বর্মা সাহেবের কথামত বাড়ি চলে গেলাম। পনের দিন বাড়িতে কাটিয়ে পরের মাসের এক তারিখে ভানুপ্রতাপপুরে গিয়ে ভাউচার সই করে বিগত মাসের বেতন তুললাম প্রথমে। তারপরে যোগ দিলাম কাজে। সেই কাজ যা আমি পারি। পলাচুর নামক একস্থান যেখানে নদীর উপর একটা বাঁধ দেওয়া হচ্ছে একটি জলাধার তৈরি করার জন্য। যে জলে আশেপাশের চার পাঁচটি আদিবাসী গ্রামের জলকষ্ট নিবারণ হবে। নালা কেটে এই জল পৌঁছে দেওয়া হবে তাদের গ্রামে–চাষের জমিতে। এখানকার লেবারদের কাজ দেখাশোনা করতে হবে আমাকে। মাইনে মাসে সাড়ে সাতশো টাকা।
এই বাঁধ তৈরির ঠিকা কাগজ পত্র রয়েছে রবি শ্রীবাস্তবের নামে। কিন্তু সে সব ভার সমর্পণ করে দিয়েছে এস.ডি.ও বর্মা সাহেবকে। যা কিছু লেবার পেমেন্ট লুকিয়ে বর্মা সাহেব করে দেন। আমি গিয়ে ভানুপ্রতাপপুর থেকে সে টাকা নিয়ে আসি। হিসেব করে যার যা পাওনা বুঝিয়ে দেই। ররি শ্রীবাস্তবের সাথে বর্মা সাহেবের কী হিসাব নিকাশ আমি তা জানি না।
পলাচুর বাঁধটা যেখানে অবস্থিত তার কিছুটা সামনে ভানুপ্রতাপপুর থেকে চলে এসে পাখানজুরের দিকে চলে যাওয়া একটা পাকা রাস্তা আছে। যাতে সারাদিনে বার চারপাঁচ একটা বাস চলে। আর গোটা কয়েক জিপ ও ট্রাক আসা যাওয়া করে। মাত্র এইটুকু। না হলে বাঁধের পূর্বদিকে দু মাইলের মত দূরে দ্রুগ কোন্দল–ওখানেই যা কিছু জনসমাগম। এর পরে আর যে তিনদিক পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ পাঁচ ছয় কিলোমিটারের মধ্যে লোক বসতি নেই। চারদিকে ঘন জঙ্গল। সে জঙ্গলে রয়েছে প্রচুর জন্তু জানোয়ার। তবে তাদের চেয়েও বেশি ভয় জঙ্গলের জংলি মানুষদের নিয়ে। যাদের ভাষা অবোধ্য আচার আচরণ অদ্ভুত, ধর্মাচরণ ভীতিজনক। ভাষা হচ্ছে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার বড় বাহন। এদের ভাষা না বুঝতে পারার কারণে মনের গতি প্রকৃতি রাগ দ্বেষ স্নেহ প্রেম আন্দাজ করা আমার মতো মানুষের পক্ষে খুবই মুশকিল। তবে এই সব কিছুর চেয়ে আর একটা ভয়–যে ভয়ে শাসন প্রশাসন সব কেঁপে যাচ্ছে তা হল নকশাল। পুরো ছত্তিশগড় এখন তাদের দখলে। ওরা যে কোন সময়ে বনরাজ্যের যে কোন জায়গায় হামলা করে দিতে পারে।
বিগত প্রায় তিরিশ বছর ধরে দণ্ডকারণ্যের ঘন জঙ্গলে নকশালদের একটা ঘাটি ছিল। পুলিশের হিসাবে মোট ১৩টা দল। যদি একটা দলে দশ জনও সদস্য থাকে তবে মোট একশো তিরিশ জন। চম্বলের ডাকাতের সংখ্যা এর অন্তত একশোগুণ বেশি। এখানকার ভৌগোলিক পরিবেশ এমন যে হাতে বন্দুক নিয়ে কেউ একবার জঙ্গলে ঢুকে গেলে প্রশাসনের পক্ষে তার টিকি ছোঁয়া মুশকিল। সেবিহড়ের বদমাশ বাগী বা বস্তারের আদর্শবাদী বিপ্লবী যে-ই হোক। তাই দণ্ডকারণ্যের বনে বিপ্লবীআদর্শবাদ বুকে পিডজির কিছু তরুণ আত্মগোপন করে বসেছিল। মাও সেতুং যতই বলুক–এটা বিশ্ব বিপ্লবের যুগ তবু ব্যাপক মানুষ তাদের পাশ গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল না। কারণ-শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার সব কিছু পরেও মানুষ শান্তিকামী। তারা খুনোখুনি রক্তপাত এ সবে ভয় পায়। চায়, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আবেদন নিবেদনের মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান হোক। ফলে নকশালদের হাজার প্রয়াস সত্ত্বেও কিছুতে তাদের সংখ্যা বাড়াতে পারেনি। হঠাৎ কী যে হল তা কে জানে বছর খানেক হল তাদের সংখ্যা অস্বাভাবিক রকম বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। এখন তাদের এত শক্তি বৃদ্ধি পেয়ে গেছে যে আর শুধু আত্মরক্ষা নয়–এগিয়ে এসে আক্রমণও করে দিচ্ছে। আগে পুলিশ তাদের খুঁজতে জঙ্গলে যেত। এখন তারা জঙ্গল থেকে পুলিশ খুঁজতে থানা ফাঁড়িতে চলে আসে।
হঠাৎ করে এত অল্প সময়ে কেন এই পরিবর্তন? তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বড়ে গাঁওয়ের আদিবাসী যুব নেতা “রবি টেইলর”–ছত্তিশগড়ের শ্রমজীবী মানুষের নয়নের মনি ছিলেন শংকর গুহ নিয়োগী।তিনি ভারতবর্ষের সংবিধান যে নাগরিক অধিকার দিয়েছে তারইমধ্যে থেকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতান্ত্রিক পথ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে অহিংস আন্দোলন করে মানুষের দুঃখ দুর্দশা যতটা দুর করা সম্ভব, তাই তিনি করতেন। যে কারণে ছত্তিশগড়ের কিছু বুদ্ধিজীবী তাকে বলত ছত্তিশগড়ের গান্ধী। শুধু সেই অপরাধে তাকে গুলি করে মারা হল। কোন অন্যায় করেননি–তবু মরতে হল। যারা তাকে মারল একজন অপরাধীরও কোন শাস্তি হল না। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার আন্দোলন-সরকারের পুলিশ আর শিল্প মাফিয়াদের গুন্ডারা বন্দুক দিয়ে দমন করল। এখন মানুষ যাবে তো কার কাছে যাবে? কার কাছে গিয়ে সে তার দুঃখ বেদনার কথা জানাবে? সরকার তো সাধারণ মানুষের কথা শোনে না। সে শোনে ধনবানদের কথা।
নিয়োগীজি মারা যাবার পর একটা বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। চারদিকে নেমে এসেছিল একটা দিক দিশাহীন অন্ধকার। মানুষ তখন একটা অবলম্বন চাইছিল। মানুষ তো বাঁচতে চায়। তো সেই শূন্যতা পূরণ করল নকশালরা। অন্ধকারে আলো হয়ে দেখা দিল–মুমুর্ষ মানুষের অবলম্বন হল। তারা নিয়োগীজির উদাহরণ তুলে মানুষকে দেখালো–দেখো, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিণতি কী হয়। অহিংস আন্দোলনের ভাষা এই সরকার বোঝে না। সে বোঝে বন্দুকের ভাষা। তাকে সেই ভাষায় বলল, ঠিক বুঝে যাবে। মার খাবার জন্য পিঠ পেতে রেখো না, মার তো অনেক খেয়েছো, এবার মারার জন্য বুক বেছে নাও। এমন লাঠি মারো যে পাঁজর ভেঙে যায়।
