এই সময়–যখন আমরা ককেরে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, তখন রবি শ্রীবাস্তব এখানে ছিল না। চেম্বার অফ কমার্সের অধ্যক্ষ-কাকের শহরের “রতন টাটা” বর্মা লাল খটবানিকে শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগে কোর্টের বিশেষ আদেশে এক বছরের জন্য “জেলা বদর” সাজা খাটছিল। সম্প্রতি তার সাজার সময় সীমা পার হয়ে গেছে তাই ফিরে এসেছে নিজের পুরাতন ঘাটিকাকেরে।
রবি শ্রীবাস্তব এখন আমাকে ডাকছে। শারীরি ভাষ্যে বোঝা যাচ্ছে চা বিস্কুট খাওয়াবে বলে ডাকছে না। এরই প্রধান শাগরেদকে জেলখানায় পাঠানোয় একটা বড় ভূমিকা ছিল আমার। যে কারণে আমার উপর রাগ থাকা স্বাভাবিক। এখন এই রাতে যদি মারে আমাকে কে বাঁচাবে?
এই ভাবনা মনের মধ্যে স্থায়ী হয়েছিল মাত্র পাঁচদশ সেকেন্ড। পরক্ষণে স্থির করে নিলাম–পালাব না। ডাকছে যখন সামনেই যাব। জীবনে এমন অনেক ঘটনা আছে যার সামনে সাহস করে গিয়ে দাঁড়াতে পেরেছিলাম বলেই জয়ী হয়েছিলাম। আর আজ যদি পালাই সে পলায়ন তো শুধু এই সময়ের মধ্যে এই স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না একটা চিরস্থায়ী মানসিক পলায়নের চিহ্ন হয়ে যাবে। যা আমার সুনামের গায়ে কালো দাগ হয়ে থাকবে। আমি বস্তার জেলায় রাজনীতি করি। আমার কর্মাঞ্চলে যে কোন সমস্যা তা নিয়ে শেষ লড়াই লড়তে হবে তো এই কাঁকেরে এসেই। যা কিছু সরকারি দপ্তর সবই তো এখানে। তখন তো সবল ও আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। তাহলে তখন যদি দাঁড়াতে পারি–এখন পারব না কেন? এখন না পারলে তখন পারব কী করে? কী করতে পারে ওরা এখন আমার? খুব বেশি হলে মারবে। কিন্তু তারপর? কাল কী হবে? কাল যখন মসজিদ ময়দান থেকে গর্জন উঠবে তার বিরুদ্ধে, কোথায় যাবে সে? যাতে আমার লোকসানের চেয়ে লাভের পাল্লা ভারি হবে। বস্তার জেলার আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করে আর একটি সংগঠন–ভারত জন আন্দোলন। এর অধ্যক্ষ ড. ব্রহ্মদেও শর্মা। তার কাজে বিজেপির স্থানীয় নেতারা বেজায় খাপ্পা। তারা একদিন জগদ্দলপুরে ওনাকে ধরে জামা কাপড় সব ছিঁড়ে দেয় আর আন্ডার ওয়ার পড়িয়ে গায়ে গোবর জল ঢেলে শহরময় ঘোরায়। সে ছবি পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়ে যায়। আর তখন সারা দেশে ছিঃ ছিঃ ধ্বনি ওঠে। দিল্লীতে স্বামী অগ্নিবেশের নেতৃত্বে চারশো জন বুদ্ধিজীবি পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ দেখায়। যারা কোনদিন ব্রহ্মদেও শর্মার নাম জানত না তারাও জেনে যায়। তখন অটল বিহারি বাজপেয়ি দলের কর্মীদের এহেন আচরণে ক্ষমা চেয়ে নেন। যারা মেরে ছিল তারা নয়, জয়ী হয় সে যে মার খেয়েছিল। রাজনীতিতে কখনও কখনও মারার চেয়ে মার খাওয়া বেশি লাভদায়ক হয়। তাই দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাই রবি শ্রীবাস্তবের সামনে–বোলিয়ে ক্যা বাত হ্যায়, কাহে বুলা রহে হামকো?
–তেরা নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী?
–জি হা, মেরা হি নাম।
–কাপসী রহতা হ্যায়?
–জি, রহতা হু।
সেই গরগর করা গলায় বলে সে–ইতনা রাত কো ইহা ক্যা কর রহা।
–ও তো আপ দেখহি রহে হ্যায় ক্যা কর রহা হু।
সুশীল শর্মা মাথা নিচু করে মুখ টিপে হাসছে। এই সবকিছুর নাটের গুরু সে-ই। রবিশ্রীবাস্তবকে আমার পিছনে ও-ই লেলিয়ে দিয়েছে। আমার বিষয়ে যা কিছু তথ্য সে-ই যোগান দিচ্ছে। অন্য যারা বসা সবার চোখে নাচছে কৌতুক। আমার হেনস্থায় তারা বড় মজা পাচ্ছে। তবে আমিও বরিশালের বাঙাল। জানি, আমি যত ভয় পাবো ওরা তত মজা পাবে। তাই ভয় পাওয়া আমার চলবে না।
জানতে চায় রবি শ্রীবাস্তবকেইসে? তুম কোহলিয়া কো জেলমে ভেজা থা?
মাথানাড়ি আমি-না।
–না? ভানুপুরীতে মিটিং কে করেছে, ভাষণ কে দিয়েছে? কোর্টের সামনে ধর্নায় কে বসেছে?
–আমি।
–তাহলে কে পাঠাল ওকে জেলে?
খুব ধীরে ধীরে শান্ত মাথায় ঠান্ডা গলায় প্রতিটা বাছাই করা শব্দের উপর সতোর জোর দিয়ে অবিচলিত ভাবে বলি–সাহেব, আমি কোন কোহলিয়া মোলিয়াকে চিনি না। আর চিনতে চাইও না। একটি আদিবাসী মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। যে ধর্ষণ করেছে সে অন্যায় করেছে। তার শাস্তি হওয়া উচিৎ। সেই জন্যে আমি লড়েছি। এবং আবারও যদি এমন ঘটনা ঘটে আমি আবারও লড়ব। নিয়োগীজি আমাদের সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন। সমাজে দুর্বল অসহায় মানুষের পাশে যদি না দাঁড়াই তবে রাজনীতি করব কেন?
এবার রবি শ্রীবাস্তব আমাকে এবং আমার সঙ্গীদের বসবার জন্য চেয়ার দেন। চা আনায়। উইলস সিগারেটের প্যাকেট সামনে বাড়িয়ে দেয়। গলার স্বর চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে আসে। বলে–আচ্ছা দাদা, একটা জিনিস কিছুতে আমার মাথায় আসে না, একটু বুঝিয়ে বলো তো, পারাল কোটে যত বাঙালী আছে সব তো বাংলাদেশের লোক। মুসলমানরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। কংগ্রেস সরকার তাদের এখানে নিয়ে এসেছে। ঘরবাড়ি জমি জায়গা সব কিছু দিয়েছে। তবু বাঙালীরা কংগ্রেসকে কেন ভোট দেয় না? নারানপুর বিধানসভার সিটে বারবার আমরা হেরে যাই। আর কিছু না করে বিজেপি জিতে যায় এটা কেন?
রবি শ্রীবাস্তবের পিছনে বসা জগদীশ মিশ্রা আমাকে তাতিয়ে দেবার চেষ্টায় বলে-বাঙালী লোকেরা স্বভাবে বেইমান। তারা যে থালায় খায় সেই থালায় ছিদ্র করে। রবি শ্রীবাস্তব মাস্তান বা গুন্ডা হলেও মাথা মোটা–অশিক্ষিত মুখ লোকনয়। রবি শংকর বিশ্ব বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র। সবাই বলে সে যদি জেলা বদর না হতো বস্তারের জেলাশাসক হতে পারত। ওই একটা কালোদাগ তার সরকারি চাকরির পথে বাধা হয়ে গেছে। তবে সে একদিন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতায় কাঁকের নগর পালিকা পরিষদের অধ্যক্ষ হয়ে গিয়েছিল। সে কিছুদিন পরের কথা। আর তার কিছুদিন পরে মাওবাদীদের হাতে মার্ডার হয়ে যায়।
