বলি আমি–এটা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।
কাল কাপসীতে পাখানজুর বান্দেতে দাঁড়িয়ে যাদের আদ্যশ্রাদ্ধ করেছি আজকী করে সেখানেই দাঁড়িয়ে মানুষকে বলব কংগ্রেসকে ভোট দিন। ব্যানার্জীরা দাঁত বের করে হাসবে। আর পাবলিক ভাববে ভালো দাম পেয়ে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছি। তার চেয়ে বড় কথা–আগামী প্রজন্ম, যার মধ্যে আমার ছেলে মেয়ে ওরাও থাকবে। তারা যদি আমার লেখাগুলো পড়ে, আমার নাকের সামনে তুলে ধরে বলে–লেখার সময় এ সব কী লিখেছিলে আর করার সময় এসব কী করেছ? তখন তার কী জবাব দেব? আমি নিজের হাতে যা নির্মাণ করেছি কেমন করে তার বিরুদ্ধে যাব।
বলে রবি শ্রীবাস্তব–দাদা আমরা সোজা পথে চলি আর সোজা কথা বলি। কোন প্যাঁচঘোচ বুঝি না, তত্ত্ব ফত্তর ধার মাড়াই না। আর হ্যাঁ কাউকে কোন মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিই না। আমি তোমার বিপদের সময় দেখেছি–কথা দিলাম আগেও দেখতে থাকব। আমি চাই আজ আমাদের বিপদের দিনে তুমি আমাদের পাশে দাঁড়াও। সাগর বাঁধায় কাঠ বেড়ালির কথা জানা আছে নিশ্চয়। হামলোগ কিসিকো কুছ দেতে হ্যায় তো উসকা রিটার্ন ভি মাঙতে হ্যায়।
বললাম–আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু নির্বাচনের প্রচার ছাড়া আর যা বলবেন আমি তা সব করতে রাজি আছি। ওটা আমি পারব না। এই আদেশ আমাকে দেবেন না। আপনি মাইনে দেন আপনার হুকুম তামিল করাই আমার কাজ। কিন্তু রাজনৈতিক মতবাদের ক্ষেত্রে আমি আমার নিজের অধীন।
বলে সে-যদি তুমি আমাদের হয়ে প্রচারে না যাও আমি ধরে নেব গোপনে গোপনে তুমি জনকলাল ঠাকুরের পক্ষে কাজ করছে। সে ক্ষেত্রে আমি তোমাকে চাকরিতে না-ও রাখতে পারি। ভেবেচিন্তে যা বলার কাল আমাকে জানাবে।
রবি শ্রীবাস্তবের আজকের আচরণ অন্য দিনের চেয়ে অন্যরকম। আমার কেন জানি না তার ব্যবহারে অপমান বোধ হয়। তখন বলি–তাহলে গোপনে নয়, সরাসরি আমি কাল থেকে জনকলাল ঠাকুরের পক্ষেই প্রচারে যাচ্ছি। আমি শংকর গুহ নিয়োগীর লোক। এটা আমার বিরাট গর্বের, ভীষণ অহংকারের। সেই পরিচয় আমি মুছতে পারব না।
সেই রাতেই ধর্মশালা থেকে বেড়িয়ে চলে গিয়েছিলাম দল্লীতে। পরের দিন ফিরে যাই কাপসীতে। সাধ্যমত আমরা চেষ্টা করি। তবে সেই নির্বাচনেও কংগ্রেস বা বলা চলে অরবিন্দ নেতামই জয়ী হয়। তের জন প্রার্থীর এক মাত্র বিজেপি বাদে অন্য এগারো জন সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। হাবালা কান্ড নিয়ে সারা দেশ তোলপাড় হয়েছিল তা এ অঞ্চলের আদিবাসী ভোটারদের মনে কোন ক্ষতিকারক প্রভাবই ফেলতে পারেনি। বরং উল্টে অনেক বেশি জন সহানুভূতি পেয়ে অরবিন্দ নেতামের স্ত্রী ছবিলা নেতাম জিতে যায়।
ভোটের প্রচার যে কয়দিন চলেছিল কাপসীতে জিপ কর্মী চাল ডাল কোন কিছু আসার বিরাম ছিল না। কটা দিন আমাদের দারুণ উত্তেজনা আনন্দে কেটে গিয়েছিল। তারপর আবার নেমে এল এক অখন্ড নীরবতা এক অসহনীয় সংবাদহীনতা। আর কেউ দল্লী থেকে বা কাকের থেকে আমার কোন খোঁজ খবর নিতে এল না। যেন তারা ভুলেই গেল আমার কথা।
এদিকে আমার স্ত্রী অনুর মাস গেলে পাওয়া আড়াই শো টাকায় আর সংসার চলে না। শেষে একদিন গেলাম দল্লী। বাস থেকে নেমে বুকটা ছ্যাক করে উঠল আমার। একোন দল্লী দেখছি আমি। প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর আন্দোলনে উত্তাল “লালহরা” পতাকায় মোড়া সে শহর কই? এযে এক মৃতপ্রায় মুমূর্ষনগরী। যার প্রাণবাতি নিভু নিভু। নিয়োগীজি মারা যাবার পর মুক্তিমোর্চার নেতাদের সঙ্গে মালিক পক্ষ আর সরকার পক্ষ তাদের অনুকুলে নানা রকম চুক্তি করে দল্লী খাদানের শেষ ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে। তারা এক চুক্তির বলে প্রায় অর্ধেক মজুরকে মেডিকেল আনফিট দেখিয়ে ভলেন্টারি রিটায়ারমেন্ট দিয়ে কাজ থেকে বসিয়ে দিয়েছে। গ্রাম থেকে তারা শহরে এসেছিল এখন আবার ফিরে গেছে গ্রামে। যারা একটু নেতা গোছের তাদের সরাসরি সরকারি চাকরির আওতায় এনে বদলি করে দেওয়া হয়েছে মিটিং মিছিল থেকে দূরে-অন্যকোন খাদানে সুপারভাইজার করে। আর অল্প কিছু অসহায় মানুষ রয়ে গেছে কোন ঠিকাদরের অধীনে। যাদের সংখ্যা হাজার বারোশোর বেশি নয়। মজদুর জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শহরে যদি মজদুরইনা থাকে দোকানপাট বাজার হাট গাড়ি ঘোড়ার সে চমক দমক থাকে কী করে?
যখন আমি দল্লী পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাটায় বিকেল চারটে বাজে। খাদান থেকে মজুররা সব নিচে নেমে গেছে। পাহাড়ে এখন ব্লাস্টিং চলছে। লাল ধুলোয় চারদিকে আচ্ছন্ন। পথে আগের মত জন সমাগম নেই। সব চোখে পড়ার মত ফাঁকা ফাঁকা। সেই যে ব্রিজ যে ব্রিজের উপর থেকে গুলি চালিয়ে পুলিশেরা মজুরদের মেরেছিল ৭৭ সালের এক সকালে, সেখানে এখনও একটা চা দোকান আছে। সেই যে কী এক বিপর্যয়ে ডাইনোসর মরে গেছে কিন্তু বেঁচে আছে ছোট্ট পিঁপড়ে, সেই রকম। বাস মোড় থেকে শহীদ হাসপাতাল এই আধ কিলোমিটার পথের দুপাশে শতাধিক দোকান ছিল বড়বড়। সব এখন খরিদ্দারের অভাবে বন্ধ। সেই একমাত্র দোকানে বসা দেখলাম মুক্তি মোর্চার এক নেতাকে। আমাকে দেখে গলায় এক সমুদ্র উচ্ছ্বাস এনে সে ডাকলোব্যাপারীজি আইয়ে আপকো চায় পিলাতে হ্যায়। বড়া খুশিকা দিনমে আপ সে মোলাকাত হো গয়া। চা খেতে খেতে বলে নেতা, কাল থেকে আমরা ডিপার্টমেন্টাল হয়ে যাব। এ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটার আজ হাতে পেয়েছি।
