এখন তার প্রশ্নের ধরন দেখে বুঝতে পারি–কোন হালকা, চটুল, চট জলদি উত্তর দিয়ে তার জিজ্ঞাসাকে শান্ত করা যাবে না। সে চেষ্টা করাটাও সঠিক নয়। তাই ধীরে ধীরে একজন শিক্ষকের মত কথা বলা শুরু করি। সতর্ক থাকি কোনভাবে যেন মাথা গরম করে না ফেলি। তাহলে কোন ভুল পথে চলে যাব। জগদীশমিশ্রার উস্কানিমূলক বাক্য গায়ে না মেখে বলি-বাঙালী মানসিকতাটা বুঝতে হলে আপনাকে সেই অবস্থার মধ্যে গিয়ে পড়তে হবে। না হলে বোঝা যাবে না।
রবি শ্রীবাস্তবের চোখে চোখ রাখি–আচ্ছা সাহেব, আপনি এই কাকের শহরে থাকেন। এটা কলকাতা বোম্বাই দিল্লীর মত বড় শহর নয়। এই মাটি জল হাওয়ায় আপনি বড় হয়েছেন। এখানকার সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আপনার অনেক সুখ দুঃখের গভীর স্মৃতি। তা ধরুন আপনাকে এখান থেকে উৎখাত করে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হল অবুঝ মাড় বা অন্যকোন গহীন জঙ্গলে আদিবাসী মানুষদের মাঝখানে। সেখানে আপনাকে পাঁচসাত একর ককর পাথর মেশানো জমি দেওয়া হবে। যে জমিতে বৃষ্টির জল ছাড়া চাষ হবে না। চাষ হলেও তেমন ফসল হবে না। সেখানে আপনাকে থাকার জন্য একটা ঘর দেওয়া হবে, গরু দেওয়া হবে, এখানকার রিফিউজিরা যাযা পেয়েছে সব দেওয়া হবে। আর সেখানে পাহারা বসিয়ে বাধ্য করা হবে আপনাকে থাকতে। বলে দেওয়া হবে আপনি কোনদিন কাকেরে আসতে পারবেন না। পারবেন সেখানে থাকতে? আর যে আপনাকে এই রকম জীবন যাপনে বাধ্য করেছে যদি বলা হয় তাকে ভালোবাসো তার কথা শোনো সে তোমার বন্ধু, মানবেন সে কথা? পারবেন ভালোবাসতে?
আপনি এক বছর জেলা বদর হয়েছিলেন। নিজের মাটি নিজের মানুষ থেকে দূরে থাকার যে যন্ত্রণা তাতে আপনার অজানা নয়। বাঙালীরা পঁচিশ তিরিশ–কেউ কেউ তার চেয়েও বেশি বছর “দেশ বদর” প্রদেশ বদর হয়ে রয়েছে। এর জন্য তারা কংগ্রেস পার্টিকেই দায়ী বলে মনে করে। কংগ্রেসের নেতারা যদি দেশ ভাগের শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাবে রাজি না হতো, তাদের জীবনে এত বড় দুর্ভোগ কখনই আসত না। এই কারণে তারা কংগ্রেসকে ভোট দেয় না। কংগ্রেসের প্রতি তাদের এই কারণে যেমন রাগ, মুসলমানদের উপরেও একই কারণে রাগ-তারা দেশভাগের দাবি তুলে দাঙ্গা করেছিল। সেই আতঙ্কে এরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেই রাগ তাদের কোনদিন যাবার নয়। যে কারণে কিছু না করা সত্বেও এরা বিজেপিকে ভোট দেয়। কিছু না করাটাই তাদের একটা গুণ হয়ে গেছে।
–কিন্তু তাদের এই সমর্থন তো দেশের পক্ষে একটা আরও বড় বিপদ হয়ে আসছে। যে পথে বিজেপি চলছে দেশটা তো আর একবার ভাগ হয়ে যাবে। তোমার কী মনে হয়?
বলি আমি–সেই কথাগুলো ধৈর্য ধরে বাঙালীদের কে বোঝাবে? বোঝাবার জন্য কেউ তো তাদের কাছে কোনদিন যায়নি। যায় শুধু একবার ভোটের সময়। অন্যদলের কথা জানি না তবে বাঙালীদের বিজেপি মোহ থেকে মুক্ত করতে সব চেয়ে সুবিধাজনক স্থানে ছিল সিপিএম পার্টি। যদি তাদের হাতে ওই রক্তের দাগটা না থাকত। তারা মরিচঝাঁপিতে যে ঘটনা ঘটিয়েছিল তা আজও মানুষের মনে দগদগে হয়ে আছে। সে দাগ সহজে মুছে যাবার নয়।
–তাহলে কী চিরদিনের জন্য ওই সিট বিজেপির থেকে যাবে?
–না, তা হবে না। শুধু সেই কটা দিন—যতদিন দেশভাগ আর আর মরিচঝাঁপির ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো মরে মুছে না যায়। এরপর যে নতুন প্রজন্ম আসবে–যারা ওই দুটো দ্বারা প্রভাবিত নয়, তাদের মধ্যে যদি যত্ন আর ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা চালানো হয় আগামীতে বিজেপির হাত থেকে ওই সিট কেড়ে নেবার একটা পথ হলেও হতে পারে।
এরপর কারও মুখে কোন কথা নেই। সব চুপ। ওরা আমার চেহারা পোষাক দেখে যতটা অজ্ঞ ভেবেছিল ততটা যেনই সে প্রমাণ করে দিয়েছি। তখন আবার বলি–নিয়োগীজি পারালকোট থেকে মাত্র একশো মাইল দূরে থাকতেন। উনি যাননি। যাননি বললে ভুল হবে, গিয়ে সব দেখে শুনে ফিরে এসেছিলেন সেই বাহাত্তর তেহাত্তর সালে। উনি তখন বুঝেছিলেন যে বর্তমান সময়ে বাঙালীদের যে মানসিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, তাদের এই মুহূর্তে সমাজ বদলের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করা অসম্ভব। এদের যা হোক আর যেমন হোক একটা ঠিকানা তো হয়েছে। কিন্তু মানসিক পুনর্বাসন হয়নি। যেখানে তার বাস সেই সমাজ সংস্কৃতির সঙ্গে তার গভীর নিবিড় কোন যোগ নেই। তাদের এখানকার মানুষ মাটি পাহাড় জঙ্গলের প্রতি কোন টানও নেই। এদের ঘুমে জাগরণে একটাই আশা একটাই স্বপ্ন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। সে স্বদেশ বাংলাদেশ। আর নিয়োগীজির স্বপ্ন ছিল শোষণ মুক্ত এক নয়া ছত্তিশগড়ের নির্মাণ। নয়া ভারতের জন্য নয়া ছত্তিশগড়ের নির্মাণ। তাই নিয়োগীজি আর পারালকোটের বাঙালীদের মধ্যে কোন সেতু তৈরি হয়নি। তা যদি হতে পারত তাহলে নারানপুর বিধানসভায় বিজেপি জিততে পারত না। সে-ই জিততে নিয়োগীজি যাকে জেতাতে চাইতেন।
তারপর আলোচনা অন্যদিকে বেঁকে যায়। সে আলোচনায় ছত্তিশগড়ের বিকাশ নকশাল সমস্যা, এন.জি.ওদের ভূমিকা নানা বিষয় উঠে আসে। এভাবেই রাত ফুরিয়ে যায়। তখন বলে রবি শ্রীবাস্তব–দেশ দুনিয়ার তো অনেক কথা হলো, এবার তোমার নিজের কথা কিছু বলো। কাজকর্ম কী করো, সংসার খরচ কী করে চলে?
বলি–চলে না।
–তার মানে!
–চলে না, এর মানে তো চলে নাই হয়।
