মানুষ কী খায়, আর কী খায় না, এই প্রশ্নের উত্তর আমার অন্ততঃ জানা নেই। সেদিন সেই ক্ষুধার রাজ্যের পাগলপ্রায় মানুষকে আমি যে কত কী খেয়ে পেটের দাউদাউ আগুনকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টায় প্রাণপাত করতে দেখেছি সে বলে শেষ করতে পারব না। বুনো ডুমুর, জংলা কচু, যার আর এক নাম খারকোল, কচি খেজুরের আঠি, খেজুর গাছের মাথি, শাপলা গাছের গোড়ায় জন্মানো ড্যাপের খই, বুনো কুল, মহুয়া ফল, চরোটা গাছের পাতা সেদ্ধ আরও কত কী!
এখানে দেখেছিলাম খিদেকে মায়ের মমতা স্নেহ সন্তানের প্রতি যে দরদ তা কেমন করে খেয়ে নেয়। এক মা তার শিশু পুত্রের “মা ভাত দাও আমার খিদে পেয়েছে,” এই কাতর কান্না সইতে না পেরে দুঃখে রাগে উন্মাদিনী হয়ে বাচ্চাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছিল এক কুয়োর মধ্যে। জল না থাকায় শিশুটি অবশ্য প্রাণে বেঁচে যায়।
এই দেশে যখন ইংরেজ শাসন বলবৎ ছিল এক নেতা অনশনকে অস্ত্ররূপে প্রয়োগ করেছিলেন। তখন কেউ অনশনে বসলে শাসকদের বুক কেঁপে যেত। ইংরেজরা ছিল সাগর পাড়ের মানুষ। তাদের প্রাণে দয়ামায়া বেশি। তারা মানুষের প্রাণের মায়া-মূল্য বুঝত। অনাহার যে কী কষ্টকর তা জানত। তাই কেউ কোন দাবি নিয়ে অনশনে বসলে তারা ছুটে আসত। আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধান বের করার চেষ্টা চালাত। ওই সর্ব সাহেব শাসকদের নামে নির্দয়তার যে সব গল্প চালু আছে, হিসেব করলে দেখা যাবে এদেশীয় শাসকশ্রেণীর তুলনায় তা পাহাড়ের পাশে উইঢিবি, হাতির পাশে পিঁপড়ে, সমুদ্রের সামনে শিশির বিন্দু।
এইজন্য অনশনের আঠাশদিন অতিক্রান্ত হবার পরেও সরকার পক্ষের কেউ অনশনকারীদের কোন তত্ত্ব তালাশ নেবার প্রয়োজন বোধ করল না। এখানকার মত তখন সংবাদ মাধ্যম এত শক্তিশালী ছিল না। তাই সে খবর বিশ্ববাসীর কানে পৌঁছাল না। বাঁকুড়া জেলার ঘনবনের আড়ালে চাপা রয়ে গেল চিরকালের মতো।
অনশন অস্ত্র তখনই শক্তিশালী যখন মানুষের সংবেদনশীল দরদি একটা মন থাকে। সে মন মরে গেলে, অন্ধবধির হলে, আর কোন কাজ হবার নয়। তাই নুন লেবুর জল খেয়ে নিজেরাই অনশন ভেঙে দিল অনশনকারীরা। ঠিকমত স্মরণ নেই, খুব সম্ভবত এর মধ্যে একজন মারাও গিয়েছিল।
নেতা বলল-এত নরম দাওয়াইয়ে হবে না। সরকারকে এবার একটা কড়া ভোজ দিতে হবে।
একদিন স্থির হল, সবাই মিলে মিছিল করে, শ্লোগান দিয়ে হামলে পড়তে হবে বিষ্ণুপুর শহরে। যত কোর্ট কাছারি থানা অফিস যানবাহন বাজার হাট সব অচল করে দিতে হবে। একে বলে জঙ্গি আন্দোলন। যতক্ষণ সরকার আমাদের দাবি মেনে না নেয়, বসে থাকতে হবে সব ঘেরাও করে।
আমার মা নরম মনের মানুষ। তিনি বাবাকে বারণ করেছিলেন “যেতে হবে না আন্দোলনে।” কিন্তু বাবা মায়ের বারণ শুনলেন না। অভুক্ত দুর্বল শরীর নিয়ে তিনিও পা মেলালেন মিছিলে, গলা মেলালেন শ্লোগানে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। আমাদের দাবি মানতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে। আমরা বাংলার মানুষ আমাদের বাংলায় পুনর্বাসন দিতে হবে। এই সব শ্লোগান দিয়ে সামনে এগিয়েছিল মিছিল। কিন্তু সে মিছিলকে শহরে প্রবেশ করতে দিল না পুলিশ। তারা লাঠিসোটা কঁদানে গ্যাস নিয়ে শহরের প্রবেশ পথের সামনে আটকে দিল। তাদের কাছে গোপন সূত্রে খবর পৌঁছেছিল–ডোলবন্ধ একদল অনাহারী মানুষ, যারা শহরে মিছিল নিয়ে আসছে, এরা শান্তিপূর্ণ নাও থাকতে পারে। এতে নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। লুঠপাট হতে পারে খাদ্যদ্রব্যের দোকানপাট বাজার হাট। তাই সতর্কতার অঙ্গ হিসাবে জেলা শাসক সারা শহরে একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে সব রকম জমায়েত মিটিং মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য আনিয়ে রেখেছেন কমব্যাট ফোর্স। যারা একহাতে বেতের ঢাল আর একহাতে লাঠি উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে রিফিউজিদের পথরোধ করে। “খবরদার, আর এগিও না”। রিফিউজিরা এসব ধারা উপধারার এত মানে জানে না। তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে জোর করে ঢুকে পড়তে চাইল শহরের মধ্যে। তখন পুলিশ লাঠি চালাল। ছুড়ল কাদানে গ্যাস। বেপরোয়া সেই লাঠির আঘাতে আহত হল প্রায় দেড়শত মানুষ। আমার বাবারও মাথা ফেটে গিয়েছিল। ছেঁড়া গামছায় মাথা বেধে অনেক রাতে তাবুতে ফিরে এসেছিলেন তিনি। ঔষধ পত্রের তো কোন ব্যবস্থা ছিল না, মা গাদা ফুলের পাতা থেতো করে ক্ষতস্থানে পট্টি বেধে দিয়েছিলেন। সেই পট্টি বাধা ফাটা মাথার যন্ত্রণায় বাবা কাতরাচ্ছিলেন,কাঁদছিলেন, নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করছিলেন। আর আমি। আমি সেই শিশু বয়সে শিশুমনে শপথ শানাচ্ছিলাম-যে পুলিশ আমার বাবাকে মেরেছে বড় হয়ে তাকে আমি ঠিক মারব। কোথায় লুকাবে সে। পায়ে বুট গায়ে খাকি জামা, মাথায় টুপি, হাতে লাঠি না হয় বন্দুক, তাকে আমি ঠিক খুঁজে বের করব।
সেদিন পুলিশ প্রশাসন চেয়েছিল “বিয়ের রাতে বেড়াল মারা” নীতি অনুসরণ করতে। প্রথমদিনই আন্দোলনের উপর এমন বর্বর আক্রমণ করে রিফিউজিদের মনোবল ভেঙে দিতে তারা কিছু পরিমাণে সফলও হয়েছিল বলা চলে। ফলে এরপর আরও বেশ কয়েকবার মিছিল নিয়ে বিষ্ণুপুর গিয়েছিল রিফিউজিরা, নেতারা মঞ্চে বসে গরম গরম বক্তৃতাও দিয়েছিল, কিন্তু পুলিশ আর লাঠি টিয়ার গ্যাস চালায়নি। হতে পারে প্রথমদিনের তুলনায় মিছিল মিটিংয়ে লোক সমাগম কমে যাওয়ায় তাদের আর ভয় পাবার কিছু ছিল না।
