–তাহলে খাও কী?
–হাওয়া খাই জল খাই, আর যারা আমাকে পছন্দ করে না তাদের খিস্তি খাই।
সেদিন আমি রবি শ্রীবাস্তবের কাছে সত্যি কথা বলিনি। সত্যি কী আর মানুষ জল হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে সত্যি এটাই যে তখন সংসার আর চলছিল না। দোকানে তো দু একটা পেন দু একটা খাতা ছাড়া বেচবার মত বিশেষ কোন মাল ছিল না। তবে আমার স্ত্রী অনু তখন নিজের চেষ্টাতে অঙ্গনওয়াড়ি শিক্ষাকেন্দ্রে একটা কাজ যোগাড় করে নিয়েছিল যাতে বাচ্চাদের চার ঘন্টা পড়াবার বিনিময়ে মাসে আড়াইশো টাকা ভাতা পেত। এই কাজটা করার জন্য তাকে রোজ সকালে দশ কিলোমিটার পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়ে ইরিকভুট্টা গ্রামে যেতে হতো। আর দুপুরের রোদে ফিরতে হতো দশ কিলোমিটার সাইকেলে। সেই পয়সায় চলছিল চারটে পেট। তবু একে নিশ্চয় হাওয়া বলা চলে না।
বলে রবি শ্রীবাস্তব–কোন চাকরি বাকরি করো না কেন? সংসারটা ঠিকঠাক রেখে বাদবাকি সময় দেশ জনগণ এসবের সেবা করলে ভালো হয় না?
-সে তো হয়, কিন্তু চাকরি পাবো কোথায়? আমার তো কোন সোর্স নেই। কে দেবে আমাকে চাকরি?
–আমি দিতে পারি। অবশ্য যদি তুমি করো, আমি তোমাকে একটা চাকরি দেবো। বলো করবে আমার কাছে চাকরি?
–আমি তো তেমন লেখাপড়া–মানে কোন ডিগ্রি নেই আমার।
–ডিগ্রি চাই না। আমি কাজ চাই।
–কী কাজ?
–তোমাকে সেই কাজই দেওয়া হবে যা তুমি পারো। করবে?
–একটু ভেবে দেখি তারপরে বলবো।
-–ঠিক আছে, সবদিক ভেবে দেখে তবেই বোলো৷ যেদিন বলবে তারপর দিনই কাজ। তবে আমার একটা শর্ত থাকবে–যতক্ষণ আমার কাজে থাকবে ইনকিলাব বলা চলবে না। তা যদি ইচ্ছা হয় আগে চাকরিটা ছেড়ে পথে এসে দাঁড়াবে–তারপর যত ইচ্ছা ইনকিলাব করবে।
আমার ভীষণ অভাব। কাজ তো আমার একটা দরকার। কী করব? কথা বলি নাজিব কুরেশি রত্নেশ্বর নাথ আর বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্তীর সাথে। এই তিনজন কাকেরে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। মোটামুটি ভাবে তিনজনের এককথা–চাকরি পাওয়াটা খুব কঠিন। তবে ছাড়া কোন কঠিন কাজ নয়। আগে তো ঢুকে পড়ো, তারপর দেখো। যদি ঠিক লাগে–করবে। অসুবিধা দেখোচলে আসবে। আমাদের তো তেমন কোন সুযোগ নেই, যাতে তোমাকে কোন সহায়তা দিতে পারব। ও যখন দিচ্ছে নিয়ে নাও। আপাতত টিকে থাকো, পরে যা হয় দেখা যাবে।
একদিন সকালে অবশেষে গিয়ে হাজির হলাম রবি শ্রীবাস্তবের বাড়িতে। কাকের বাসস্ট্যান্ডের উল্টোদিকেই বিশাল বাড়ি। কিছুক্ষণ বসার ঘরে অপেক্ষা করার পর সে একটা চিঠি লিখে আমার হাতে দিয়ে বলল–এটা নিয়ে ভানু প্রতাপপুরে চলে যাও। ইরিগেশান ডিপার্টমেন্টের এস.ডি.ও বার্মা সাহেবকে দেবে। কোর্টের পাশেই তার কোয়ার্টার। হয় সেখানে নয় অফিসে যেখানে থাকুক চিঠিটা দিয়ে বলবে কাল থেকে যেন কাজে লাগিয়ে নেয়। ওখানে কিছুদিন থাকো, সময় হলে আমি তোমাকে কাকেরে টেনে নেব। যাও।
রবি শ্রীবাস্তবের এক চেলা আমাকে বাসে তুলে দিয়ে কন্ডাক্টরকে বলে দিয়ে গেল–রবি ভাইয়াকা আদমি, কেরায়া মাৎ লেনা। কাকের থেকে ভানুপ্রতাপপুর আটটাকা বাসভাড়া সেটা বেঁচে গেল। তখন সকাল নটা বাজে, বার্মা সাহেবকে পেয়ে গেলাম তার কোয়ার্টারে। চিঠি দিলাম তার হাতে, বললাম–রবি ভাইয়া বোলা কাল সে কাম মে রাখ লেনে কা। বর্মা সাহেব চিঠি পড়লেন। ভুরু কুঁচকে আমাকে দেখলেন তারপর বললেন–এক কাম করো, তোম এক তারিখ কো আ জানা। রবিজিকো যো ভি বাতানা হোগা ম্যায় বাতাদুঙ্গা।
রবি শ্রীবাস্তব বলেছিল আমি যেদিন আসব তার পর দিন থেকে কাজ। আর বর্মা সাহেব বলছে এক তারিখ। এর মানে পনের দিন পর। মাত্র পাঁচটা মিনিট দেরি হয়েছিল বলে পাখানজুরের কাজটা পাইনি। পনের দিন পরে কী হবে তা কে জানে! বর্মা সাহেবের হার্ট এ্যাটাক আসতে পারে, রবি শ্রীবাস্তব মার্ডার হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা আমার সেদিন আসার জন্য বাস ভাড়া না-ও থাকতে পারে। তাই কাতরতা ফুটে ওঠে আমার গলায়। বর্মা সাহেবকে বলি রবি ভাইয়া কালসে লাগালেনেকা বোলা।
ওতো চিঠিমে ভি লিখা। বলে বর্মা সাহেব–মাহিনাকা বিচমে কেইসে ভাউচার বনেগা! এইসা তো নেহি হোতা না। তোম এক তারিখ কো আও।
আমি বাড়ি গেলাম না। ফের ফিরে গেলাম কাঁকেরে। আবার গিয়ে দেখা করলাম রবি শ্রীবাস্তবের সাথে। বর্মা সাহেব যা বলেছে জানালাম তাকে সব। তারপর রবি শ্রী বাস্তব আবার আর একখানা চিঠি লিখে আমাকে দিয়ে বলল–গিয়ে এই চিঠি বর্মা সাহেবকে দিয়ে বলবে, রবি ভাইয়া বলেছে, কালই এক তারিখ। আর পেমেন্ট শিটও পুরা তিরিশ দিনের হবে। আবার সেই চিঠি নিয়ে বর্মা সাহেবকে দিলাম। চিঠি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। সম্ভবতঃ সেটা নিজের উপর ধিক্কারে। একজন সরকারি অফিসার তিনি। বলে দিয়েছিলেন–এক তারিখ। এখন সেই নিজের ফেলা থুতু আবার নিজে চেটে নিতে হবে। কী জঙ্গলের রাজত্ব। এক গুন্ডার কথায় তাকে চলতে হচ্ছে। উনি আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন না। মনে হয় তাকাতে পারছেন না। মাথার উপর দিয়ে চেয়ে আছেন দূর আকাশের দিকে। সেই ভাবে বলেন তিনি–বাড়ি চলে যাও। কাপসীতে থাকো তো? সেখানেই চলে যাও। আর কাকের যাবার দরকার নেই। মনে কর কাল থেকে তুমি কাজে লেগে গেছে। কিন্তু আসবে সেই এক তারিখেই।
