নির্জন জঙ্গল পথ ধরে হাঁটা দিলাম আমি। হাঁটতে হাঁটতে কেমন যেন একটা ঘোর লেগে গেল আমার। নিশিতে পাওয়া মানুষের যেমন হয়। শরীর সচল চেতনা অবশ। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় এসে গেলাম সেই বিখ্যাত নয় নাম্বার পাহাড়ের সামনে। সামনে মানে একেবারে সন্নিকটে নয়, পাহাড়টা তখনও সিকি মাইল দূরে। এখানে রাস্তার দুই ধারে ফাঁকা মাঠ। বৃষ্টি নামলে এই মাঠ চাষের জমিতে বদলে যাবে। তখন পাটমেস্তা অরহর তিল সোয়াবিন এ সব ফসল বোনা হবে। সেই মাঠের মাঝখান থেকে বাস চলা পাকা রাস্তার উপর আমি। আর আমার দেড়দুশো ফুট দূরে মাঠের মাঝে কটা কালো কালো বড় পাথর, পাথরের ছায়ায় কিছু অন্ধকার।মনে হয় সেই অন্ধকারে বসে ঘুমোচ্ছিল সেই বাঘটা। আমি যেমন বুঝতে পারিনি ওখানে একটা বাঘ আছে সে-ও বুঝতে পারেনি যে একজন লোক হেঁটে একেবারে তার কাছে এসে পড়েছে। হঠাৎ একটা শব্দ আমার কানে এল। না, হালুম নয়! হালুম আর উফ্ এই দুয়ের সংমিশ্রণে যে শব্দ হয়–হ্যাঁউ। সেটা আমার কাছে একটা আর্তনাদ আর বিরক্তি অথবা ভীত গলার স্বর–তেমনই মনে হল। বাঘটা আমাকে হঠাৎ দেখে ভয় পেয়ে গেছে। তাই সে হাউফ শব্দ করে জোছনা ধোয়া শুকনো মাঠের উপর দিয়ে উধশ্বাসে ছুটে জঙ্গলের দিকে পালিয়ে গেল।
মানুষ বাঘকে ভয় পায়, এটা যেমন সত্যি, এটাও মিথ্যা নয় যে বাঘও মানুষ নামক জীবটিকে ভয় পায়। কিন্তু এখন আমার মন বাঘকে ভয় পেতে দেখে পুলকে ভরে ওঠে না, আতঙ্কে সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। আর এক পা-ও সামনে এগোতে পারি না। দাঁড়িয়ে পড়ি পথের উপরে। কী হল আর কী হতে পারত সেই ভেবে শিউরে উঠি। এটা ঠিক যে দণ্ডকারণ্যে বাঘে মানুষ খায় না। যে কারণে ধর্ম বিশ্বাসীরা প্রচার করে থাকে এটা নাকি সীতাদেবীর বরদানের ফল। কিন্তু আসল কারণ হল–এখানে বাঘেরা পর্যাপ্ত পরিমাণে অন্য আহার পেয়ে যায়। তাছাড়া এখানে এখনও মরিচঝাঁপির মত কোন ঘটনাও ঘটেনি যে নরমাংস খেয়ে বাঘের পুরাতন খাদ্যাভাস বদলে যাবে। অনু জালের একটা লেখা থেকে জানা যায় সুন্দরবনের বাঘ আগে নর-মাংস লোভি ছিলনা। মরিচঝাঁপির ঘটনার পর তাদের খাদ্যাভাস বদলে গেছে। কিন্তু ভয় পাওয়া বাঘ যদি আত্মরক্ষার কথা ভেবে আচমকা আমার উপর আক্রমণ করে বসত তাহলে কি হতো? অথবা ওটা বাঘ না হয়ে যদি ভাল্লুক হতো? ভাল্লুক এমন এক প্রাণী যারা আমিষ আহার করে না, একেবারে সাত্ত্বিক শাকাহারি। কিন্তু সামনে মানুষ পেলে আর তার রক্ষা নেই। ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশেষ করে মাদি ভালুক হলে তো আর কথাই নেই। মহুয়া ফুলের সিজনে প্রচুর ভালুক গভীর জঙ্গল থেকে বের হয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসে। যে কারণে বস্তারের কোন আদিবাসী নিরস্ত্র পথ চলে না। একটা ধারালো ফারসা বা টাঙ্গি কাঁধে রাখে। বাঙালীরাও এখন সেই অভ্যাসে রপ্ত করে নিয়েছে। কিন্তু আমি তো এখন একেবারে খালি হাতে। পাউরুটির বদলে কমপক্ষে হাতে যদি পাথর রাখতাম তা দিয়ে আত্মরক্ষার একটা চেষ্টা অন্ততঃ করা যেত। নিজের বোকামিতে এখন আমার নিজের মাথায় পাথর মারতে ইচ্ছা হল। আর একটু হলে বিদেশ বিভুয়ে আমার ছোটছোট বাচ্চা নিয়ে অনু অনাথ হয়ে যেত।
পরে শুনেছিলাম, আকারে কিছু ছোট এই বাঘকে নাকি তেলুয়া বলে। আমি একা নই, অনেকে দেখেছে তাকে। নয় নাম্বারের পাহাড়ে এদের একজোড়া ছিল। একটা এক রাতে ট্রাক চাপা পড়ে মারা গেছে। বেঁচে আছে এই একটা। বাড়ি ফিরে সেদিন অনুকে এই ঘটনা বলার পর সে প্রথমে কাঁপলো, তারপর কাঁদলো তারপর বলল–এরপর আর কোনদিন অন্ধকার হয়ে গেলে পাখানজুর থেকে আসবে না। ওদের বলবে যে রকম বাড়ি থেকে নিয়ে গেছে ফিরিয়ে রেখে যাক। আর না হয় থানায় থাকার জায়গা দিক।
সে যাইহোক, এই রকম এক পরিস্থিতিতে এখন পড়ে গেছি আমি যে সেই অবস্থা সহ্য করে কাপসীতে বসবাস করা খুবই কঠিন। দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আর পুলিশ প্রশাসনের চাপ তার উপর আবার সংসারে অভাব। এই অবস্থায় কাপসীতে থেকে কেমন ভাবে সংসার চালাই। এখানে তো অন্য কোন কাজকর্মের বিশেষ সুযোগ সুবিধা নেই। আমার জন্যে যা আছে, যে কাজ আমি পারি তা হল কাঠ বেঁচা। কিন্তু আমি যে এখন ধর্মচ্যুত হয়ে গেছি। জাত বদলে গেছে আমার। তাই আর কাঠ বেচা যাবে না। জঙ্গলে কুড়ুল নিয়ে ঢোকাই বনরক্ষা আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। নেতাগিরি করে বন বিভাগের কর্মচারীদের খেপিয়ে রেখেছি। এখন আমাকে বাগে পেলে কাঠ কুড়ুল সব জপ্ত করে নিতে পারে। ওগুলো গেলে অল্পে গেল, যদি সাইকেলও নিয়ে নেয়, ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি।
এখানে একমাত্র চাষের মরশুমের তিনমাস আর তেন্দু পাতা ভাঙার একমাস বাদে অন্য সময়ে জনমজুরের কাজেরও বড় আকাল। তাই আমি যে এখন কীভাবে চাল ডাল তেল নুন যোগাড় করব বুঝে উঠতে পারছি না। আশে পাশে পরিচিত একজনও আর অবশিষ্ট নেই যার কাছ থেকে ধার নিতে বাকি রেখেছি। কি করে ছেলেমেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকব সেই চিন্তায় তখন আমার পাগল পাগল দশা। সেই সময় আমার একজন পরিচিত লোক এসে একটা সুখবর দিল-পাখানজুর থেকে একশো আট নাম্বার ভিলেজ পর্যন্ত একটা রাস্তা তৈরি হচ্ছে। দিন দশ পনের হল কাজ শুরু হয়েছে। শেষ হতে আরও মাস দুয়েক লাগবে। এর একটা অতি সুখবর যে ঠিকাদার সেই দল্লীতে থাকে। তোমার তো দল্লীর বিধায়ক, ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার নেতা জনক লাল ঠাকুরের সাথে খুবই চেনা জানা। এবার তাকে গিয়ে চেপে ধরো। সে একবার ঠিকাদারকে বলে দিলে তুমি একটা মুনশির কাজ পেয়ে যাবে। পাখানজুড়ের পাঁচ ছয় জন মুনশির কাজ করছে। দিনে তিরিশ টাকা করে পায়। তুমি যদি মাস দুয়েক ওখানে কাটিয়ে দিতে পারো এরপর তো তেন্দুপাতা তোলবার মরশুম এসেই যাবে। তখন আমি তোমাকে দূরে কোনদিকে পাতাফড়ির ইনচার্জ বানিয়ে দেব। এক মাসে যাতে পাঁচ সাত হাজার টাকা রোজগার হয়ে যায় সেই কায়দা শিখিয়ে দেব।
