্রণাম। যে ধর্ম মানুষকে বলে যত্র জীব তত্র শিব তাকে প্রণাম।
একদিন বাস থেকে নেমে আমরা এক গ্রামের দিকে হাঁটা দিয়েছি। তার আগে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়েছি একজনের কাছ থেকে সেই গ্রামে যাবার পথটা। যখন আমরা মাইল দুয়েক গেছি দেখি সেই লোকটি একখানা সাইকেল নিয়ে দাদা দাঁড়ান দাদা দাঁড়ান করে ছুটে আসছে। আমরা থামতেই কাছে এসে বলেন তিনি ওই গ্রামে আপনারা কেন যাবেন? কেন যাব তা বুঝিয়ে বলি তাকে। বলেন তিনি–তা আপনারা তো বাইরের লোক। এখানে দুপুরে খাবেন কোথায়? বলি যে এখনও তো তা জানি না। গিয়ে দেখি। তখন বলেন তিনি–আমি এই গ্রামেই থাকি। যাকে বলবেন মাষ্টারের বাড়ি দেখিয়ে দেবে। দয়া করে আজ আপনারা আমার অতিথি হবেন। আমি বাজার করতে এসেছি। একটু পরেই বাড়ি যচ্ছি। আসবেন কিন্তু আপনারা!আসবেন তো?
