জঙ্গলমে ক্যা কর রহা?
প্রশ্নের জবাবে বলি–মার্কিং করছি। অর্থাৎ যে কটা গাছ এখনও চোরে নিয়ে যায়নি তা গুনে রাখছি। তখন সে আমাকে নিয়ে গেল সেই লাড়িতে। দেখি, তারই মত পোষাক পড়া আরও পাঁচজন শুয়ে বিশ্রাম করছে। একজন রান্না করছে। সেই মাঠের কাছে পাঁচ ছটা ছেলে গরু চড়াচ্ছে। তাদের ডাকল ওরা। ছেলেরা কাছে এলে তাদের আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল–একে চিনিস? আদিবাসী বালকেরা–মাথা নাড়ে-কৌন জানে। অর্থাৎ চেনে না। তখন তাদের বলে একজন–প্যাটেলকো বুলা লা।
এই গ্রামের প্যাটেলের নাম সুরজা রাম। এ সেই চেতনা মণ্ডল সংস্থার এক নেতা যাকে সুরেশ মোড়ে ভোটে দাঁড় করাতে চেয়েছিল, আর আমি বিরোধিতা করেছিলাম নেতাম-এর লোক বলে। এখন সে আসছে আমাকে শনাক্ত করার জন্য। সে যদি বলে চিনি না বা যদি বলে পুলিশের চর, কপালে আমার দুর্ভোগ লেখা আছে।
শোয়া কজন সব এখন উঠে বসেছে। একজন জানতে চায়–জনসন ক্র্যাক কব আয়েগা ইধর?
যে কোন সময় আসতে পারে। ভীষণ সাহসী এই অফিসার একা যখন তখন জঙ্গলে ঢুকে যায়। বুলেট মোটর সাইকেলে সারা জঙ্গল কাঁপিয়ে–দাপিয়ে বেড়ায়। ভয় পাই আমি, এখন যদি এখানে এসে পড়ে–আর কী এরা আস্ত রাখবে। কদিন আগে এইইরিক ভুট্টা থেকে এক আদিবাসীর বাঁধা ঘর ভেঙে দরজা জানালা সব নিয়ে গেছে। কেস দিয়েছে। তার বদলা আজ এরা নিয়ে নেবে।
বলি আমি–অফিসার লোগ কব কাহা যাতা হামকো বাতাকে থোরিই যায়েঙ্গে?তখন আবার বলে সে–জিসদিন বো জঙ্গলমে মিল যায়েগা উসদিন উসকা আখেরি দিন হোগা।
এতক্ষণে সুরজারাম এসে পড়ে। সে আমাকে দেখে বলে–আরে এ তোমরা কাকে ধরেছ। এতো আমাদের নিয়োগীজির লোক। সুরজার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন আপ্লুত হয়ে ওঠে। আমি একদিন ওর বিরোধিতা করেছিলাম। বাগে পেয়েও সে তার শোধ নিল না। কিন্তু “দাদালোগ” সুরজার কথা শুনে বড় অবাক। এ কী করে হয়। মোর্চার লোক হয়ে ফরেষ্টের মজদুরি। ওঝার অনুগামী হয়ে সাপের সাথী–এত বড় রঙ্গ।
বলি–নিয়োগীজি বলতেন-গরিব মানুষের কাছ থেকে কোন নীতি নৈতিকতার আশা করা যায় না। খিদেয় তার পা পিছলে দেয়। আমি বাইরে থেকে এখানে এসে পড়েছি। এক কাচ্চা চাষের জমি নেই। এখানে আমার করার মতো কোন কাজ নেই। সংগঠনের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। কী করব, বাধ্য হয়েই এই সব। ওদের রান্না হয়ে গেছে। আতপ চালের দলাদলা ভাত আর কুলতির কালো ডাল। আর কিছু নেই। সাতজনের দুজন মেয়ে। একজন কালো আর সামনের একটা দাঁত অর্ধেক ভাঙা। এদের অন্ধ্র প্রদেশের বলে মনে হয়। ছেলেদের এক দুজন বস্তারের থাকলেও থাকতে পারে। আমার কাছে সেদ্ধ চালের ভাত আলুর তরকারি পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কা ছিল। আমি সেগুলো বের করে ওদের সাথে মিলে মিশে খাই।
খেতে খেতে একজন বলে–তোমরা নিয়োগীজিকে বাঁচাতে পারলে না।
বলি–আমি থাকি বস্তারে, উনি ছিলেন ভিলাইয়ে। যাদের উপর ওনাকে রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল, তারা কি করেছে তা আমি কি করে বলব। তবে এটুকু আমি বলতে পারি, যদি আমার উপর সে ভার থাকত, নিয়োগীজিকে বাঁচাতে পারি আর না পারি খুনিকে অত সহজে পালিয়ে যেতে দিতাম না। তার লাশও ওখানে পড়ে থাকত।
আর একজন বলে নিয়োগীজি মারা যাবার পর একটা মহল এই রকম একটা ধারণা তৈরি করার চেষ্টায় ছিল যে পি.ডব্লু.জি তাকে মেরেছে।
বলি আমি-সেটা মুক্তি মোর্চা বা সাধারণ মানুষ কেউ বিশ্বাস করে নি। কারণ নকশালরা যা করে, তার দায় স্বীকার করে নেয়। নিয়োগীজির বেলা তারা সেটা করেনি।
অন্য একজন বলে–জনকলাল ঠাকুরের এখন পি.ডব্লু.জি সম্বন্ধে, তাদের কাজ সম্বন্ধে কি বক্তব্য?
বলি–নিয়োগীজি বলতেন–তিনি নকশালদের প্রত্যেকটা কথা, প্রত্যেকটা কাজের সমর্থন করেন। শুধু সমর্থন করেন না কাঁধের বন্দুকটা। জনকলাল ঠাকুর যখন তার অনুগামী ওই কথাই বলবে বলে আমার ধারণা।
–কিন্তু সারা দেশ জুড়ে যে রকম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে–মানুষের ন্যায্য দাবিদাওয়ার আন্দোলন যেভাবে বন্দুক দিয়ে দমন করা হচ্ছে, অস্ত্র ছাড়া কি ভাবে তার মোকাবিলা করা সম্ভব হবে?
আমার জবাব–সংগঠিত ব্যাপক গণ আন্দোলন। কথাটা বলে মনে হয় আমি তোতা রটন রটে যাচ্ছি। তার জবাবে সে বলে–ছত্তিশগড়ে নিয়োগীজির মত গণ সংগঠন আর কার ছিল? কে এতবড় ব্যাপক আন্দোলন গড়তে পেরেছে? কিন্তু সংগঠন তার নেতাকেই রক্ষা করতে পারেনি। পঁচিশ বছরের চেষ্টায় যে সংগঠন তিনি গড়েছিলেন, এক গুলিতে সব শেষ। মোর্চার কোমর ভেঙে গেছে। আর কোনদিন কী সে ভাঙা কোমর সোজা করে উঠে দাঁড়াতে পারবে?
বলি আমি–তাহলে যারা প্রথম দিকে নকশাল বাড়িতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন চারু মজুমদার কানু সান্যাল জঙ্গল সাওতাল সুশীতল রায়চৌধুরী খোকন মজুমদার, সরোজ দত্ত, তারা
তো আজ নেই। কেউ মারা গেছেন কেউ সরে গেছেন, কিন্তু আন্দোলনটা আজও আছে। স্থান কাল পাত্র অনুসারে তার আকার প্রকার তত্ত্বের কিছু পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটেছে বটে–কিন্তু যেটা মুল বিষয়–সেই শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষ তো লড়েই যাচ্ছে।
এরপর বলে একজন–যদি আমাদের কোনদিন প্রয়োজন হয় তোমার সাহায্য কতটা পেতে পারি?
বলি–আমি একজন সংসারে বাঁধা পড়ে যাওয়া মানুষ। যতটা সাহায্য করলে আমার ঘর সংসার বরবাদ না হয়ে যায় ততটা।
