ঝাড়ুরাম এখন নেশায় লুড়কে গিয়েও বারবার জোর দিচ্ছে “সরকারি আদমি” শব্দটার উপর। হিন্দু শাস্ত্রে যেমন গোবধ নিষিদ্ধ, আদিবাসী চেতনায় রাজার লোক অবধ্য জীব। রাজার স্থান এখন নিয়েছে সরকার। বলে সে সরকারি লোক “লাপাতা”হয়ে গেলে মহা তুলকালাম হবে। পিত্তে পুরিয়ার পূজারির এখন কি দশা? ফরেষ্টারকে মেরেছিল বলে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে “দাদালোগ” বলে কেস দিয়ে দিয়েছে। এখন পচছে জেলে। এর কিছু হয়ে গেলে আমার আর তোমার সেই দশা হবে। বাঁধের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে পুলিশ আমাদের ছাড়বে না।
আমার এখন মনে হয় পূজারি একটু নরম হয়ে পড়েছে। সেই নরমত্বের ফাঁকে আমি আমার আবেদন গুঁজে দেই শুদ্ধ হিন্দিতে–কাক্কা, মেরা ছোটাছোটা দো বাচ্চে হ্যায়। বিবি হ্যায়। হাম না রহনে সে উনলোগোকো কোন দেখে গা। সবকে সব ভুখ মে তড়পকর মর যায়েগা। ইসমে তুমহারা পাপ লাগে গা। বাচ্চে ভগওয়ানকা প্যারা হোতা হ্যায়। তখন কি বুঝলো পূজারি তা কে জানে! তবে তার চেহারা থেকে ধর্মোন্মাদী কাঠিন্যটা চলে গেল। হেসে হেসে বলে উঠল–আরে বেটা মজাক করেহন। মজাক মানে রসিকতা। সে নাকি এতক্ষণ আমার সঙ্গে ঝাড়ুরামের সঙ্গে। রসিকতা করছিল। এতক্ষণ তাকে ঝাড়ুরাম যা বলেছিল সে আমাকে তাই বলে–আরে বেটা তুই হচ্ছিস সরকারি আদমি। তোকে কী করে পুজো দেব! সে কী পারি? কেউ কী পারে? ডর মাৎ, লে দারঘো পি!
শেষবারের মত মদ খেয়ে সেই যে আমি চলে এলাম তারপর আর কোনদিন ও পাড়া মুখো হবার মত মনের জোর পাইনি।
প্রায় দেড় বছর লেগেছিল পলাচুর বাঁধ নির্মাণ হতে। তিনদিকে পাহাড়, আর একটা দিকে পাহাড় সমান বাঁধ দিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছিল জল ধরে রাখার। এক কোটি ছিয়াশি লক্ষ টাকা ব্যায়ে বানানো হয়েছিল এই “বালির বাঁধ”। যার ল থেকে ইকার সরিয়ে একার বসিয়ে দিলেই মানেটা যথার্থ হয়। এই বাঁধের ঠিকাকার্য যার নামে সে একবারের বেশি দুবার বাঁধে আসেনি। তারই বকলমে কাজ চালিয়েছে বর্মা সাহেব। সরকার যাকে বেতন দিয়ে রেখেছে ঠিকদারের কাজটা ঠিকঠাক করছে কিনা তা বুঝে নেবার জন্য। সে ঠিকঠাক করছে কিনা তা দেখবে কে? কেউ দেখার ছিল না, তাই কেমন বাঁধ তৈরি হল সে তো আমি আগেই বলেছি। প্রথম বর্ষাতেই বাঁধ ভেঙে জলের তোড়ে সরকারের এককোটি ছিয়াশি লক্ষ ধুয়ে বেড়িয়ে গেল। এতদ অঞ্চলের মাননীয় মন্ত্রী অরবিন্দ নেতাম দ্বারা জনগণের উদ্দেশ্যে বাঁধ উৎসর্গ হবার একমাসের মধ্যে এ ঘটনা ঘটল। কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে বর্মা সাহেব বিভাগীয় তদন্তের সামনে পড়লেন।
বর্মা সাহেব আমার নিয়োগ কর্তা। ভাউচারে সই করিয়ে তিনি আমাকে বেতন দেন। তিনি থাকলে আমি কোথায় থাকি? আবার আমি দ্বারস্থ হলাম রবি শ্রী বাস্তবের। সে আবার চিঠি লিখলো। আবার আমি চিঠি নিয়ে হাজির হলাম আর এক এস.ডি.ওর সমীপে। উনি ছিলেন বর্মা সাহেব ইনি হলেন শর্মা সাহেব। আবার কাজ পেলাম বাঁধ নির্মাণে। ওটা ছিল মাটির বাঁধ, এটা সিমেন্টের। কাকের বাসস্ট্যান্ডের পূর্বদিকে দুধ নদীর উপরে এই বাঁধ তৈরি হবে। মাস ছয় চলল এই কাজ। এরই মধ্যে রবি শ্রীবাস্তব কাকের নগর পালিকা পরিষদে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমে পার্ষদ পরে অধিকাংশ পার্ষদের সমর্থন পেয়ে নগর পালিকা পরিষদের অধ্যক্ষ মনোনীত হলেন।
তখন একদিন আমাকে ডেকে বলল–এখানকার বাঁধের কাজ প্রায় শেষ। এরপর তুমি আর কঁকেরে থাকতে পারবে না। তখন শর্মা সাহেব তার যেখানে ইচ্ছা পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমার ইচ্ছা বরাবরের জন্য তুমি কাকেরে থেকে যাও। তোমার বউ বাচ্চা সব এখানে নিয়ে এসে থাকো। বউকে কোথাও আই.সি.ডি.এস. এর নতুন সেন্টার হলে সেখানে লাগিয়ে দেব।
বলি–কিন্তু ওদের এনে রাখবো কোথায়?
যদি তুমি রাজি থাকো নগর পালিকার অধীনে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। দেড় বছর ক্যাজুয়াল তারপর পার্মানেন্ট। থাকার জন্য একটা কোয়ার্টার দেওয়া হবে। জল বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকবে। খোলামেলা শান্ত পরিবেশ। থাকো খাও আর আরামসে লেখো।
কাঁকেরে নাজিব কুরেশি রত্নেশ্বর নাথ বিষ্ণুপ্ৰসাদ চক্রবর্তী থাকে। এ ছাড়া এই ছয় মাসে বেশ কিছু নতুন বন্ধুও হয়ে গেছে যারা আমার মনের খুব কাছাকাছি। এদের সাথে সময়টা ভালোই কাটে। এদের ছেড়ে মাঠে ঘাটে পাহাড়ে জঙ্গলে এবং যাদের ভাষা সংস্কৃতি কোন কিছুর সাথে পরিচয় নেই সেই মানুষদের মধ্যে রাতদিন পড়ে থাকা সত্যিই খুবই কষ্টকর। যদি সংগঠন গড়বার প্রয়োজনে যেতাম তার একটা অন্য রকম আনন্দ থাকত। আমার মাষ্টার মশাই বলেছিলেন–যাহা আনন্দ তাহাই অমৃত। সেই অমৃত এখন আর ওখানে পাচ্ছি না। পাচ্ছি এখানে–কঁকেরে। তাই ভাউচারে সই করে বেতন নেবার পর ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। নব নিযুক্তি নিলাম নগর পালিকা পরিষদে। আর প্রথম দিন ডিউটিতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়ক গাছ। এ আমার জন্য কী চাকরি বেছে রেখেছে “রবি ভাইয়া”!
শহর ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে, পশ্চিম দিকে থেকে একেবারে সোজা যে দুধ নদী এসেছে এবং যা এগিয়ে গিয়ে কাঁকের শহরকে বেড় দিয়ে নব নির্মিত বাঁধ পার হয়ে একটা জেড অক্ষরের মত পূর্বদিকে চলে গেছে সেই নদীর দক্ষিণ পাশে কমপক্ষে পঁচিশ একর জায়গা জুড়ে যে শ্মশান যার নাম দেওয়া হয়েছে মুক্তিধাম, বহুযত্নে বহু অর্থব্যায়ে তার সৌন্দর্যকরণ করা শুরু হয়েছে। প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে লাগানো হয়েছে এবং হচ্ছে নানাবিধ ফল ও ফুলের গাছ। সে গাছকে রক্ষা করার জন্য চারদিকে আটফুট উঁচু করা হচ্ছে পাঁচিল। মুক্তিধামের দুদিকে দুটো দরজা। দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে বের হয়ে সামনে পাকা রাস্তা। এই রাস্তায় কালে ভদ্রে এক আধটা জিপ গাড়ি চলে, না হলে সবই সাইকেল। এই পথে যাওয়া যায় মন্ত্রী অরবিন্দ নেতামের গৃহ-গ্রামে। কাকের থেকে যত মৃতদেহ আসবে, এই পথে এসে মুক্তিধামে প্রবেশ করবে। আর উত্তর দিকের দরজা দিয়ে যাওয়া যাবে দুধ নদীর পাড়ে। যদি কেউ মৃতদেহ স্নান করায়, নিজেরা স্নান করে, এই পথে গিয়ে করবে। অপরূপ সৌন্দর্য এই দুধ নদীর। দু পাড়ে শুধু বালি আর বালি। তারই মাঝখানে যেন চিরশান্ত বালিকার মতো এক হাটু জল বুকে ধরে রেখে ঘুমিয়ে আছে। তার শ্বাস প্রশ্বাসের মতো তিরি তিরি করে বয়ে চলে কঁচের মত স্বচ্ছ জল। সে জলে নামলে শরীর মন জুড়িয়ে যায়। দুধ নদীর এই রূপ থাকে বছরে নয় মাস। অন্য তিন মাস সে বেগবান, যুবতী। দুকূল ছাপিয়ে তখন তার উদ্দাম ছুটে চলা।
