এখন তাদের ব্যাগপত্র গোছানো হয়ে গেছে। এবার তারা স্থান বদল করবে। বড় বিপদজনক পথের যাত্রী ওরা। একই স্থান অনেকক্ষণের জন্য তাদের কাছে নিরাপদ নয়। বলে তারা আবার দেখা হবে। কিন্তু আমার মন জানতো আর দেখা হবে না।
ওরা চলে যাবার পর ইরিক ভুট্টা থেকে কাপসী ওই দশ কিলোমিটার পথ যেন এক মরণ ম্যারাথন দিয়ে শেষ করেছিলাম আমি। ফরেষ্ট অফিসে পৌঁছে ওদের দেওয়া বার্তাটি রেখেছিলাম জনসন ক্র্যাকয়ের কাছে–সাব, দাদা লোগোকো সাথ মুলাকাত হো গিয়া থা জঙ্গলমে। ও লোগ আপকা ইন্তেজারমে বইঠা থা। বোলকে গিয়া আপ জঙ্গলমে মাৎ জানা। আগার আপ জঙ্গলমে দিখ যায়ে–ওহি আপকা আখেরি দিন হোগা।
আমার কথা শুনে অসম সাহসী লোকটার কপালে দেখা দিয়েছিল বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফরসা মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল উচ্চ রক্ত চাপে। দিন কয়েক সে আর অফিস ছেড়ে কোথাও বের হল না। তারপর একদিন ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল। ছুটির পরে সে তার কর্মস্থল উপর মহলের প্রভাবে বদলে নিল কোণ্ডাগাও ফরেষ্টে। আমার কাজটাও চলে গেল। চৌদ্দ দিনের কাজের কোন পয়সা পাওয়া গেল না।
.
কাঁকের শহর থেকে তিরিশ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি ছোট্ট মফস্বল টাউন আছে যার নাম লাখনপুরী। এখানে রাজিন্দর বলে একজন লোক থাকে। তার শুভ চিন্তক নামে একটি সমাজসেবী সংস্থা আছে। এমনিতে বস্তার জেলায় সমাজসেবী সংস্থা, যার ইংরাজি নাম এন.জি.ও–তার কোন অভাব নেই। যারা দেশ বিদেশের বহু দান অনুদান বস্তার জেলার আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য পেয়ে থাকে। আদিবাসীদের উন্নয়ন হোক বা না হোক যারা এর সঞ্চালক তাদের প্রভুত উন্নয়ন হয়ে থাকে।
শুভ চিন্তক সমাজ সেবী সংস্থাটি উদ্ভব হয়েছিল–ইঁদুর মারো এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। সেই সময় কি এক কারণে কে জানে বস্তার জেলার ইঁদুরের সংখ্যা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কৃষকদের কষ্টের ফসল সব চলে যাচ্ছিল ইঁদুরের উদরে। তাই শুভ চিন্তক নেমে পড়েছিল লাঠিসোটা নিয়ে। এরপর সাক্ষরতা বিস্তারে তারা কিছুদিন জিপে মাইক বেধে ক্যাসেট করা বক্তৃতা হাটে হাটে ঘুরে মানুষকে শোনায়। নাটক করে মানুষকে বোঝায় যে সাক্ষর হওয়াটা কতখানি দরকারি। এরপর পরিবার নিয়োজন, ম্যালেরিয়া নির্মুল, কুষ্ঠরোগ নির্মূল, বৃক্ষরোপণ, মাদক বর্জন, নানাবিধ বিষয়ে তারা নাচগান নাটক বক্তৃতার আয়োজন করে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে।
সম্প্রতি তাদের বাসনা হয়েছে একটি অনাথালয় স্থাপনার। নাগপুরের একটি সংস্থা-নারায়ণ সেবা আশ্রম তাদের প্রেরণার উৎস। ওই সংস্থা সারা বছর ধরে বস্তারের হাটে বাজারে দোকানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অফিসে দলে দলে ঘুরে হাজার হাজার টাকা চাঁদা তুলে নিয়ে চলে যায়। এখানকার টাকা এই ভাবে–জেলার বাইরে, প্রদেশের বাইরে চলে যায়। দানশীল মানুষ, যারা দান করতে চায় অনাথ অসহায় বাচ্চাদের, তারা চাইলেই বা কি করে দান দেবে? বস্তারে যে কোন অনাথালয়ই নেই। তাই রাজিন্দর পণ করেছে একটা অনাথালয় বানাবে। মাতৃপিতৃহীন যে সব বাচ্চা পথে পথে ঘুরে বেড়ায় সবাইকে ধরে এনে এখানে রেখে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবে।
এটা একটা মহৎ কাজ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আর সব মহৎ কাজের সঙ্গে কাকেরের যে লোকটা যুক্ত থাকে তার নাম নাজিব কুরেশি। ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার সঙ্গে সে যেমন একটা মহৎ প্রেরণায় যুক্ত হয়, রত্নেশ্বর নাথের সঙ্গে, বস্তার জেলার আরও গোটা পঁচিশ সংস্থার সঙ্গে সে যুক্ত। যুক্ত সে শুভ চিন্তকের সঙ্গেও।
একদিন নাজিব কুরেশির মাথায় আসে–কাপসীর বাঙালী দাদা মনোরঞ্জন ব্যাপারীর হাতে এখন কোনই কাজ নেই। একেবারে হাত পা গুটিয়ে বসে আছে। তাকে শুভ চিত্তকের সাথে যুক্ত করে নিতে হবে। তাতে তারও লাভ, লাভ শুভ চিন্তকের। যার ফলে একদিন শুভ চিন্তকের কর্ণধার রাজিন্দর আর নাজিব যৌথভাবে পরামর্শ করে দুজনে মোটর সাইকেলে চেপে হাজির হল আমার কাছে। দাদা তোমাকে নিতে এসেছি। বলে নাজিব–আমরা কেউ সংস্থা থেকে কোন ভাতা নিইনা। তবে তোমার যাতে সংসার চলে সেই রকম একটা ব্যবস্থা করা হবে। রাজিন্দর জানায়–এখন দিনে পঁচিশ মানে সাড়ে সাতশো, এটা থাকবে ভাতা। আর যে কাজটা আমাকে দেওয়া হবে–সেটা যদি ঠিকঠাক করতে পারি, যাতে আরও কিছু পাই সেটা দেখা হবে।
–কি কাজ?
–কাজ আবার কি? সমাজ সেবা। অনাথ বাচ্চাদের সেবা করা এই তো। পরের দিন সকালে, গিয়ে পৌঁছালাম লাখনপুরী। সেখানে ইতিমধ্যে ষোলটি বাচ্চা ছেলে দুটি বাচ্চা মেয়ে যোগাড় হয়ে গেছে। অনুসন্ধান চলছে, আরও আসবে। এক সহৃদয় ভদ্রলোক আপাততঃ অস্থায়ী অনাথালয় হিসাবে তার একটি বাড়ি ব্যবহার করতে দিয়েছেন। রাজিন্দর তহসিলদার, পাটোয়ারি এদের সাথে কথা বলেছে। তারা কথা দিয়েছে যাতায়াতের সুবিধা যুক্ত কোথাও খাস জমি থাকলে পাঁচ ছয় একর ব্যবস্থা করে দেবে। কে একজন বলেছে–তার মায়ের নামে অনাথালয় হলে সে একটা বড় ঘর বানিয়ে দেবে। ওর এ তও
বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য দুজন মহিলাকে রাখা হয়েছে। একজন রান্না করে অন্যজন ওদের চান করায় জামা কাপড় পড়ায়, স্কুলে দিয়ে আসে। পাশেই একটি প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয় আছে। সব তো ঠিকঠাকই চলছে। তবে আমার জন্য কি কাজ! অনাথদের কোন সেবা করার জন্য আমাকে এখানে আনা, আর দিনে পঁচিশ টাকা ভাতা দেওয়া।
