বলি–আমার সংসারে খুব অভাব। একটা কাজ মানে একটা মুনশির কাজ পাবার জন্য তার সাথে দেখা করতে চাচ্ছি।
আমার কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন বৃদ্ধ ইনচার্জ। তারপর ধীরে ধীরে বলেন-মুনশির কাজ চাও। যার মজুরি দিনে তিরিশ টাকা!
আমার কাছে তিরিশ টাকাই এখন বিরাট। এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন বৃদ্ধতার জন্য তুমি এম.এল.এর চিঠি কেন নিয়ে আসতে গেলে।সরাসরি আমাকে এসে বলতে, আমি লাগিয়ে নিতাম। এখানকার পাঁচ সাতটা ছেলেকে আমি রেখেছি। আমার কাছে না এসে চলে গেছো এম.এল-এর কাছে। এম.এল.এ-র চিঠির কথা শুনেই তো ভয়ে, কিনা কী ভেবে কে জানে, ঠিকাদার সাহেব সাইডে আসার দিনক্ষণই বদলে দিল। মারবে মশা, দেগে দিয়েছে কামান।
কাতর হয়ে বলি–তা আপনি যখন পারেন, আমাকে কাজে লাগিয়ে নিননা চাচা। আমি এই কাজটা আগেও করেছি। আমি বাইরের লোক, এখানে এসে বড় বিপদে পড়ে গেছি। ঘরে চাল ডালের সমস্যা। দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে আমার।
আর কি লাগাব? হতাশা ঝরে পড়ে তার গলায় লাগিয়ে আর হবেটা কী? এখানকার কাজ তো শেষ আমাদের। সব মালপত্র নিয়ে সামনের সপ্তাহেই তো আমরা নাঁদগাও চলে যাব।
বলি–তাহলে আমাকে নাঁদগাও নিয়ে চলুন। আমি ওখানে যেতে রাজি আছি।
বলেন তিনি–পাগল নাকি। এখানে কাজ চলছিল তাই পাঁচ সাতটা লোকাল ছেলে রাখা হয়েছিল। এখান থেকে লোক নিয়ে গেলে নাঁদগাওয়ের লোক কী করবে? লোকাল লোক সাথে না রাখলে ভালোভাবে কাজ তুলতে পারব? সব ঝামেলা পাকাবে না?
আমার আর তখন বলার মত কোন কথা, করার মত কোন কিছু রইল না। রইল শুধু হাতে ধরা একখানা এম.এল.এ সাহেবের চিঠি। যা একদিনের ব্যর্থ প্রয়াসের একটা সকরুণ স্মৃতি বাহক।
.
কী ভাবে যে একটা বছর কেটে গেল তা জানি না। তবে কেটে গেল। একদিন কাঁকেরের রত্নেশ্বর নাথ আমার কাছে খবর পাঠালেন-ব্যাপারীজি বহুত জরুরি কাম হ্যায়, আপ জিতনা জলদি হোসকে কাকের আইয়ে। আপ আনে পর মার্গ ব্যায়কা সারি খর্চাকা প্রবন্ধ ম্যায় উঠাউঙ্গা। তাই যেতে হল কাঁকেরে। তখন বলেন তিনি–এবার একতা পরিষদ ২রা অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন কাকেরের মসজিদ ময়দানে জল জঙ্গল জমিন হো জনতাকে অধীন এই দাবিকে সামনে রেখে একটা সমাবেশ করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে সমাবেশে শহীদ শংকর গুহ নিয়োগীকে স্মরণ করা হবে। এই সমাবেশে যোগ দিতে দিল্লী থেকে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশনের অধ্যক্ষ পি.ভি. রাজগোপালন আসবেন। এই সমাবেশ সফল করার জন্য আপনার সহযোগিতা চাই।
বহু গণ সংগঠনের মত একতা পরিষদও ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার একটি সহযোগী দল বা সংগঠন। মূলতঃ এরা বস্তার জেলার আদিবাসী সমস্যা নিয়ে মিটিং মিছিল সভা সমাবেশ করে থাকে। কাঁকের শহরের আশেপাশের কিছু অঞ্চল এদের ভালো কর্মী সমর্থক আছে। যে কারণে এরা এই শহরে যে কোন দাবি দাওয়ার জন্য প্রচুর জনসমাবেশ করতে পারে। যা কোন ভোট রাজনীতির পার্টি পারে না। এরা গত ২৮শে সেপ্টেম্বর নিয়োগীজির মৃত্যুর দিন ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার–”শহীদ দিবস” পালন সমাবেশে যোগ দিতে দল্লী গিয়েছিল। আমরা যারা বস্তার জেলার নিয়োগী অনুগামী–তাদের একতা পরিষদের কার্যসূচিতে সক্রিয় অংশ নেবার একটা দায় অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের মধ্যে এসে গেছে। কথা কিছুটা ২৮শে সেপ্টেম্বর হয়েছিল। তখনই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। দুদিন পরে বিধিবদ্ধ আমন্ত্রণ পত্র এসে গেল।
আমি কোন নেতা নই। সে আমি কোনদিন হতেও পারব না। একদিন বলেছিলাম সে কথা ডাঃ শৈবাল জানাকে–আমি সেনাপতি নই। সেনাপতি হবার দক্ষতা যোগ্যতা কোনটাই আমার নেই। আমি একজন সৈনিক-ভালো সৈনিক। আমার কাজ শুধু সেনাপতির নির্দেশ পালন করা। সঠিক বেঠিক সফল বিফল সব দায় থাকবে তার। আমার নয়। নিয়োগীজি ছিলেন সেই সেনাধ্যক্ষ। ওনার অবর্তমানে আমার অবস্থা হাল ভাঙা পাল ছেঁড়া কান্ডারি বিহীন নৌকো যাত্রীর মতো। রত্নেশ্বর নাথ একজন দক্ষ সংগঠক। কিন্তু আমার নেতা হবার মতো তার কোন গুণ নেই। আর মতাদর্শের ক্ষেত্রে রয়েছে আকাশ পাতাল প্রভেদ। আমি একজন মার্কসবাদের ছাত্র বলে মনে করি নিজেকে। আর তার সব আন্দোলনের প্রেরণা মহাত্মাগান্ধী। সে মঞ্চে বসে বক্তৃতা দেয় আমি মিছিলে হাঁটি। সে থানা তহবিল কোর্টের সামনে গিয়ে ধর্না দেয় জেলে যাবার জন্যে। আর আমি না যাবার জন্যে লুকিয়ে থাকলে পুলিশ খুঁজে ধরে নিয়ে যায়।
তবু রত্নেশ্বর নাথ যখনই আমাকে ডাকে কাকের যাই। আগেও এসেছি, আজও এলাম। না এসে আর যাবই বা কোথায়। আর কেউ তো এ জেলায় নেই যে নিয়োগীজির আন্দোলনের শরিক হয়েছে। তা ছাড়া লোকটা তো লড়ছে আদিবাসী মানুষদের জন্যে।
আমি আগেই বলেছি–নেতা নই। একজন অনুগত কর্মী। প্রয়োজনে বক্তৃতা দিই, প্রয়োজনে পোষ্টার মারি। সেদিন ১ অক্টোবর রাতে সাত আটজন আদিবাসী ছেলেকে সাথে করে তাই করছিলাম। সারা শহরময় পোষ্টার মারছিলাম। এই শহরটা খুব বেশি বড় নয়। আর খুবই ছিমছাম সজাগ আর প্রাণচঞ্চল। এমন প্রাণবন্ত শহর আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। এ শহর সারারাত জেগে থাকে, একটুও ঘুমায় না। রাতভর এখানে সব দূর পাল্লার বাসগুলো এসে থামতে থাকে। যাত্রীরা নামে–ওঠে। তাদের জন্য জেগে বসে থাকে বাসস্ট্যান্ডের হোটেল রেস্টুরেন্ট ও অন্য দোকান পাট।
