পুলিশ প্রশাসন তখন একটা অন্য ধরনের পদ্ধতি নিয়েছিল। তারা মিটিংয়ে জমা হওয়া একদল লোককে ধরে ট্রাকে তুলে নিত। তারপর সে ট্রাক চালিয়ে কুড়ি পঁচিশ মাইল দূরে কোন জনহীন মাঠে নিয়ে গিয়ে জোর করে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিয়ে খালি ট্রাক নিয়ে ফিরে চলে যেত। তখন আন্দোলনকারীদের সেই পথ ফিরে আসতে হতো পায়ে হেঁটে। পথশ্রমে ক্ষুধাতৃষ্ণায় তারা। বড় কাহিল হয়ে পড়ত।
প্রশাসনের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত উচ্চবর্ণের অফিসারগণ বড় ধূর্ত। তারা তাদের বর্ণবুদ্ধি দিয়ে বুঝে গিয়েছিল এদের ধরে জেলখানায় নিয়ে যাওয়ায় অসুবিধা আছে। সব না খাওয়া মানুষ, যদি এরা জেনে যায় জেলখানায় গরম ভাত তরকারি পাওয়া যায় তাহলে মিটিং মিছিল করার উৎসাহ বেড়ে যাবে। তাই ওই ব্যবস্থা। খালি পেটে এবার হেঁটে দ্যাখ কেমন লাগে। সেইদীর্ঘপথ পার হয়ে কতজন ফিরে আসতে পারত আর অক্ষম অশক্ত শরীর নিয়ে কতজন পথে পড়ে মরত তার হিসাব কে জানে!
বোমা গোলা বন্দুক কামান নয়, যে কোন যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র পেটের রসদ। যে কারণে ইংরেজ শাসকরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাজার ঝেটিয়ে সব খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে ফেলেছিল। আকাল এসেছিল সারা বাংলায়। যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর খাদ্য আপূর্তিতে কোন ঘাটতি রাখা চলে না। কারণ না খাওয়া মানুষ লড়াই করতে পারে না। লড়াই জিততে পারে না।
আন্দোলন–সেও তো একটা যুদ্ধ। রিফিউজিদের সামনে এখন সেই যুদ্ধ। প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এক মানসিক, সাহসিক সর্বাত্মক সংগ্রাম। কিন্তু যার পেটে ভাত নেই, চোখের সামনে ছোট ছোট বাচ্চারা খিদের জ্বালায় ছটফট করছে, সেই সৈনিক রণক্ষেত্রে অটল থাকবে কী করে? এর চেয়ে কোথায় শাপলা শালুক কঁচুঘেঁচু মেলে সেই সন্ধানে ছুটবে না? তাই হতে লাগল। যারা পুলিশি অত্যাচার উপেক্ষা করে তখন পর্যন্ত মিছিলে যাচ্ছিল, এবার মিছিল ফেলে মাঠে জঙ্গলে ছুটতে শুরু করে দিল।
এরপর যা হয়, ক্যাম্পের লোক সংখ্যা অর্ধেক কমে গেল। এরা সরকারের দরজায় দয়া পাবার আশায় মাথা খোঁড়া বৃথা বুঝে কেউ চলে গেল শহর কলকাতার আশেপাশে কোন রেল লাইনের ধারে, কেউ কোন খালপাড়ে, কেউ ফুটপাতে, কেউ রেল স্টেশনে, কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে বিষ্ণুপুর গিয়ে পুনর্বাসন দপ্তরে নাম লিখিয়ে পাড়ি দিল সেই নরখাদকদের দেশ দণ্ডকারণ্যে। মরি তো মরব। মরার বেশি আর কীবা হবে, এই ছিল শেষদলের মনের ভাবনা।
যারা তখনও ক্যাম্পে ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ জনমজুর খাটতে, বিড়ি বাঁধতে, রিকশা চালাতে এবার বিষ্ণুপুর শহরে যেতে আরম্ভ করল। আগে বিনা অনুমতিতে রিফিউজিদের ক্যাম্পের বাইরে যাবার উপায় ছিল না। এখন তো অফিস নেই, অফিসঘর নেই, কে কাকে অনুমতি দেবে। আমার বাবা গেলেন জঙ্গলের শুকনো ঈঠ কেটে জ্বালানি হিসাবে বিষ্ণুপুরের মানুষের কাছে বিক্রি করে আসতে। এক বোঝা কাঠ যার ওজন পঞ্চাশ ষাট কিলো তা বেঁচে বাবা দু আড়াই টাকা পেয়ে যেতেন। এতে আমাদের সংসার মোটামুটি ভাবে চলে যাচ্ছিল। পরে বাবার দেখাদেখি ক্যাম্পের আরও বেশ কিছুনোক কাঠ ব্যবসায় নেমে পড়ল। ফলে জঙ্গলে দেখা দিল শুকনো কাঠের আকাল। কথায় বলে প্রয়োজন কোন নীতি মানে না। তখন ক্যাম্পের শত শত মানুষ প্রয়োজনের তাড়নায় কোপ বসাতে শুরু করে দিল কাঁচা গাছে। এটা ভারত সরকারের বনরক্ষা আইনে ঘোর অপরাধ। যাতে জেল এবং জরিমানা দুটোই হতে পারে। তবে বন বিভাগের কর্মচারীরা রিফিউজিদের অবস্থা জানত। তাই তারা এদের ধরে নিয়ে যাবার চাইতে জঙ্গলে দেখতে পেলেই কুড়ুলখানা কেড়ে নিয়ে চড়চাপড় মেরে তাড়িয়ে দিতে লাগল।
আমার বাবা ছিলেন খুবই ভিতু মানুষ। তিনি এর ফলে ভয় পেয়ে কাঠ কাটতে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। এরপর চেষ্টা করেছিলেন বিষ্ণুপুর শহরে গিয়ে জনমজুরের কাজ করতে। তাতে সফল হলেন না। ছোট্ট শহর বিষ্ণুপুরের সাধ্য ছিল না এত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। এরফলে মাঝে মাঝে আমাদের ঘরের উনুন একটু আধটু যা জ্বলছিল এবার তা পুরোপুরি নিভে গেল। তখন যে কী ভীষণ অভাব অনটন ভরা দিন আমাদের ঘিরে ধরে ছিল, আমার ভাষার সে ক্ষমতা নেই যে কাউকে বলে বোঝাতে পারি।
বিষ্ণুপুর শহর থেকে আটদশ মাইল দূরে একটা ক্যাম্প। যার পূর্বদিকে মাঠ পেরিয়ে মাইল চারেক গেলে একটা মুসলমান গ্রাম। ছোট ছোট মাটির ঘরে সেখানে যে মানুষরা বাস করে, তারা এত গরিব যে যখন আমরা ডোল পেতাম, আমাদের কাছে খাবার চাইতে আসত।
উত্তর দিকে শশ্মান পার হয়ে, মাইল তিনেক গেলে একটা সাওতাল পল্লী এদের অবস্থাও তথৈবচ। খিদের জ্বালায় এরা সাপ ব্যাঙ সব খায়! দাদন নিয়ে কোথায় কোন দূরদেশে কাজে যায়।
আর আমাদের ক্যাম্পের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে তো কোন জনবসতিই নেই, শুধু ঘন জঙ্গল। এই এখানকার পরিবেশ। এখানে আশেপাশে আমাদের এমন কোন সম্পন্ন আত্মপরিজনও নেই যার কাছে বিপন্ন সময়ে গিয়ে সাহায্যের হাত পেতে দাঁড়ান যায়।
পেটে ভাত নেই, অসুখে ওষুধ নেই, হাত আছে, কাজ নেই, কোথাও যে চলে যাবে তেমন কোন জায়গা নেই। তখন যেন আমাদের জীবনকে বৃত্ত করে দাঁড়িয়ে একটা বিরাট বিশাল “নেই”। এমন যে পানীয় জল, যার বিহনে প্রাণ বাঁচে না সেও তখন আর পাবার উপায় নেই। “যখন ক্যাম্প ছিল” তখন ভেঙে গেলে অফিসে গিয়ে জানালে ভাঙা টিউবওয়েল সারাবার জন্য মিস্ত্রি এসে যেত। এখন আর কেউ আসে না। বহুদিন জলের কল খারাপ হয়ে পড়ে আছে। ক্যাম্পের কয়েকজন লোকবি.ডি.ও অফিসে কল মেরামতের আবেদন নিয়ে গিয়েছিল বি.ডি.ও বলে দিয়েছে–ওখানে তো কোন লোক নেই জল কী হবে!
