এই মুক্তিধামে আমার ডিউটি। না, কাজ বলতে তেমন কিছু একটা নেই। বেশ বড়, সপরিবারে থাকার মত একটা ঘর আছে, সেখানে সর্বক্ষণ শুয়ে বসে থাকা। টিভি থাকলে টিভি দেখতে পারি, বই থাকলে পড়তে পারি, কাগজ কলম থাকলে লিখতে পারি। কাউকে ডেকে এনে তাকে নিয়ে দাবা খেলতে পারি। আর যদি কখনও কোনদিন একটা মৃতদেহ আসে, তবে মৃতের আত্মীয়দের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা কুইন্টাল দরে দাম নিয়ে যতটা কাঠ তারা চাইবে গোডাউন থেকে মেপে দিয়ে দিতে হবে। ব্যাস এই।
এই শহরের অর্ধেক লোক সিন্ধি সিকি ভাগ মুসলমান। পাঞ্জাবি বাঙালী এবং অন্যান্য সব মিলিয়ে আর পঁচিশ ভাগ। এবং সবচেয়ে যেটা মজার আদিবাসী একজনও নেই। এই শহরে একটা বড় হাসপাতাল আছে, তাছাড়া আছে ভালো ভালো ডাক্তার। যে কারণে মৃত্যুর হার খুবই কম। সপ্তাহেদাহহতে গড়ে একটা মৃতদেহ আসে কীনা সন্দেহ। রবি শ্রীবাস্তব বলে–মুক্তিধামকে আমি মৃতের জন্য নয়, জীবিতের জন্যে বানাচ্ছি। একে এমন ভাবে সাজাব যে মানুষ এসে মনের শান্তির জন্য এখানে বসে থাকবে। আর ধীরে ধীরে সে মুক্তিধামকে সেইভাবে গড়েও তুলছে।
এই সময় একদিন বিনা মেঘে যেন বজ্ৰাপাত। আর তা পড়বি তো পড় একেবারে আমারই মাথার তালুতে। হাবালা নামক সেই বহু চর্চিত টাকা লেনদেন কাণ্ডে ফেঁসে গেল মন্ত্রী অরবিন্দ নেতাম। তখন লোকসভার নির্বাচনের দিনও আর খুব একটা দূরে ছিল না। তখন কংগ্রেস পার্টির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে যতদিন অরবিন্দ নেতাম নির্দোষ প্রমাণিত না হয়, তাকে টিকিট দেওয়া হবে না। তবে সেই স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত নেতাম পরিবার কংগ্রেসের বিশ্বস্ত সেবক। সেই জন্য অরবিন্দ নেতাকে টিকিট না দেওয়া হলেও তার স্ত্রী ছবিলা নেতামকে কাকের লোকসভার আসনে টিকিট দেওয়া হবে।
যথাসময়ে নির্বাচনি রণদামামা বেজে উঠল। কাঁকের লোকসভার আসনে সর্বমোট তেরজন প্রার্থী ভোট যুদ্ধে অবতরণ করল। কংগ্রেস বিজেপি বহুজন সমাজপার্টি জনতাদল নির্দল এবং তার সাথে প্রার্থী হল ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার জনকলাল ঠাকুর।
আমি তখন সারাদিন শ্মশানে আর রাত হলে নগর পালিকা পরিষদ দ্বারা সঞ্চালিত ধর্মশালায় গিয়ে থাকি। যে ঘরটায় আমার সপরিবারে থাকার কথা সেটির নির্মাণ কিছু বাকি আছে। তাই আমি এখানে একা আছি। এক দু মাসের মধ্যে অনুকে নিয়ে আসতে পারব এমন মনে হয়।
একদিন সেই ধর্মশালায় রত্নেশ্বর নাথ আর নাজিব কুরেশি গিয়ে হাজির। তাদের সাথে রয়েছে জনকলাল ঠাকুর। বলে নাথ–এবার তো ব্যাপারীজি, গায়ের ধুলো ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ানো দরকার। সময় তো এসে গেছে। নেতামের বদনাম হয়ে গেছে, তার স্ত্রীকে কেউ ভোট দেবে না। বিজেপি তো সবদিন হারে। গোটা কয়েক সিন্ধি আর গোটা কয়েক বাঙালী ছাড়া তাদের তো কোন জনাধার নেই। বি.এস.পি, জনতা দল এদের ভোটার তো দুরের কথা সব কটা বুথে এজেন্টও দিতে পারবে না। আগে একবার ঠাকুর সাহেব এই কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবাই তার নাম জানে, কাজ জানে। আমরা যদি জোর লাগাই ঠাকুর সাহেব এবার ঠিক জিতে যাবে।
বলি–ঠাকুর সাহেবের হয়ে যদি প্রচারে নামি আমার চাকরিটা তো থাকবে না।
–দাদা, তোমার মত একজন সমাজকর্মী–নিয়োগীজির অনুগামী, চাকরির মায়ায় এই রকম সময়ে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকবে এটা ভাবতেও আমার ভালো লাগছে না। বলে নাজিব।
জনকলাল ঠাকুর বলে–পিছন দিকে তাকিও না। সামনে দেখো। যা পরিস্থিতি তাতে আমার জয়ী হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা। আমি তো আছি। ও সব চাকরি ফাঁকরি দেখা যাবে। এখন কাজে নেমে পড়ো। পরের কথা পরে ভাবা যাবে।
জনকলাল ঠাকুরের জিপে লাল সবুজ পতাকা লাগানো। বাস রাস্তায় দাঁড় করানো হয়েছিল সে জিপ। ফলে সে যে আমার কাছে এসেছিল তা আর গোপন রইল না। নাথ তা গোপন করে রাখেও না। ধূর্ত লোক, রাজনীতির খেলাটা সে ভালোই জানে। কোহলিয়া যে হেতু রবি শ্রীবাস্তবের লোক, তার গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলন করার জন্য বর্মালাল খটবানি, যে বিজেপির নেতা, তার কাছ থেকে জিপ নিয়েছিল। রবি শ্রীবাস্তবের সাথে রত্নেশ্বরের সেয়ানা সেয়ানায় কোলাকুলি। সে কৌশল করে রবি শ্রীবাস্তবের কানে কথাটা তুলে দেয়, ব্যাপারী দাদা কো উত্তর বস্তারকা প্রভারী বানাকর হাম পারাল কোট ভেজনকা সারি প্রবন্ধ করচুকে হ্যায়। এরই এক দুদিন বাদে আমাকে ডেকে পাঠাল রবি শ্রীবাস্তব তার নিজস্ব নগর পালিকার কক্ষে।
বলে–দাদা, হামনে আপকো কভি নেহি বোলা কি আপ মেরে পার্টিমে আও৷ বোলা ক্যা? নেহি বোলা। আউর কভি বোলতা ভি নেহি। লেকিন আজ এই সময় আ গিয়া ইতনা বড়া মুশিবৎ। আপ তো জানতে হ্যায় নেতামজিকো টিকট নেহিমিলা। আগার ছবিলাজি ইস চুনাব জিৎ
পায়ে, তো হাম লোগ যো নেতাম পরিবারকে সামনে রাখকর রাজনীতি করতে হ্যায়~-হামলোগ কঁহা রহেঙ্গে? যব হাম হিনা রহে তো আপ কাহা?ইসলিয়ে আপ হাম সবকো চাহিয়ে জি জানসে জুট জানা। আউর কেইসে ভি হো ছবিলাজি কো জিতাকে লানা। আপ এক কাম করিয়ে, কাল এক জিপ লে লিজিয়ে। উসমে বাঁধ লিজিয়ে মাইক টাঙ দিজিয়ে ঝান্ডা। কুছ পয়সা বয়সা ভি লে লিজিয়ে। আউর চলা যাইয়ে পারাল কোট।ব্যানার্জী লোগ যো কর রহা করনে দিজিয়ে। আপ সিধা হামসে সম্পর্ক বানাকে রাখিয়ে। আপকা হাজিরা ইধার চলতা রহেগা। হামকো এ বাত মালুম হ্যায় কী বাঙালী লোগ নেতামজিকো পসন্দ নেহি করত। লেকিন আপকা কথন ভাষণ সামঝানে পর কুছ তো অসর হোগা। কমসেকম হাজার ভোেট তো মিলেগা পচাত্তর হাজার মে সে? আভি হামারা লিয়ে এক এক ভোট বহোত কিমতি।
