আমরা বরদে ভাটা নামক স্থান যেখানে একতা পরিষদের অফিস, সেখান থেকে পোষ্টার মারা শুরু করে, পাকা রাস্তা ধরে এসে দুধ নদীর ব্রিজ পার হয়ে বাসস্ট্যান্ড তারপর মসজিদ ময়দান পিছনে ফেলে চলে গিয়েছিলাম শহরের আর এক প্রান্ত পাঞ্জাবি ঢাবা পর্যন্ত। প্রায় মাইল চারেক লম্বা পথের দু পাশের দালান দেওয়ালে, আগামী কাল বিকেল চারটেয় সমাবেশের বার্তা জানিয়ে পোষ্টার লাগিয়ে আমরা যখন ফিরে আসছিরাত তখন প্রায় দুটো। তখন দেখি, বাসস্ট্যান্ডে ঢোকার ঠিক মুখটায় যে ডেকরেটস দোকান সেখান থেকে খান আট দশেক চেয়ার নিয়ে ফুটপাতে পেতে বসে আছে আট দশজন লোক। এরা সব সঁকের কংগ্রেসের কর্মী। কালভোরে এরাও গান্ধীজির জন্য কিছু একটু করবে বলে ভেবে রেখেছে। কমপক্ষে বাসস্ট্যান্ডে একটা পতাকা দুটো ফুল একটু শ্লোগান টোগান। রাত্রে বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়লে ভোরে যদি ঘুম না ভাঙে–সেই ভয়ে রাত জাগছে। সকালে পতাকা টতাকা তুলে একবারে গিয়ে শোবে। এদের মধ্যে একজন লোক–যার আফ্রিকান বক্সারের মত চেহারা। সে হাত তুলে ভারি গলায় আমাদের ডাকল–এ ইধার আ। ডাকের ভঙ্গিটা আমার কাছে বড় অপমানজনক–তুচ্ছ তাচ্ছিল্য বলে মনে হল। থানার অফিসারও আমাকে আপনি বলে। কিন্তু কে লোকটা? সে আমাদের ডাকছে কেন? আমরা কোন অন্যায় করছি না। পোষ্টার মারছি। মারতেই পারি–শহর তো কারও বাপের সম্পত্তি নয়। তাহলে? আমাদের সাথের একটা ছেলে লোকটাকে চেনে। সে ভীত গলায় বলে–দাদা চলো ভাগ চলো। এ আদমি শহরকা সবসে বড়া ‘দাদা’। রবি শ্রীবাস্তব নাম উসকা। অরবিন্দ নেতমকা ডায়া হাত।
ছত্তিশগড়ে দাদা শব্দের অর্থ মাস্তান বা গুন্ডা। আর অরবিন্দ নেতাম হচ্ছে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী। আগে ইন্দিরা গান্ধীর বড় স্নেহভাজন ছিল। এখন রাজীব গান্ধীর। বড় বড় চোখ, কালো আর দৈত্যাকার চেহারার এই লোকটাকে ভয় না পায় এমন লোক এই শহরে একজনও নেই। আমি রবি শ্রীবাস্তবের নাম শুনেছি, দেখছি এই প্রথম। রবি শ্রীবাস্তবও আমাকে চাক্ষুস দেখেনি। ছবিতে দেখেছে খবরের কাগজের পাতায়। অমৃত সন্দেশ পত্রিকার সাংবাদিক সুশীল শর্মা–যে আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিল, সেও এখানে বসে আছে। সে-ই রবি শ্রীবাস্তবকে বলে দিয়েছে–ওই যে সেই মনোরঞ্জন ব্যাপারী। তারই ফলে ওই ডাক-ইধার আ।
অরবিন্দ নেতামের ডান হাত রবি শ্রীবাস্তব আর তার ডান হাতের নাম কোহলিয়া। কোহলিয়া শব্দের অর্থ শেয়াল। তার আসল নাম জিতেন্দ্র সিং। কাকের রোডওয়েজের সুপার ভাইজার এই জিতেন্দ্র সিং একখানা ছোটগাড়ি নিয়ে শেয়ালের মত জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। বাসের ড্রাইভার কন্ডাক্টর কিছু বোঝার আগে সে জঙ্গল থেকে শেয়ালের মত ক্ষিপ্রতায় বের হয়ে বাসের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বাসে উঠে চেকিং করে কোন যাত্রীর কাছ থেকে পয়সা নিয়ে টিকিট দেওয়া হয়নি। এখানকার আইন একটু অন্যরকম, বিনা টিকিটে যাত্রী ধরা পড়লে, যাত্রীর নয়, জরিমানা দিতে হবে কন্ডাক্টটরের। এরাই তার নাম দিয়েছে কোহলিয়া। কোহলিয়া রবি শ্রীবাস্তবের সাথে পার্টনারশিপে কন্ট্রাকটারিও করে। বাধ ব্রিজ রাস্তা, রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে এরা কন্ট্রাক্ট নিয়ে অন্য কাউকে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে দেয়। কোহলিয়ার আর একটা শখ নারী শিকার। যদি জঙ্গল পথে একা কোন আদিবাসী যুবতী পেয়ে যায়-তার উপর শেয়ালের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। বোকাসোকা আদিবাসী জানে না এমন অবস্থায় কার কাছে গেলে ন্যায় বিচার পাবে। পুলিশ তো তাদের কথা শোনে না। প্রভাবশালী পয়সাঅলারা যা বলে তা-ই শোনে।
এখানে একটি ঘটনার কথা বলা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বস্তার জেলায় পিপলস ওয়ার গ্রুপ সর্বপ্রথম যে ল্যান্ডমাইনটির বিস্ফোরণ ঘটায় যাতে আঠার জন পুলিশ কর্মী একজন ড্রাইভার ও অন্য একজন মারা যায়–যা নিয়ে আমার গল্প “পথ যেখানে পৌঁছাল”তার সূত্রপাত হয়েছিল একটি ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এক ধর্ষিতা আদিবাসী কন্যা গর্ভস্থ সন্তান নিয়ে পুলিশের কাছে সুবিচার চাইতে গিয়েছিল। বিচার পায় না, বিদ্রূপ পায়। এরপর সে চলে যায় “দাদা”দের কাছে। তারা এসে ধর্ষককে গুলি করে মেরে দেয়।মৃতের ভাই থানায় যায়। এবার কিন্তু পুলিশ আসে। আসবে যে সে যারা জানত তারা পথে ল্যান্ডমাইন পুতে রাখে। আর তাতেই–। আমি অবশ্য এ সব পত্র পত্রিকায় পড়েছি সত্যি কী তা জানিনা।
তবে এটা সত্যি যে ভানপুরী নামে একটি আদিবাসী গ্রামের মেয়ে ক্লাশ নাইনের ছাত্রী দময়ন্তী বিকেল বেলা একা স্কুল থেকে ফিরে যাচ্ছিল, বাড়িতে রোজ যেমন যায়। সেদিন তার দুই সঙ্গী নিয়ে দময়ন্তীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কোহলিয়া। জোর করে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে ছিল দূরে-ঘন জঙ্গলে তিনজনে সারা রাত ধর্ষণ করে অর্ধচেতন অবস্থায় তাকে ভোর বেলায় নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল গ্রামের কাছে। প্রতিবারই ওরা এসব করে পার পেয়ে গেছে। ভেবেছিল এবারও বিশেষ কিছু হবে না। দময়ন্তীর বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। সে মেয়েকে নিয়ে থানায় যায়। কিন্তু থানা কোহলিয়ার নাম শুনে আর কেস নেয় না। শিক্ষককে পরামর্শ দেয় কোন ঝামেলা না
পাকিয়ে চেপে যান। কারণ তাতে ঝামেলাই হবে–কোন লাভ হবে না। তখন দময়ন্তীর বাবা যায় রত্নেশ্বর নাথের কাছে।নাথ তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় অবশ্যই দময়ন্তী ন্যায় বিচার পাবে। এর জন্য সে ব্যাপক গণআন্দোলন সংগঠিত করবে। যতক্ষণ ধর্ষণকারী গ্রেপ্তার না হয় আন্দোলন জারি থাকবে। এবং সে তাই করে। আমাকেও খবর পাঠানো হয়। খবর পেয়ে আমি এসে এই আন্দোলনে যোগ দেই। কাঁকেরে মিছিল করা হয় মিটিং করা হয় এবং থানা ও কোর্টের সামনে ধর্ণায় বসি। ছত্তিশগড়ের সবকটা দৈনিক পত্রিকার কল্যাণে “দময়ন্তী বলকার কাণ্ড” জেলার এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হয়ে যায়। আমাদের আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত পুলিশ কোহলিয়াকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়।
