কথাটা আমার মনে ধরে গেল। কিন্তু এবারও আমার সেই একই সমস্যা, দল্লীতে জনকলাল ঠাকুর সমীপে যে যাব তার গাড়িভাড়া নেই। যেতে কুড়ি আসতে কুড়ি হাত খরচা দশ, এত টাকা পাবো কোথায়? তখন বলে সেই প্রতিবেশি–আমি না হয় গোটা পঞ্চাশ টাকা ধার দিচ্ছি। কাজ করে টাকা পেলে শোধ দিও। সেই টাকায় বাসের টিকিট কেটে পরের দিন সকালে বাসে চেপে দুপুরে পৌঁছালাম দল্লী। শুনলাম এই কিছুক্ষণ আগে ঠাকুর সাহেব ভুপালে চলে গেছেন। রাজ্যসভার অধিবেশন না ভুপাল গ্যাসপীড়িতদের আন্দোলন কী একটা কার্যক্রমে যোগ দিতে। কবে ফিরবেন? না, খুব বেশি দেরি হবে না। দু চার দিনের মধ্যে ফিরে আসবেন।
আমার তখন আর কি করবার! মোর্চার মেসে আতপ চালের ভাত অরহর ডাল খেয়ে পড়ে রইলাম দল্লীতে। বাড়ি ফিরে আসায় এক ভয় ছিল, আবার কার কাছে টাকা ধার করব? আর যদি বাস ভাড়া যোগাড় না হয় তাহলে আসব কেমন করে?
চারদিন কেটে গেল। বিধায়কজি এলেন না–খবর এল উনি ভুপাল থেকে সোজা দিল্লী চলে গেছেন। স্বামী অগ্নিবেশজি কোন এক জরুরি কারণে তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। তাই। শোনা গেল বিধায়কজির দল্লী ফিরে আসতে দিন পনের তো লাগবেই। এতদিন দল্লীতে পড়ে থেকে কি করব? উনি যা পারবেন অন্য কেউ তো তা পারবে না। কথা বলেছিলাম এক দুজন নেতার সাথে। সবার উত্তর–আমি কি বলব, বিধায়কজির সাথে কথা বলে দেখুন। বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম কাপসী। চারটে দিন আর পঞ্চাশটা টাকা অকারণে খরচা হয়ে গেল।
দিন পনের পরে আবার আর একবার হাত পাতলাম সেই প্রতিবেশির কাছে। আরও পঞ্চাশ টাকা ধার করে আবার রওনা দিলাম দল্লীর দিকে। বিধায়কজি দিল্লী থেকে দল্লী এসেছেন কীনা তা জানবার অন্য কোন উপায় নেই। কাপসী বা পাখানজুর থেকে তখনও টেলিফোন পরিষেবা শুরু হয়নি।
দল্লীতে গিয়ে শুনি পনের নয় দশও নয় দিল্লীর কাজ মিটিয়ে উনি সাতদিনের মাথায় ফিরে এসেছিলেন। দুদিন একটু বিশ্রাম নিয়ে কিছু সঙ্গীসাথী সহ উনি ছুটে গেছেন নর্মদা নদীর পাড়ে। ওখানে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী মেধা পাটেকর বড় বাঁধের বিরোধ ও উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের পুনর্বাসনের দাবিতে আমরণ অনশনে বসেছেন। বিধায়ক জনকলাল ঠাকুর ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার পক্ষ থেকে সেই আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থক জানাতে গেছেন। তবে আজ যত রাত হোক উনি এখানে অবশ্যই ফিরে আসবেন। কারণ কাল একটা মিটিং আছে।
যখন উনি ফিরে এলেন রাত তখন গভীর। স্বাভাবিক কারণে আমি যে সময় ঘুমে অচেতন। ইউনিয়ান অফিসের সামনের মাঠে কখন এসে বিধাকয়জির জিপ থেমেছে টের পাইনি। এখানে থেকে সামান্য একটু দূরে শ্রমিক বস্তির মধ্যে ওনার বাসা। সাধারণ দরকারে বাসায় গিয়ে বিরক্ত করা উচিত হবে না বলে ইউনিয়ান অফিসে বসে রইলাম। আটটা না হয় নটা যখন তোক উনি তো এখানেই আসবেন। দু চার ঘন্টায় আর এমন কি হেরফের হবে। এতদিন যখন কেটে গেছে এটুকু সময়ও যাবে। তিনি এলেন দশটা দশে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে একঘন্টা দশ মিনিট দেরিতে। ততক্ষণে দল্লী-রাজহরা ব্যবসায়ী সমিতির সব লোক এসে গেছে। তাদের সাথেই আজকের মিটিং। বিধায়কজি ঝড়ের বেগে এলেন এবং কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা মিটিং কক্ষে গিয়ে ঢুকলেন। আর দরজা বন্ধ কক্ষে যখন মিটিং চলছে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে আমি তখন দরজার এপারে বসে আছি। পায়চারী করছি, বিড়ি খাচ্ছি, তবু উনি বের হচ্ছেন না। অবশেষে প্রায় বেলা দুটোর সময় সে মিটিং শেষ হয়ে গেল। তিনি বাইরে বের হয়ে আমাকে দেখলেন। একটু হাসলেন–ব্যাপারীজি, আপ কব আয়ে? সব কুশল মঙ্গল?
বলি–আপনার সাথে একটা দরকারি কথা ছিল।
বলেন উনি–এখন থাক। আমি খুব ক্লান্ত। খিদেও লেগে গেছে। আপনি এখন খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করুন। রাত্রে সব শুনবো। ঠিক হ্যায় না?
রাতে দেখা হল, আর আমার সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর জানতে চাইলেন–ঠিকাদারের নাম কি? নাম শুনে বললেন–সুরিন্দর সিং? আমাদের রাজহরার সুরিন্দর পাখানজুরে কাজ নিয়েছে। কোন চিন্তা নেই আপনার, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সুরিন্দর খুব ভালো লোক, আমার কথা ফেনাবালকেজানেন তে ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের রামপাল ভাটিয়া। রামপাল আর সুরিন্দর একই মহল্লায় থাকে। আমি রামপালকে যা বলার তা বলে দেব। আপনি রামপালের সাথে সোজা সুরিন্দরের ফ্লাটে চলে যাবেন। কাজ হয়ে যাবে।
কিন্তু রামপালের সাথে আমার দেখা কিকরে হবে? সে তো ভীষণ ব্যস্ত লোক। তার সমিতিতে তিনশোখানা ট্রাক, তিনশো রকম ঝামেলা।
বলেন তিনি–আমি দেখছি কি করে আপনার সমস্যার সমাধান করা যায়। কাল কাউকে দিয়ে রামপালের কাছে খবর পাঠাচ্ছি। যদি সে দল্লীতে থাকে, খবর পেলেই চলে আসবে। এখন তো কিছু করা যাবে না। রাত হয়ে গেছে। যান খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন, সকালে দেখছি।
এই খবর পাঠানো আর রামপাল ভাটিয়ার আসা এর মধ্যে কেটে গেল আরও দু চারদিন। তারপর এক সকালে মুখোমুখি হলাম আমরা তিনজন। আমি, জনক লাল ঠাকুর আর রামপাল। সব কথা শুনে বলে রামপাল বিধায়কজি, এটা অতি সামান্য একটা কাজ। আপনার জোর তলব পেয়ে আমি তো ভাবলাম কি না কী? এটা আপনি আমার উপর ছেড়ে দিন। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। এনিয়ে আর আপনাকে ভাবতে হবে না। তারপর আমাকে বলে–আপ কাল মেরা ফ্লাট মে আ যাইয়ে। আপকো সাথমে লেকে ম্যায় খুঁদ চলকে আপসে সুরিন্দরকা বাত করা দেঙ্গে। মানকে চলিয়ে আপকা কাম হো গিয়া।
