এক পথিক পথ দিয়ে যাচ্ছিল তার তেষ্টা পেয়েছে। সে গিয়ে দাঁড়াল এক গৃহের সামনে–জল দাও আর্জি নিয়ে। বাড়িতে কোন অন্যলোক নেই অথবা ছিল সে অন্যকথা। জল এনেছিল সে বাড়ির অষ্টাদশী মেয়েটি। পথিক জল খেয়ে পাত্র রেখে হেঁটে চলে গেল। একটু হাসল না মেয়েটার গালটা একটু টিপে দিল না কৃতজ্ঞতায় হাতটা ধরল না–এটা অপমান। কেন হাসলে না? মেয়েটা কুরূপা? তার গায়ে কী শুয়োরের বিষ্ঠা লেগে আছে? তা যদি থাকে তবে কেন খেলে জল? কতদূর থেকে জল বয়ে এনে রেখেছে কী এই জন্যে যে কেউ এসে সে জল খেয়ে তাকে মান না দিয়ে চলে যাক? আমার ছোট্ট একটি উপন্যাস আছে অন্য ভুবন। তাতে আমি এই মান আর অপমান নিয়ে লিখেছি।
একপ্রস্ত, যাকে অবতরণিকা, গৌরচন্দ্রিকা, সমারম্ভ বলা চলে। এরপর আসল পানপর্ব বা অবগাহনে যাবার প্রস্তুতি শুরু হল। আমি তখন চাইছি–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে কোন অঘটন ঘটার আগে সরে পড়ি। কিন্তু ঝাড়ুরাম উঠছে না। নাগালে মদের পাত্র পেয়েছে। ভরাভাণ্ড মদ রেখে চলে যাবে এত মনের জোর তার নেই। বস্তারে কার আছে কে জানে!
এবার একটা মুরগি নিধন হল। চায়ের সাথে টা দিতে হয়, মদের সাথে চাট। একটানে মুরগির মাথাটা ছিঁড়ে ফেলল পূজারি। এখানকার প্রত্যেকটা আদিবাসী বাড়িতে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, দিন কিংবা রাত সর্বক্ষণ উঠোনে অগ্নিকুন্ড জ্বলে। আগুন জ্বালানোর আধুনিক পদ্ধতি এখানে এখনও ব্যাপকতা লাভ করেনি। দেশলাই কাকে বলে এরা জানে না। সেই আগুনে মুরগিটাকে উল্টেপাল্টে পুড়িয়ে, টেনে ছিঁড়ে তিনটে পাতায় ভাগ করে রাখে সে। পাশে রাখে খানিকটা নুন কয়েকটা লঙ্কা। এত কর্মকাণ্ডের কোথাও কোন জলের ব্যবহার নেই। জল বলতে এখন মদ। পাতার ঠোঙায় এবার ঘরে বানানো মহুয়া ফুলের মদ-যা আগুনে ঢাললে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, গলায় ঢাললে কলজে জ্বলে–চড়চড় করে পেটে নামে-তা দেওয়া হল। আমি আজ বিশেষ অতিথি।
রামকৃষ্ণ ঠাকুর বলেছেন–লজ্জা ঘৃণা ভয় ত্যাগ করতে। মদই একমাত্র সেই পানীয় যা মানুষকে ওই তিনটি থেকে মুক্ত করে মুক্তির মার্গ প্রশস্ত করে দেয়। মদ পেটে যাবার ফলে এখন আর আমার সেই গা ঘিনঘিন ভাব নেই। দিব্যি নুন লঙ্কা দিয়ে পোড়া মুরগি চালিয়ে দিলাম। দু বোতল খাঁটি মদ যা সাধারণ পানাসক্ত আটজনের খোরাক তা তিনজনে শেষ করার পর পূজারির লাল চোখ আরো লাল রক্ত জবার আকার ধারণ করল। তার ভয়ংকর শরীর আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। তখন সে ঝাড়ুরামকে বলে–আব এলা যে চল। মানে, এখন একে নিয়ে চল।
ঝাড়ুরামের ভীত বিস্মিত আর্তরব–কাঁহা!
–পূজ দেথন। মানে, পুজো করে দেব। বলে পূজারি, লে চল।
আমরা বাঙালীরা অনেক সময় বলে থাকি–মায়ের ভোগে দেব। কথাটার মধ্যেকার প্রতিটা শব্দই অতি নিরীহ ও নিরামিষ। কিন্তু এই কর্মকাণ্ডের সবটা জুড়ে শুধু আমিষ আর আমিষ। আদিবাসীদের ভাষায়ও পুজো করে দেব মানে ফুল জল ছেটানো নয়–আঙ্গার উদ্দেশ্যে বলিদান দেওয়া। পূজারি এখন আমাকে বলি দেবার জন্য ঝাড়ুরামের সহায়তা চাইছে।
ঝাড়ুরামও আদিবাসী। সে জানে তাদের দেবতা কতখানি তৃপ্ত হবে নররক্ত পেলে। সামনে চাষ আসছে। পুজোর পরে সেই রক্ত বীজ ধানে মাখিয়ে জমিতে ছড়ালে ফসলে মাঠ ভরে যাবে। জীবন সুখময় হবে। তাকে বলে রেখেছিল পুজারি–চারদিকে যখন ঘুরিস দেখিস না চেষ্টা করে, যদি পাওয়া যায়। আজ যখন সে আমাকে নিয়ে পূজারির কাছে এল আনকোড়া মুখ দেখে তার ধারণা হয়, দেবী না দেবতা কে জানে, তার তুষ্টির জন্যে ঝাড়ুরাম আমাকে ফুঁসলে নিয়ে এসেছে। এবার সে সেই পবিত্র কর্মটা সম্পন্ন করে দিতে চাইছে।
তখন চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। জঙ্গলের সে জংলি অন্ধকার আরও নিকষ ভয়াবহ–হাড় হিম করা। লে চল কথার সাথে ঝাড়ুরাম সহযোগিতা দিলে আর আমার রক্ষা নেই। সভ্য জগতের শিক্ষিত মানুষেরা ভাগ্য ভগবান দেবী দেবতা নিয়ে যে মাতামাতি করে–ছাগ বলি মোষ বলি গরু উট কোরবানি, সেখানে বুনো জংলি শিক্ষাদীক্ষাহীন এক আদিবাসীর আর কি দোষ। সে আমাকে খুন খতম মার্ডার হনন সংহার এসব করতে চাইছে না–দেবতার কাছে উৎসর্গ করে দিতে চাইছে মানুষের মঙ্গলের জন্য। দেবতা খুশি হলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে সোনার ফসলে ভরে যাবে আদিবাসীদের ক্ষেত। যদিও নেশায় ঝাড়ুরামের সারা শরীর টলছে তবু তার বুদ্ধি বিলোপ হয়নি। বলে সে, এলা নেহি। না, একে নয় “কাবর”? পূজারির প্রশ্ন–কেন, একে নয় কেন? বলে ঝাড়ুরাম–এ সরকারি লোক। একে পূজো করে দিলে কাল সবাই আমাকে জিজ্ঞাসা করবে-লোকটা কোথায় গেল। তুমি তো সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলে! পুলিশ এসে আমাকে ধরবে, তখন আমি কী করব?
–বলে দিবি, কোথায় গেছে আমি তার কি জানি। আমি তো নিয়ে এসে বাঁধের ঝুপড়িতে রেখে দিয়ে চলে গিয়েছিলাম।
ঝাড়ুরাম আর পূজারি দুজনে একে অপরকে বহু সময় ধরে বোঝাবার চেষ্টা করতে থাকে। এ যেন বহুদিন আগেকার বর্ধমানের সেই অন্ধকার রাত আবার ফিরে এল নতুন ভাবে। সেদিনের মত আজও আমার ভয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব অবশ হয়ে যেতে থাকে। সেদিন পুড়ে যাবার ফলে আমার শরীর ছিল অক্ষম আজ অত্যধিক মদ্যপানের ফলে অচল।
কালীঘাট শশ্মানে আমার এক বন্ধু থাকে–অর্জুন মল্লিক। যে সম্পর্কে ফঁসুড়ে নাটা মল্লিকের ভাই। সে নাকি ৮৯/৯০ সালের দিকে দাদার সহযোগী হয়ে সেন্ট্রাল জেলে দুই ডাকাতের ফাঁসি দিতে গিয়েছিল। সে বলেছে–যখন কেউ বুঝে যায় তার বাঁচার আর কোন উপায় নেই, তখন শরীর ভয়ে একেবারে ঝিম মেরে যায়। আর নড়তে চড়তেও পারে না। আমার অবস্থা এখন তাই। শরীর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। একদিন আমার জীবন মরণ ঝুলেছিল ভুতোর একটা হ্যাঁ, না, এর উপর। এখন ঝুলে আছে ঝাড়ুরামের সম্মতি অসম্মতির উপরে। আমি ততক্ষণ বেঁচে থাকব যতক্ষণ ঝাড়ুরাম আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। পূজারির সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। তা থাকলে কেঁদে ঝাঁকিয়ে হাতে পায়ে ধরে–অথবা কোন কৌশল করে, যে ভাবে একবার কামার পাড়া থেকে। বেঁচে ফিরেছিলাম–সেভাবে বাঁচার একটা চেষ্টা করা যেত। কিন্তু সে সব কায়দা এখন চলবে না। এটা দেবতার কাজ। এখানে আমাকে ছেড়ে দেবার কোন প্রশ্নই নেই। কবে কোথায় কোন গৃহস্থ্য ব্যাব্যা কান্না শুনে মানত করা পাঠাকে ছেড়ে দিয়েছে বলি না দিয়ে? আমি যে ভাষায় কাঁদতে কাতরাতে জানি আমার সেই আ-মরি বাংলা ভাষা ওদের কাছে তো ব্যাব্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। যেমন মালায়ালাম, কন্নর, গোন্ডি, বা চাটগায়ের ভাষা আমাদের কাছে।
