আমরা মানে সে একা নয়, অনেক কজন কাল থেকে সরাসরি সরকারি কর্মচারী হয়ে যাচ্ছে। কাল থেকে বদলে যাবে জীবনের স্তর। কাল থেকে এরা আর মজুর নয়, মজুর খাটানো ইনচার্জ। তাই গলায় থৈ থৈ করছে আবেগ আর আনন্দ।
চা শেষ করে বলি–চলুন মোর্চার অফিসে যাওয়া যাক। বলে সে–আমি তো আর ওখানে যেতে পারব না। আপনি যান। আমাদের সাথে ওদের এই রকম চুক্তি হয়েছে, ইউনিয়ন ফিউনিয়ন করা চলবে না। কতকাল এক সাথে ছিলাম বলুন তো! খুব ইচ্ছা করে ওখানে যেতে। কিন্তু কি কবর, কোন উপায় তো নেই। জীবনটা একটা স্থিতি পেতে যাচ্ছে এখন কোনরকম ছেলেমানুষি করে সেটা নষ্ট করা ঠিক নয়।
জানিনা কেন আমার বুকটা ভেঙেচুরে যেতে থাকে কী এক বেদনায়। আমি এদের কথা শুনে নগর পালিকার অমন আরাম আর নিশ্চিন্ত চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি, আর এরা মুক্তিমোর্চা ছেড়ে দিয়ে চাকরিতে চলে যাচ্ছে। নিয়োগীজির রক্ত ঘাম শ্রম ত্যাগ করা তপস্যার দ্বারা গড়ে ওঠা সংগঠন শেষ হয়ে যাচ্ছে।
শুধু এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এ আমি নকশাল আন্দোলনের দিনেও দেখেছি। অনেক আগুনখোর বিপ্লবীকে চাকরি দিয়ে বিপ্লবী আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে মন থেকে।
আমি শালা এক গাড়োল। খানিকক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে সারা দুনিয়ার সবাই সমঝোতা করছে। দু কলম লিখে আর দুদিন নিয়োগীজির আগে পিছে ঘুরে বড় বড় আদর্শবাদের বাত ঝাড়ছি, এদিকে যে প্যান্ট ছিঁড়ে পেছন দেখা যাচ্ছে সে দিকে খেয়াল নেই।
.
আমি কাঁকের কাহিনী সমাপ্ত করে অন্য কাহিনীতে যাবো। যে সব কথা এতক্ষণ ধরে শোনালাম তা সেই ১৯৯৫/৯৬ সালের কথা। এখন ২০১২ সাল। ছত্তিশগড় আলাদা রাজ্য হয়ে গেছে। কেরল রাজ্যের চেও বড়ো এই বস্তার জেলাকে ভেঙে পাঁচটা জেলা বানানো হয়েছে। দান্তেওয়ারা, বিজাপুর, নারানপুর, কাঁকের ও বস্তার।
এখন নকশাল আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়েছে। আর হ্যাঁ, প্রবল প্রতাপশালী কাকের নগর পালিকা পরিষদের অধ্যক্ষ রবিশ্রীবাস্তব মারা গেছেন। কাঁকেরে এসে তার সুরক্ষিত বাসভবনে চুকে গুলি করে গেছে নকশালরা।
পরের দিন ভগ্নমনে এক পরাজিত সৈনিকের মত ফিরে এসেছিলাম বাড়িতে। আর কাউকে নয় নিজেকেই বড় অপরাধী বলে মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি আমার বউ বাচ্চা কারও সঙ্গে ন্যায় করিনি। আমি তো এখন একা নই আরও তিনটে প্রাণ আছে আমার উপর নির্ভর করে। এই গহীন বনে তাদের আমি ছাড়া আর কেউ নেই। আমার অনেক ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ ছিল।
অনু তখন সকাল বেলা দশ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে পিত্তেপুরিয়া গ্রামে যায়। দুপুরের রোদে সেই পথে আবার ফেরে। দুই সন্তানের মা যার প্রথম সন্তান হয়েছে সিজার করে, দ্বিতীয় সন্তান ফরসেফে, তারপরে পেটে আর একটি অপারেশান আছেনসবন্দীর। এতসব কাটাকুটির পারে রোজ কুড়ি কিলোমিটার উবর খাবর পাহাড়ি পথে সাইকেল চালানো সে যে কী কষ্টের তা একমাত্র সে-ই জানে যে ভুক্তভুগি। যখন সে ফেরে রোদে পোড়া ঘর্মাক্ত মুখের দিকে তাকাতে পারি না লজ্জায়। ওর সব কষ্টের জন্য নিজেকেই দায়ী মনে হয়।
যেদিন দল্লী থেকে ফিরে আসি, ফেরার আগে দেখা করেছিলাম জনকলাল ঠাকুরের সাথে। বলেছিলাম বড় অভাব চলছে। সংসারে চাল ডালের সমস্যা। উনি ভীষণ কষ্টে, যেন এককালীন দান, এমনভাবে পাঁচশো টাকা দিয়ে বলেছিলেন–আমাদেরও আজকাল খুব টাকার টানাটানি। বুঝেছিলাম এই শেষ। আমি আবার এদের কাছে মূল্যহীন হয়ে গেছি। এরপর দল্লী এলে খালি হাতে ফিরে যেতে হবে।
.
একদিন গেলাম সেই ফরেস্টের ডেপুটি রেঞ্জার জনসন ক্র্যাকের কাছে। যাকে একদিন বকেয়া বিড়ির পাতার মজদুরির দাবিতে ঘেরাও করেছিলাম। কিন্তু এখন তার মনে সে রাগ ক্ষোভ অপমানের বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। সময় সব চেয়ে বড় চিকিৎসক। সময় মানুষের সব ক্ষত নিরাময় করে দেয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে রাগী সব চেয়ে খুংখার সবচেয়ে বদমাশ বলে বদনাম কুড়ানো এই লোকটা কেন কে জানে বর্তমানে আমাকে একটু অন্যরকম চোখে দেখে। কাপসী। অঞ্চলে “নেতাগিরি” করে খাওয়া লোকেদের চেয়ে অন্যরকম। সবাই জানে বন বিভাগ বন বিনাশকারী একটি সরকারি সংগঠন। এরাই জঙ্গলের মূল্যবান কাঠ পাচার করার জন্য বেতন পায় সরকারি কোষাগার থেকে। ফলে অনেক নেতা এবং সাংবাদিক এদের কাছে পৌঁছে যায় ব্লাকমেল করার জন্য। কিন্তু আমি কোনদিন যাইনি। এটাই তার কাছে আশ্চর্যের, এটাই তার কাছে ভালো লাগার এবং এটাই তার কাছে ভয়েরও।
একদিন সে তার সেই ভয় আর বিস্ময় থেকে জিজ্ঞাসা করেছিল–হর কোঈ এক বিল লেকর ফরেস্ট লোগোকে পাশ পৌচ যাতা, কি, চান্দা দেও। লেকিন তুমকো কভি নেহি দেখা!
বলেছিলাম–আমাদের সংগঠন আমাকে কোন বিল যে দেয়নি, চাদা তোলার। যেদিন দেবে সেদিন যাব চাদা নিতে। আর তারপরই বলেছিলাম-চাঁদা চাইনা যদি পারেন আমাকে একটা কাজ দিন। খুব উপকার হবে।
বলেছিলেন তিনি–ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে তো তোমাদের সাপ আর নেউলের সম্পর্ক। আমরা যা করি তোমরা তার বিরোধিতা করো। কি করে ফরেস্টে কাজ করবে? আমি তোমাকে একটা চৌকিদারি দিতে পারি। এটাই আমার হাতে আছে। যারা জঙ্গলের কাঠ চুরি করে কেটে নিয়ে যায়, ধরতে হবে। পারবে?
