সারাদিন বাঁধে কাজ চলে। ট্রাক রোলার লেবারে জঙ্গল গমগম করে। সন্ধ্যে নামবার সাথে সাথে সব শুনশান। সবাই চলে গেলে বাঁধের পাশে বানানো এক ঘরে ঢুকে সেই যে দরজা বন্ধ করি সারারাতে আর খুলি না। পেচ্ছাব পেলে চৌকির উপর দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে সেরে নিই। বারো ঘন্টার লম্বা রাত কাটে আমার এক নিদারুণ ভয়ের মধ্যে দিয়ে। যদি সাপ আসে, যদি ভালুক ঢুকে পড়ে পলকা দরজা ভেঙে ফেলে, যদি নকশালরা আসে, যদি আদিবাসীরা ধরে নিয়ে যায় তাদের নররক্ত প্রিয় দেবতা আঙ্গাকে তুষ্ট করার জন্য বলি দিতে? নকশালদের নিয়ে আমার খুব বেশি দুশ্চিন্তা নেই। এসেই ওরা গুলি চালাবে না, দুটো কথা বলবে দুটো কথা শুনবে। আত্মবিশ্বাস আছে, আমি যদি দু কথা বলতে পারি–একটা চান্স পাবো। কিন্তু যারা আমার ভাষা বোঝে না (আমার বাংলা ভাষা) আমি যাদের ভাষা বুঝি না (গোন্ডি) তাদের কী করে বোঝাবো? তখন আমি হয়ত কাঁদতে পারি। সে কান্নায় আর কী হবে? আগে আমাদের রাজারা কালীপূজায় নরবলি দিতো। যাকে বলি দিতে আনা হতো সে কী কাঁদত না? তাবলে কী ধর্মান্ধ কাঁপালিকরা তাদের ছেড়ে দিত?
একেই বলে বোধহয় ভাগ্য। আঙ্গার কোন ভক্ত পূজারি আমাকে খুঁজে বাঁধে ধরতে এল না, আমিই একদিন পৌঁছে গিয়েছিলাম আঙ্গার থানে। সে দেব না দেবী তা জানি না–যে নররক্ত পেলে বড় খুশি হয়, আর ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে দেয়।
সেদিন আমার বাঁধের এক লেবার ঝাড়ুরামকে নিয়ে সন্ধ্যেবেলায় বাঁধের কাজের শেষে বেড়িয়েছি কিছু লেবার যোগাড় করতে। কাল থেকে আরও বেশি লোক লাগাতে হবে। বর্ষা আসছে, তার আগে বাঁধের কাজ শেষ করতে হবে। তাই গেছি ঝাড়ুরামদের গ্রামে। বাঁধ থেকে পূর্বদিকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ঘন্টা খানেক হেঁটে তবেই ঝাড়ুরামদের গ্রাম। এখানকার সব আদিবাসী গ্রামেরই জনসংখ্যা হয় খুব কম, তবে গ্রামের পরিধি হয় খুব বড়। একটা বাড়ি থেকে আর একটা বাড়ি থাকে সিকি মাইল কী আধ মাইল দূরত্বে। আর বাড়ির চারদিক ঘিরে থাকে ঘন জঙ্গলে। ঝাড়ুরাম সাথে আছে তাই, না হলে এ গ্রামে পথ চিনে আমার একা আসা বা চলে যাওয়া কঠিন ব্যাপার। ও সারা গ্রাম পরিক্রমার পর শেষ বেলায় নিয়ে গেল গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় পাহাড় আর ঘন জঙ্গলের মধ্যে এই গ্রামের পূজারির বাড়িতে।
আদিবাসী সমাজ সরঞ্চনায় তিনজন মানুষের স্থান সবার উপরে। একজন হল প্যাটেল। যে গ্রামের যাবতীয় বিবাদ বিসংবাদের বিচার কর্তা। তার কথাই শেষ কথা, এর কোন আপিল নেই। আর একজন হচ্ছে বেগা। অর্থাৎ ডাক্তার। সে ওষুধ এবং নিদান দেবে রোগ নিরাময়ের। আর একজন হল এই পূজারি দেব। দেবতাকে সন্তষ্ট করে আদিবাসী জীবন সুখময় করার জন্য যা কিছু করা দরকার তা করে। পূজারি না থাকলে এতদিন দেব দেবীর রোষে, ঝড় বৃষ্টি খরা মহামারী থেকে আদিবাসী মানুষকে কে বাঁচাত? আদিবাসী মানুষের কাছে সব চেয়ে বড় হচ্ছে ভগবান, তারপরে বড় রাজা, যে ভগবানের প্রতিনিধি। এবং তারপরে এই তিন সেয়ান।
আমরা এখন এক সেয়ান–পূজারির বাড়িতে এসেছি। সে বাড়ির এমন পরিবেশ যে যাওয়া মাত্রই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। মনে হল যেন এ বাড়ির মধ্যে কতগুলো প্রেতাত্মার বাস। তারা ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। ফিস ফিস করে কিছু বলছে। কোন গোপন পরামর্শ করছে। আর পূজারিকে দেখে তো ভয়ে মুচ্ছা যাবার মত অবস্থা। তখন সন্ধ্যা নামছে। চারদিকে ছেয়ে গেছে একটা ছাই ছাই অন্ধকার। সেই আবছায়া আলো অন্ধকারে সামনে এসে দাঁড়াল নেংটি পড়া, মিশকালো, প্রায় ছয় ফুট লম্বা, সেই রকম চওড়া, মাথার লম্বা লাল চুলে জট পাকানো, বড় বড় চোখ বড় বড় হলদেটে দাঁত, গায়ে বিকট দুর্গন্ধ, মাথা ঘামে ভেজা সেই পূজারি। যে ঝাড়ুরামকে এ সময়ে আমাকে নিয়ে উপস্থিত হতে দেখে হাসল। তার বড়বড় হলদেটে দাঁতের হাসি আর ইঙ্গিতময় চোখের ইশারায় ঝাড়ুরামকে কেমন যেন বিব্রত বলে মনে হল। আর আমি? আমার মনের মধ্যে ছোট্ট মুনিয়া পাখিটা কাতরে উঠল–বড় ভুল হয়ে গেছে। এখানে আসাটা বড় ভুল হয়ে গেছে রে।
আদিবাসীদের অতিথি সৎকারের নিয়ম মদ পরিবেশন। বাঙালীদের যেমন চা। সে লাউয়ের খোসায় বানানো পাত্র–যার স্থানীয় নাম তুম্বা, তা থেকে পাতার ঠোঙায় উগ্রগন্ধের মহুয়া মদ ঢেলে দিল। আমি আজ তার অতিথি। বড় আদরের অতিথি। আদিবাসীর পরিবেশন করা মদ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। যেমন রাজার দান প্রজার। মদ ফিরিয়ে দিলে গৃহকর্তার অপমান হয়। বাড়ি বয়ে এসে অপমান? আদিবাসী অপমান সহ্য করে না। অপমানিত আদিবাসী আর আহত বাঘ দু জনেই ভয়ংকর। আর বস্তারের গোণ্ড ও মুড়িয়া আদিবাসীদের কীসে যে মান কীসে যে অপমান সেটা বোঝাও এক সুকঠিন সমস্যা। যা এত দিনেও আমি বুঝে উঠতে পারলাম না।
একটি যুবতী বাজারে গেছে। একটি যুবক তার পশ্চাদ দেশে ছোট একটি চড় মেরে দিল কিংবা কোন ছুতোয় ছুঁয়ে দিল বুক। মেয়েটি বুঝে ফেলেছে ছুতোটা। বাঙালী হলে নিশ্চয় বাজার মাথায় তুলে নেবে। আদিবাসী মেয়েটা নেবে না। কারণ এটা মান। যুবা তার অঙ্গ সৌষ্ঠবকে মান দিয়েছে। যুবকটির নরম হাতের কোমল ছোঁয়ায় তো লুকনো ছিল সেই স্বীকৃতি যে যুবতীর ওই প্রত্যঙ্গগুলো আকর্ষক, মনোলোভা। এটা অপমান কী করে হয়?
