বড় আশা ভরসার কথা। এতে মনটা নেচে ওঠা খুব স্বাভাবিক। পরের দিন নাচতে নাচতে পৌঁছালাম রামপালের ফ্ল্যাটে। ঘন্টা খানেক বসে থাকতে হল। বেলা নটার আগে তাকে কাঁচা ঘুম থেকে তোলা বারণ। জেগে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে, চাফা খেয়ে সাড়ে দশটা নাগাদ মোটর সাইকেলে চাপতে পারলেন রামলাল। আমি বসলাম পিছনের সিটে। সুরিন্দর ঠিকাদারের ফ্ল্যাটে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু পাঁচ মিনিট তো অনেক সময়, কখনও কখনও পাঁচ সেকেন্ড সময়ের ব্যবধান মানুষের জীবনে পাহাড় প্রমাণ সমস্যার সৃষ্টি করে দিতে পারে। আমার তাইহল। মাত্র ষাট সেকেন্ড আগে সুরিন্দর সিং জিপ নিয়ে সাইডে বের হয়ে গেছে। বলে সুরিন্দরের স্ত্রী। কোন সাইড? তার কি কোন ঠিক আছে। নাঁদগাও, ডোন্ডি, পাখানজুর, পরতাপপুর, চার জায়গায় চারটে সাইড চলেছে। সে কোন সাইডে গেছে তা বাড়ির বউ কী করে জানবে? বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম মোর্চার অফিসে।
পরের দিন আবার গেলাম রামপালের কাছে। আজ আর সে আমাকে নিয়ে সুরিন্দরের কাছে যেতে পারল না। তাকে বিশেষ জরুরি কাজে এখনই রায়পুরে যেতে হবে। হাতে মোটেই সময় নেই। মোর্চার অফিসে ফিরে গিয়ে জনকলাল ঠাকুরেরও দেখা পেলাম না। তিনি গেছেন তার নির্বাচন ক্ষেত্র ডোন্ডি লোহরার কৃষকদের নিয়ে জেলা শাসকের দরবারে কি এক দাবি সনদ পেশ করতে।
পরের দিন দেখা হল রাত দশটায় বিধায়কজির সাথে। শুনলেন আমার সব কথা। খুবই দুঃখ পেলেন তিনি। তারপর বললেন–এক কাজ করুন, এত কষ্ট করে আর আপনার এখানে ফালতু ফালতু পড়ে থাকার দরকার নেই। রামপাল রায়পুর থেকে নাগপুরে যাবে। ওর ফিরে আসতে সময় লাগবে। আমি আপনাকে একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। সাইডে গিয়ে চিঠিটা সুরিন্দরকে দেবেন। কাজে লাগিয়ে নেবে।
সেদিন আর বাড়িতে ফিরে আসব কী করে? বাস কই? ফিরলাম তার পরের দিন। দল্লী থেকে কাপসী আসতে দিনদুপুর। চান করে দুটো নাকে মুখে গুঁজে রোদ মাথায় করে ছুটলাম পাখানজুর সাইডে। এগারো আর দুই তের কিলোমিটার পথ সাইকেলে পার হতে ঘেমে নেয়ে একশা। ঘড়িতে সময় তখন বেলা চারটে। সদ্য নির্মিয়মান সারা রাস্তা জুড়ে তখন শত শত মাটিকাটা মজুর কাজ করছে। অনেক খুঁজে এই সাইডের যে ইনচার্জ তার দেখা পেলাম। বেশ বয়স্ক লোক। দেখেই বোঝা যায় দক্ষ লোক। এই লাইনের কাজে মাথার চুল পাকিয়ে ফেলেছেন। বললাম তাকে–আমি একটু ঠিকাদার সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। একটা এম.এল.এর চিঠি নিয়ে এসেছি। তাকে দেব। উনি কবে, কখন সাইডে আসেন–যদি একটু বলেন।
সাইড ইনচার্জ কিছুসময় চুপ করে থেকে শেষে বলেন-যদি তার আসবার হয় তবে শনিবার এসে থাকেন। ওইদিন লেবারদের পেমেন্ট দেবার দিন। চারটে পাঁচটার সময় এলে দেখা পেয়ে যাবে।
আজ সবে মঙ্গলবার। মাঝে আছে অসহ্য তিন তিনটে দিন। তিনদিন অপেক্ষার পর আবার গেলাম সেই সাইডে। গিয়ে শুনি উনি এসেছিলেন এবং লেবার পেমেন্ট করে চলেও গেছেন।
কিন্তু এখনও তো চারটে বাজেনি। আপনি বলেছিলেন চারটে পাঁচটায় আসে।
চারটের পরেই সবদিন আসে। লেবারদের জিজ্ঞাসা করে দেখো। আজ যে বেলা দুটোর সময় এসে যাবে তা কি করে জানবো বলো!
কিন্তু আমার যে দেখা করা খুবই দরকার ছিল।
বলে সাইড ইনচার্জ, এক কাজ করো। সামনের সপ্তাহে এসো। একটু তাড়াতাড়ি যদি এসে যাও নিশ্চয় দেখা হয়ে যাবে।
সেইমত পরের শনিবার আবার গেলাম সাইডে। আজ আর কোন ঝুঁকি নেইনি, একেবার সকাল আটটায় এসে গেছি। বসে পড়লাম এক গাছ তলায় পেতে রাখা এক দড়ির খাঁটিয়ায়। আসুক এবার ঠিকাদার–যখন আসে। দেখা না হবার কোন কারণই নেই। সকাল থেকে দুপুর তারপর বিকাল–বসে বসে এক সময় শুয়ে পড়েছি খাঁটিয়ার উপরে। শেষে ঘুমিয়ে পড়েছি। যখন চোখ খুলেছি মজুররা সব কাজ শেষ করে চলে যাচ্ছে। এখনও ঠিকাদার আসেনি। তখন বৃদ্ধ সাইড ইনচার্জ বলে–কী হলো বলো তো। এখন লেবার পেমেন্ট কী করে হবে? কাল হাটবার; সবার বাজার হাট আছে। কী যে করি, সবাই তো আমাকে ধরবে।
মুখ দেখে বোঝা যায় বৃদ্ধ তার নিজের সমস্যায় বিব্রত। আমি তাকে আর কি স্বান্তনা দেবো সে আমাকেই সান্ত্বনা দেয়–সারাটা দিন তোমার বেকার চলে গেল। দুপুরে নিশ্চয় কিছু খেতেও পারোনি। কী আর করবে সামনের শনিবার এসো। এ হপ্তায় যখন আসেনি সামনের হপ্তায় নিশ্চয় আসবে। পরের দিন সাইড বন্ধ। আমার সেখানে গিয়ে কোন লাভ নেই। তাই যাওয়া হল না। পরে খবর পেলাম রবিবার সকালে এসে ঠিকাদার লেবার পেমেন্ট করে দিয়ে চলে গেছে।
এরপর যা হল সে আর কহতব্য নয়। শনিবার সাইডে গিয়ে শুনি ঠিকেদার একদিন আগে শুক্রবারই লেবার পেমেন্ট করে দিয়েছে। কবে যে আবার আসবে তা সঠিকভাবে সাইড ইনচার্জ জানে না। তার ফলে আমি আর শনিবারের উপর ভরসা করে বসে থাকতে পারলাম না। সোম থেকেশনি পাক্কা ছয়দিন সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি ধর্না দিয়ে বসে রইলাম পথের ধারে-গাছতলায়। কষ্টে দুঃখে ব্যর্থশ্রমে আমার তখন কান্না পাচ্ছে। কিন্তু ঠিকাদারের আর দেখা মেলে না। এতখানি তপস্যা করলে মানুষ তো ছাড় ভগবান থাকলে নির্ঘাৎ তার দর্শন পেয়ে যেতাম। কে জানে ঠিকাদার হয়ত ভগবানের চেয়েও এককাঠি উপরের জীব ও তা
আমার অধ্যবসায়, কষ্ট সহিষ্ণুতা, ধৈর্য দেখে বৃদ্ধ সাইড ইনচার্জ একদিন বড় বিচলিত হয়ে পড়ে। শেষে বলে–বেটা তুমসে এক বাত পুছনা চাহতে হ্যায়। যদি বলতে না চাও বোলো না। তুমি এতদিন ধরে সে ঠিকাদারের সাথে দেখা করার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছো, কীসের জন্যে? ব্যাপারটা কী? কি দরকার তার সাথে আমাকে বলা যাবে?
