বলেছিলাম–এই কাজ আমার আদর্শের পরিপন্থী নয়। গাছ আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। নিয়োগীজি পরিবেশ এবং পর্যাবরণ রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। চিপকো আন্দোলনের নেতা সুন্দরলাল বহুগুনা আমাদের আদর্শ। বন বিনাশ যে করুক চোর বা
সরকার, আমরা তার বিরোধ করি। তাই আমার কাজটা যদি হয় বন রক্ষকের সানন্দে করব। করতে পারব। বলেন তিনি–সরকার যে বনবিনাশ করে তার পিছনে নানা কারণ থাকে, আমি বলব সেটা বাধ্য হয়ে করতে হয়। এই যে হাজার হাজার গাছ কেটে জমি খালি করা হল, তা না করা হলে তো শরণার্থীদের পুনর্বাসন দেওয়া যেতো না। আর সেই বন ধ্বংসের কারণে যারা জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল-ফলমূল মধু মাংস জ্বালানি পেত সেই আদিবাসীর চোখে বাঙালী আর তার সাথে সরকারও শত্রু হয়ে গেছে। তা সেটা বাদ দিলাম। এখন সামান্য যে কিছু বন পারাল কোটে অবশিষ্ট আছে সেও জঙ্গল চোরদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছেনা। সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে খ্যারকাটা বিটের। এক নাম্বার আর দু নাম্বার ভিলেজে মনে হয় চার পাঁচটা করাত দল আছে। ওরাই গাছ কেটে জঙ্গল সাফ করে দিচ্ছে। যদি তুমি কাজ চাও, আমি ওই বিটে চৌকিদারি দেব। পারলে এসো।
চৌকিদারি একটা বিপদজনক বিরক্তিকর কাজ। সারাদিন একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হবে। সারা পারাল কোট জুড়েই কাঠ চোরদের দৌরাত্ম। প্রায় প্রতি বাঙালী গ্রামেই একটা দুটো করাত দল আছে। যারা আট দশজন একত্র হয়ে ঘন জঙ্গলে চলে যায় জঙ্গল ধ্বংস করতে। বীজা সেগুন এসব দামি গাছ কেটে তাকে প্রথমে তক্তা তারপর ফার্নিচার বানিয়ে গোপন পথে পাচার করে দেয় নানা স্থানে। এবং এটাও সত্যি যে এদের সাথে বন বিভাগের কর্মচারীদেরও কারও কারও গোপন লেনদেন আছে।
আমার কাছে এখন সবচেয়ে বড় পেটের টান, আর তাকে সাপোর্ট দেবার জন্য আদর্শবাদের অজুহাত হাতে আছে, তাই পর্যাবরণ প্রেমের দোহাই দিয়ে ঢুকে গেলাম ফরেস্টের চৌকিদারি করতে আটত্রিশ টাকা মজুরিতে। আমার কাজ কে কোথায় গাছ কাটছে তা লুকিয়ে দেখে এসে ডেপুটি রেঞ্জারকে জানানো। সে লোকজন নিয়ে গিয়ে ঘেরাও করে তাদের ধরবে। এ কাজে ভয় অনেকগুলো। সাপ বিছে ভালুক কামড়াতে পারে। জঙ্গলে পথ হারিয়ে অন্যদিকে চলে যেতে পারি। আদিবাসী ধরে বলি দিয়ে দিতে পারে। কাঠ চোরেরা ধরলে মেরে পুতে দিতে পারে। আর তার চেয়েও যেটা বড় ভয় নকশালরা ধতে পারে। ওর কষ্ট কোন জঙ্গলে থাকে সে তো কেউ জানে না। ফরেস্টের লোকরা তাদের দু চোখের বিষ। তারা কোথায় লুকিয়ে আছে পুলিশের কানে বেশ ক’বার তারা বলে দিয়েছে। ওটা একটা, অন্যটা গরিব আদিবাসীর উপর ফরেষ্টের লোকের জুলুমবাজি।
আমার একটা সাইকেল আছে। রোজ সকালে আমি সাইকেলে জল আর দুপুরের খাবার নিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা দেই। কাপসী থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আসি সেই খ্যারকাটা ড্যামের কাছে। এ পথে জঙ্গল খুবই পাতলা আর কিছু লোকজনের দেখা মেলে। এ দিকে কয়েকটা আদিবাসী কয়েকটা বাঙালী গ্রাম আছে। খ্যারকাটা ড্যাম পার হলে শুরু হয় ঘন জঙ্গল। পুর্ব থেকে সোজা পশ্চিম দিকে মাইল পাঁচ সাত চলার পর উত্তর দিকে ধনুকের মতো বাঁকা পথ ধরি। চলি, আর জঙ্গলে কান পেতে রাখি কোথাও কোন কুড়ুল করাতের শব্দ, কোন মানুষের অস্তিত্ব টের পাই কিনা। পথ মসৃণ নয়, উবর খাবর পাথর মাটির। একটা দুটো নালাও পার হতে হয়। এইভাবে বেলা বারোটা সাড়ে বারোটায় পৌঁছাই জঙ্গলের মধ্যের ছোট গ্রাম ইরিকভুট্টায়। সেখানে এক গাছতলায় বসে দুপুরের খাবার খেয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, অন্য এক জঙ্গল পথ ধরে জঙ্গল দেখতে দেখতে ফিরতে থাকি খ্যারকাটা ড্যামের দিকে। এ পর্যন্ত আসতে চারটে বেজে যায়। এতক্ষণ ছিল কঁচা রাস্তা। এবার পাকা রাস্তা। আসবার সময় ছিল চড়াই, এখন উতরাই। খ্যারকাটা ড্যামে চান করে তখন চেপে বসি সাইকেলে। সন্ধ্যে নাগাদ ফরেষ্ট অফিসে গিয়ে রিপোর্ট করি-অল ও.কে। কেউ কোন গাছ কাটছে না। তারপর ছুটি। এই আমার রোজকার কাজ।
একদিন চলেছি এই পথে। ইরিক ভুট্টা গ্রাম তখনও মাইল খানেক দূরে। জঙ্গলের পাশে এখানে আদিবাসীদের অল্প কিছু চাষের জমি আছে। যাতে বর্ষাকালে ধান ভুট্টা এই সব ফসল হয়। বন্যজন্তুদের হাত থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য রাত পাহারাদার থাকতে হয় বলে একটি ঘর বানানো আছে–একে স্থানীয় ভাষায় লাড়ি বলে। সেই লাড়ির কাছাকাছি আসতেই ভয়ে সারা শরীর কেঁপে গেল আমার—’রোক’, এই হুঙ্কার শুনে। দেখি এক গাছের আড়াল থেকে আমার বুক সোজা উঁচু করে ধরা একখানি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, তাড়াতাড়ি সাইকেল থেকে নিচে নেমে হাত উঁচু করে দাঁড়াই। একবার আমি জঙ্গলে চোরা শিকারীর সামনে পড়েছিলাম। হরিণ খরগোস কিছু একটা মারবে বলে চারখানা গাদা বন্দুক নিয়ে বনে এসেছিল। আমাকে দেখে বন্দুক ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়ে ছিল তারা। আমি ডেকে তাদের বন্দুক নিয়ে যেতে বলি। আদিবাসী কামার শালায় বানানো সে বন্দুকের চেহারা এমন কদাকার যে দেখলে ভয় করে না, হাসি পায়। কিন্তু এই অস্ত্রখানা দেখলে প্রাণ আপনি উড়ে যায়।
বন্দুকধারী এবার গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে। তার পরিধানে লতাপাতা আঁকা সামরিক পোষাক। তার জিজ্ঞাসা–তোম কোন? বলি–বাঙালী। কাপসীতে থাকি।
