এখন মানুষ সেটাই করতে নেমেছে। যারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের জীবন তছনছ করতে আসছে, বারুদি সুরঙ্গ দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে। মনে রাখা দরকার প্রথম বারুদি সুরঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে নিয়োগীজির মৃত্যুরই পরে। তার আগে নয়। উনি বেঁচে থাকলে এমন অবস্থা হয়ত আসত না।
পলাচুর বাঁধে যারা কাজ করে সবাই স্থানীয় আদিবাসী। আদিবাসীরা সরল সোজা মানুষ। তারা জানে না যে এখন মধ্যপ্রদেশ সরকারের ন্যূনতম মজুরি দৈনিক তেত্রিশ টাকা তেত্রিশ পয়সা। ফলে তাদের খাঁটিয়ে তেত্রিশ টাকা তেত্রিশ পয়সার কাগজে টিপছাপ নিয়ে ষোল টাকা হিসাবে মজুরি দেওয়া হয়। এটা নকশালপন্থীদের চোখে অপরাধ। আগে যে সাইড ইনচার্জ ছিল তারা তাকে মাস কয়েক আগে একবার বারণ করে গিয়েছিল–এটা কোরো না, কাজটা ঠিক নয়। পরের বার আবার এসে যখন শুনলো–এখনও সেই ষোল টাকা দেওয়া হচ্ছে সাইড ইনচার্জকে গাছের গায়ে বেঁধে ঠেঙিয়ে হাড়গোর সব ভেঙে দিল। সারারাত গাছে বাঁধাই থাকে। সকাল বেলা পুলিশ এসে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পথে মারা যায়। সেই থেকে বাঁধের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল। এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এখানে এসে, থেকে, কাজটা তুলে দিয়ে যাবে। সেই মৃত মুনশির স্থলে আমার নিযুক্তি হয়েছে। এখন আমাকে সেই লোক ঠকানো অপ্রিয় কাজটা করতে হবে।
আমাকে এখানে কাজের দায়িত্ব দিয়ে পাঠাতে পেরে রবি শ্রীবাস্তবের এক ঢিলে অনেক পাখি মারাটা সহজ হয়ে গেছে। এক, প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বাঁধের কাজ নবোদ্যমে শুরু করা গেল। দুই, আমি যদি নকশালদের হাতে মারা পড়ি, সেটায় তার কোন ক্ষতি হবে না, কিছু লাভ হবে। লোককে বলা যাবে শ্রমিক দরদি নিয়োগীজির মৃত্যুর পর তার লোকজন আদর্শচ্যুত নীতিভ্রষ্ট হয়ে গেছে। দেখো, আমাদের কাছ থেকে সব টাকা বুঝে নিয়ে গিয়ে বোঁকাসোকা আদিবাসী মজুর গুলোকে কী ভাবে ঠকাচ্ছিল। তিন, যদি মারা না যাই যদি কাজটা তুলে দিতে পারি লাভের কয়েক লক্ষ টাকা হামাগুড়ি দিয়ে তার পকেটে ঢুকে যাবে। চার, মনোরঞ্জন ব্যাপারীর আনুগত্য পাওয়া যাবে, তাকে নিষ্ক্রিয় করে রেখে দিলে কিছুটা হলেও রত্নেশ্বর নাথ দুর্বল হবে।
আমি পলাচুর বাঁধে আসার দিন কয়েক পরে এখানে মিনিট কয়েকের জন্য এসেছিল রবি শ্রীবাস্তব। এখানে ঠিকাদার অফিসার যে কেউ আসুক দু পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়ায় না। যত তাড়াতাড়ি পারে চলে গিয়ে লোকজনের ভিড়ে দ্রুগকোন্দলের অফিসে বসে। বাঁধের আশেপাশের জঙ্গলে শুকনো পাতায় মচমচ শব্দ হলেও তাদের প্রাণ উড়ে যায়, ওই, ওই বুঝি তারা আসে।
সেদিন আমাকে বলেছিল রবি শ্রীবাস্তব–এখানে অনেক কিছু জানবে অনেক কিছু দেখবে। কিন্তু মাথা গরম করা চলবে না। সব সহ্য করে নিতে হবে। আমিও সেটা বুঝে গিয়েছিলাম, যদি সহ্য না করতে পারি আমার কাজটা থাকবে না। আমার সংসারে আবার অভাব এসে ঘিরবে। তাই ন্যায্য মজুরির অর্ধেকেরও কম দিয়ে পুরা মজুরির কাগজেটিপ ছাপ নিয়ে আদিবাসী মানুষগুলোকে ঠকানোর কাজে আমিও যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম নীরবে, নিজের ভিতরের প্রতিবাদী সত্তাটাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে।
পলাচুর বাঁধের অল্প কিছু দুরে যে টাউন মত অঞ্চল যার নাম দ্রুত কোন্দল, সেখানে একটা পুলিশ ফাড়ি আছে। কিছু দোকান, কটা সরকারি অফিস আর স্কুল আছে। এখানে চাকরি করে বিলাসপুর রাজনাদগাঁও রায়পুরের কিছু অর্ধশিক্ষিত লোকজন। “এক পুরুষের অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন” সংরক্ষণ ব্যবস্থার ফাঁক গলে চাকরিতে ঢুকে এই সব লোক প্রচুর বেতন এবং ঘুষ পায়। অসম্পূর্ণ শিক্ষা এবং সংস্কৃতিহীন হবার কারণে সেই টাকা কি ভাবে খরচ করতে হবে তা জানে না। এদের ঘর আঁতিপাতি করে খুঁজেও একখানা বই পাওয়া যাবে না। এরা টাকা খরচ করার জন্য বেছে নিয়েছে সেই সহজ পথ যা বেশির ভাগ বদলোক নিয়ে থাকে। তা হল মদ মেয়েমানুষ আর জুয়া। বড় বড় শহরে যে রকম ঘোড়ার রেসে টাকা ওড়ে, এখানে ওড়ে মুরগা লড়াইয়ে। হাটবারের দিন এক একটা মুরগার হার জিত নিয়ে হাজার দুহাজার টাকা বাজির দর ওঠে। আদিবাসী অঞ্চলের সুস্থ সাধারণ জীবনকে এরা তছনছ করে দিচ্ছে। এদের প্রত্যেকের মোটর সাইকেল আছে। সন্ধ্যেবেলায় এরা মোটর সাইকেলে চেপে পকেটে টাকার বান্ডিল নিয়ে চলে আসে নির্মিয়মান বাঁধের কাছে। বাঁধে পুরুষদের তুলনায় নারী শ্রমিক বেশি। যেই তারা কাজ সেরে ঘরে ফেরার পথ ধরে তাদের পিছু নেয় এই নারী শিকারীর দল। শাড়ি রূপোর গহনা নগদ টাকা দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে যাকে তার পছন্দ মোটর সাইকেলে তুলে নেয়। এটা যেমন ঠিক, ওটাও মিথ্যা নয়, যে, কোন কোন মেয়ে মোটর সাইকেলে চড়বার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই বাঁধের কাজে আসে। আবার এটাও হয় যে কাউকে কাউকে জোর করেও বাইকে তোলা হয়। এক দময়ন্তীর বলাৎকার নিয়ে আমি তোলপাড় করেছিলাম, এখানে প্রায়দিনই কোন না কোন দময়ন্তী শিকার হয়ে যায়।
এখানকার মানুষ এ সব মেনে নিয়েছে। তাদের মুখে কোন রা নেই। যেন এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। আমিও মেনে নিই। দেখে দেখে চোখ পচে যায়। এ সব ঘটনা আমাকে আর কোন যন্ত্রণা দেয় না। রামকৃষ্ণ বলেছেন–যে সয় সে রয়, যে না সয় সে নাশ হয়। কত বড় মহাপুরুষ ছিলেন তিনি। তার কথা মেনে নিয়ে চোখ কান বন্ধ করে পড়ে থাকি।
