দিন কয়েক পরে একটা বিল ধরিয়ে দিল আমার হাতে রাজিন্দর–এই যে দাদা, এই তোমার কাজ। কাকের কেসকল কোড়াগাও ভানুপ্রতাপপুর বিল নিয়ে যেদিকে মন চায় চলে যাও। দোকানে হাটে বাজারে মানুষের বাড়ি। কথা তো তুমি জানো। তাদের বুঝিয়ে বলল আমরা কি করছি আর কি কি করতে চাই। তারপর চাঁদা চাও। কোন জোর নেই, যে যা দেয়।
রাজিন্দর বেশ অনেকক্ষণ ধরে বোঝালো যে বস্তার জেলার বিত্তবান মানুষ দানটাকে একটা পুণ্যকর্ম বলে মনে করে। বিশেষ করে সিন্ধি আর মাড়োয়ারিরা। কেউ গিয়ে দরজায় দাঁড়ালে খালি হাতে ফেরায় না। যদি আমি সারাদিনে কুড়ি পঁচিশটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই যদি দশ টাকা করেও দেয় দু তিনশো কোথাও যাবার নয়। যারা এই ভাবে ঘুরে ঘুরে চাঁদা তোলে নারায়ন সেবাশ্রম তাদের শতকড়া চল্লিশ টাকা কমিশন দেয়। শুভ চিন্তকও আমাকে তাই দেবে। সে এও বলে-অনাথ বাচ্চাদের সেবা করার মতো মহৎ কাজ আর কিছু হয় না।
জীবনে আমি অনেক রকম কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু ভিক্ষে কখনও করিনি। কে জানত ভাগ্য আমাকে একদিন সেই কাজও করার জন্য মনোনীত করবে। চাঁদা চাওয়া এ তো এক ধরনের ভিক্ষাই। তা-ও আবার কমিশনে। হে জীবন, তুমি আমাকে আর কোথায় নামাবে। নামতে নামতে সপ্ত পাতালের শেষ তলে রসাতলে যে পা ঠেকে গেল। বাড়িতে অনু আমার পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আমি কাজ করে “মাইনে” নিয়ে বাড়ি যাব টাকা পেলে ওরা দুবেলা ভাত খেতে পারবে। এখন আমি কী করব? বাড়ি ফিরে গিয়ে বলব, কাজটা পছন্দের ছিল না?
জয়হোক জীবন তোমার। তুমি ধন্য। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো যিনি তোমাকে এই জীবন দিয়েছে। বলো তো এক জীবনের মধ্যে কত রকম জীবনের স্বাদ। এমন জীবন আর কার আছে। এত বড় প্রাপ্তি বড় ভাগ্যে মেলে। ছাগল চড়ানো থেকে জীবন শুরু করে হাজার মাইল পথ হেঁটে এখন তুমি এসে পৌঁছেছে তোমার যোগ্য জায়গায়–ভিক্ষায়।
তবে আর কী! চালাও পানসি। স্রোতে ভাসা মরা মানুষের মত ভেসে চলো, যতক্ষণ পচে গলে জল হয়ে না যাও। কেড়ে নেবার ক্ষমতা যখন অর্জন করতে পারোনি, বর্জন করো আত্মসম্মানবোধ। হাত পেতে দাঁড়াও মানুষের দরজায়। বলো–বাবুগো কিছু দিন, বাড়িতে বউ বাচ্চা অনাহারে। আপনি কিছু দিলে তবেই আমি কিছু পাবো।
বের হয়ে পড়লাম বস্তার পরিক্রমায়। আমার কাছে বিল বই আছে। আর আছে শুভচিন্তক সংস্থার কাগজ পত্রের জেরক্স। বহু বিশিষ্ট মানুষ দ্বারা প্রদত্ত প্রমাণপত্র–যে আমি ব্যক্তিগত নয়, একটি সমাজসেবী সংস্থা দ্বারা মনোনীত দান সংগ্রহকারী। কোন নকলি মাল নই। এই কাজ করতে গিয়ে মানব মন সম্বন্ধে আমার এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল। মোটামুটি আমার যা হিসেব তাতে প্রতি একশোজনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালে শতকরা পাঁচজন মুখে যা আসবে তা বলে অপমান করবে। পয়সা দেবে না, বাক্য দিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে।কীসের অনাথ সেবা শুনি। সব ধান্দাবাজি। বাচ্চাদের নাম করে নিজেদের পেট ভরাবার চালাকি। এর চেয়েও খারাপ খারাপ কথা বলে বিদেয় দেবে। উল্টো দিকে পাঁচজন বেশ ভালো রকম দান দেবে। যা কখনও একশো টাকার কম হবে না। আপনারাই সত্যিকারের সেবা কাজ করছেন। আসবেন মাঝে মাঝে। যতটুকু যা পারি নিশ্চয় দেব। এই সব ভালো কথাও বলবে। পঁচিশ থেকে তিরিশজন দান দেবে পাঁচ টাকা থেকে পঁচিশ টাকার মধ্যে। কেউ খুশি মনে কেউ বিরক্ত হয়ে। কেউ কেউ চাঁদা দেবার আগে বিলটা চেয়ে নিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাতা উল্টে দেখবে আশেপাশের কে কত উঁদা দিয়েছে। তিনি দেবেন তার চাইতে কমপক্ষে পাঁচ টাকা বেশি। কেউ আছে যিনি চাদা দেবেন কিন্তু বিল নেবেন না–বিল চাই না কারণ যে পরিমাণ চাঁদা তিনি দিয়েছেন তা তার কাছে এত তুচ্ছ যে বিলে লিখলে যদি কেউ দেখে নেয় সেটা তার পদ এবং প্রতিষ্ঠার পক্ষে সম্মানজনক হবে না। এটাই তার ধারণা। কেউ চাঁদা দেবার আগে সমস্ত প্রমাণপত্র খুটিয়ে পরীক্ষা করে দেখবেন। দানটা যথার্থই অনাথ সেবায় যাচ্ছে কিনা। আর পঁচিশ থেকে তিরিশজন যত ককাই যত বোঝাই পাঁচের উপর কিছুতে উঠবেন না। তবে খালি হাতেও ফেরাবেন না। এক দুই–কিছু দেবেন। আর বাকি যারা তারা কপালে হাত ঠেকাবে–মাফ করো।
এইভাবে চাদা তুলতে একবার গেছি কেসকল ঘাটিতে। কেসকল ঘাটি দুর্গম বন আর পাহাড় ঘেরা একটা অঞ্চল। এখানে যে কারণে নকশালদের একটা দলম বহুদিন ধরে বেশ নিরাপদে ঘাটি গেড়ে আছে। আর তাদের সাথে মোকাবিলার জন্য এখানে এনে রাখা হয়েছে কিছু আধা সামরিক বাহিনীর জোয়ান।
বস্তার জেলায়–যারা ঘুমক্কর অর্থাৎ ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, যেমন আমি, এদের প্রতি প্রশাসনের নির্দেশ আছে, আগে তাকে নিকটস্থ পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে সুচনা দিতে হবে। জানাতে হবে তার সম্পূর্ণ গতিবিধি। কেন সে এখানে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে রাতে থাকবে কিনা, থাকলে কোথায় থাকবে। যে এই নির্দেশ পালন করবে না পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবে। আইন রক্ষা করতে আমি পৌঁছেছি ওখানকার পুলিশ ফাড়িতে। তখন বেলা মনে হয় বারোটা হবে। পুলিশদের কেউ চান করছে কেউ ঘুরছে কেউ ঘুমোচ্ছে। আর যিনি এই বাহিনীর কমাণ্ডার-চান করে চুল আঁচড়ে এক তাবুতে বসে সদ্য হাতে আসা খবরের কাগজে পড়ছেন। গিয়ে দাঁড়াই তার সামনে এবং এখানে আসার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করি।
